hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩১

ডারউইনের বিবর্তনবাদের প্রভাব

এটা কেবল কষ্ট-কল্পনা নয়। খ্রিস্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে য়ুরোপে এমন সব মতবাদ ও তত্ত্বগত মতাদর্শ জন্ম নিতে থাকে যার ফলে মানুষ ও তার জীবনের নানাবিধ সমস্যা সম্পর্কে পাশবিক দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থিত ও শক্তিশালী হতে থাকে। ১৮৫৯ সালে ডারউইন তাঁর Origin of Species নামক গ্রন্থে প্রমাণ করতে চেষ্টা পান, মানুষ মূলত পশুরই ক্রমবিবর্তিত একটি রূপ মাত্র যা হাজার হাজার বছরের ক্রমউন্নতি ও ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে জীবাণু বিশেষ (Amoeba) থেকে বানর, অতঃপর বানর থেকে মানবাকৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই গ্রন্থটি সমগ্র য়ুরোপের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং সময়ের সবচে' বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই বিবর্তনবাদ মানুষের সমস্যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনার মোড়টাই ঘুরিয়ে দেয় এবং জীবজগতের ইতিহাস, জন্ম ও প্রবৃদ্ধি, সে সবের আচার-আচরণ, অভ্যাস ও সমূহ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করে দেয়। এই মতবাদ এ ধরনের বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিয়েছে, এই বিশ্বজগত কোন অতিপ্রাকৃতিক শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক বিধান ব্যতিরেকে এর কোন কার্যকারণ নেই।

সূচনা ও পরিণতি, মেধাগত, নৈতিক ও কার্যকর প্রভাবগুলোর মধ্যে এই মতবাদ ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, বরং বলা যায়, এই মতবাদ একটি স্থায়ী ধর্ম ও জীবনদর্শনের রূপ পরিগ্রহ করেছে যা অপর কোন ধর্ম ও জীবন-দর্শনের নিমিত্ত কোনরূপ অবকাশ রাখে না। তাই ধর্মের অনুসারীদের এর বিরোধিতা এবং এ ব্যাপারে তাদের আশংকা ছিল যথার্থ। অধ্যাপক C.E.M. Joad বলেন।

“এই পেরেশানী ও হতবুদ্ধিকর অবস্থার পরিমাপ করা আমাদের জন্য এ সময় কঠিন বৈকি যা আমাদের পূর্বসূরীদের সামনে এ বইটি (Origin of Species) প্রকাশের পর দেখা দিয়েছিল। সেই সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা যার ওপর এর। গবেষণার ফলাফল স্থাপিত ছিল, ডারউইন প্রমাণ করেন (কিংবা তিনি প্রমাণ করেন বলে ধরে নেয়া হয়), ভূপৃষ্ঠে জীবনের বিবর্তন জীবাণু বিশেষ (Amoeba) ও জেলী ফিশ (Jelly fish)-এর প্রাথমিক আবির্ভাব থেকে তার চূড়ান্ত অবয়বে উপনীত হওয়া পর্যন্ত অব্যাহতভাবে চলেছে। আমরা জীবনের সর্বোন্নত ও সর্বশেষ অবয়ব।

“এর বিপরীতে ভিক্টোরিয়া যুগের লোকদেরকে বলা হয়েছিল, মানুষ স্বয়ং আল্লাহর এক বিশেষ সৃষ্টি এবং সে মূলত ফেরেশতার স্তর থেকে নেমে এসেছে। কিন্তু ডারউইনের মতে মানুষ বানরের উন্নত সংস্করণ মাত্র। ঐ যুগের লোকদের একথা ভাবতে খুব কষ্ট হয়েছে, তারা অধঃপতিত ফেরেশতার পরিবর্তে একটি উন্নত মানের বানর প্রমাণিত হয়েছে। এই মতবাদ তাদের আদৌ পসন্দ হয়নি এবং তারা মানুষকে এই উভয় সংকট থেকে মুক্তি দিতে এবং এই লজ্জা দূর। করবার বিভিন্ন রকমের প্রয়াস চালায়।”১

জ্ঞানগত ও গবেষণামূলক বিভিন্ন রকমের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও শূন্যতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের অধিকাংশই বুঝে হোক অথবা না বুঝে হোক, এই মতবাদ গ্রহণ করে নেয়। মনে হয়, তাদের মস্তিষ্ক আগে থেকেই এর জন্য তৈরি ছিল। মানুষ এর ভেতর আরেকটি ভাল দিক এও দেখতে পেল, তা ধর্ম ও ধর্মানুসারীদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষ। অতঃপর যারা ধর্মের অনুসারী তাদের পক্ষে নানারূপ ধ্যান-ধারণা ও রুচির এই প্রবাহিত স্রোত এবং প্রকাশিত বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকার এই প্লাবনের মুকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল এবং অবশেষে গির্জা এই যুদ্ধে তাদের পরাজয় স্বীকার করে নিল।

ধ্যান-ধারণা, সভ্যতা-সংস্কৃতি, সাহিত্য ও রাজনীতি, মোট কথা জীবনের সকল শাখায় এই মতবাদ সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। প্রকৃতির রাজ্যের দিকে প্রত্যাবর্তনের ধারণা, নগ্নতা ও উলঙ্গপনার প্রতি আগ্রহ এবং এ ধরনের বহু কাজ ও আচার-ব্যবহার এ জাতীয় ধ্যান-ধারণার ফল ও ফসল যে, মানুষ মূলত একটি উন্নত পশু বৈ নয়। এ ধরনের মন-মানসিকতারই ফল যে, মি. শেপার্ড-এর ভাষায়, “ইংল্যান্ডে বর্তমানে এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নিচ্ছে যারা মানুষের পারিবারিক জীবনের অর্থ সম্পর্কেই সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও অপরিচিত। তারা কেবল পশু পালের জীবন সম্পর্কেই জ্ঞাত ও পরিচিত।”

[১. Guide to Modern Wickedness, p. 235-236. ]