১
মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?
লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪৭
লাগামহীন বিত্তবান ও আত্মবিস্মৃত দরিদ্র
পুঁজিবাদের অবাধ্যতা ও আল্লাহ-বিস্মৃতি এবং দারিদ্রের অসহায়ত্ব ও। আত্মবিস্মৃতির দুই চরম প্রান্তিকতার মাঝে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের দাওয়াত ও তা'লীম দোদুল্যমান ছিল। মহৎ চরিত্র ও জীবনের উন্নত মূলনীতি গোটা সভ্য দুনিয়ায় পরিত্যক্ত ও অকার্যকর মনে করা হচ্ছিল। ধনী ও বিত্তবানদের নিজেদের ক্রীড়া-কৌতুকের নেশা ও বিলাস-ব্যসনের দরুন ফুরসৎই ছিল না যে তারা দীন-ধর্ম কিংবা পরকাল সম্পর্কে কিছু ভাববে। কৃষক ও শ্রমিক। শ্রেণীর জীবন-যন্ত্রণা নিত্যকার চিন্তা-ভাবনা ও জীবনের বর্ধিত দাবি তাদের এই অবকাশই দিত না যে, তারা প্রতিদিনের খোরাক ও প্রয়োজনাদি ছাড়া আর কোন দিকে মনোনিবেশ করবে। মোটকথা, জীবন ও জীবনের দাবি ধনী-দরিদ্র সকলকেই ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল এবং এরই ভেতর সবাই পেরেশান ছিল। জীবনের চাকা তার পূর্ণ শক্তিতে ঘুরছিল যদ্দরুন তাদের এতটুকু অবকাশ ছিল যে, তারা দীন-ধর্মের দিকে মনোসংযোগ করবে এবং হৃদয় ও আত্মা সম্পর্কে, মানবতার উন্নততর মূল্যবোধ সম্পর্কেও একটু চিন্তা-ভাবনা করবে।
হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র.) (মৃ. ১১৭৬ হি.) তদীয় বিখ্যাত গ্রন্থ হুজ্জাতুল্লাহি’ল-বালিগায় ইসলাম-পূর্ব যুগের এমত অবস্থারই পরিপূর্ণ ছবি এঁকেছেন এভাবেঃ
“শতাব্দীর পর শতাব্দী থেকে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে করতে এবং দুনিয়ার স্বাদ ও আমোদ-আহ্লাদের ভেতর লিপ্ত থেকে পরকালীন জীবন একেবারেই বিস্মৃত হার এবং শয়তানের পরোপুরি খপ্পরে পড়ে যাবার দরুন ইরানী ও রোমীয়দের জীবনের সারল্য ও উপকরণের ভেতর বিরাট সূক্ষ্ম দৃষ্টি ও নাযুক ধারণা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। তারা বিলাসবহুল জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে পরস্পরে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়। দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে এসব কেন্দ্রে বড় বড় গুণী ও কুশলী শিল্পী এসে জমায়েত হয়েছিল যারা এসব বিলাস উপকরণ ও আরাম-আয়েশের ভেতর কমনীয়তা ও পেলবতা সৃষ্টি করত এবং নিত্য-নতুন সাজগোজ ও প্রসাধনী বের করত। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে এর ওপর আমল শুরু হয়ে যেত। কেবল তাই নয়, বরাবর তা বৃদ্ধি পেতে থাকত এবং এ নিয়ে গর্ব করা হতো। জীবনমান এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, আমীর-উমারার ভেতর কারুর এক লক্ষ টাকার কম মূল্যের মেখলা বা কোমর বন্ধনী বা শিরোভূষণ পরিধান রীতিমত অমর্যাদাকর ছিল। যদি কারুর কাছে আলীশান মহল, ফোয়ারা, হাম্মাম, বাগ-বাগিচা, উত্তম খোরাক, তৈরি পশু, সুদর্শন যুবক ও দাস-দাসী না থাকত, খাবারের ভেতর লৌকিকতা এবং পোশাক-পরিচ্ছদের ভেতর শোভা-সমৃদ্ধি না থাকত তাহলে সতীর্থদের মধ্যে তার কোন সম্মান হতে। এর ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। নিজ দেশের রাজা-বাদশাহদের১ অবস্থা সম্পর্কে যা দেখছ ও জান এর থেকেই তোমরা তা অনুমান করতে পারবে।
[১. দিল্লীর মুগল সম্রাটদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ]
“এই সব লৌকিকতা তাদের জীবন ও সমাজ-সামাজিকতার অংশে পরিণত হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের দিলের ভেতর এমনভাবে বসে গিয়েছিল যা কোনভাবেই বের হবার নয়। এর ফলে এমনই এক দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল যা তাদের গোটা নাগরিক জীবন এবং তাদের সমগ্র সাংস্কৃতিক রীতিনীতির ভেতর অনুপ্রবেশ করেছিল। এ ছিল এক বিরাট মুসীবত যার হাত থেকে বিশিষ্ট ও সাধারণ, ধনী-গরীব কেউই মুক্ত ছিল না। প্রত্যেক নাগরিকের ওপর এই কৃত্রিম লৌকিকতাপূর্ণ ও আমীরানা জীবনযাত্রা এমনই জেঁকে বসেছিল যা তাদের জীবনকে দুর্বহ ও দুর্বিষহ করে তুলেছিল এবং তাদের মাথার ওপর দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার এক বিরাট পাহাড় সব সময় ঝুলত। ব্যাপার ছিল এই যে, এই সব লৌকিকতা বিরাট অংকের অর্থ ব্যয় ব্যতিরেকে হাসিল করা যেত না। আর এই সব অর্থ ও অপরিমেয় সম্পদ কৃষককুল, ব্যবসায়ী বণিক ও অপরাপর পেশাজীবী লোকদের ওপর খাজনা-ট্যাক্স না বসিয়ে ও বিবিধ প্রকার কর বৃদ্ধি না করে, তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে না তুলে সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না। যদি তারা এসব দাবি পূরণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করত তাহলে তাদের ওপর লোক-লশকর, পাইক-পেয়াদা ও বরকন্দাজ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং তাদের শাস্তি দেওয়া হতো। আর দাবি পূরণ করলে তাদেরকে গাধা ও কলুর বলদ বানানো হতো যাদের দিয়ে ক্ষেতে পানি দেওয়াসহ ক্ষেত মজুরের কাজ নেওয়া হতো। আর কেবল শ্রম দেবার জন্যই তাদের লালন-পোষণ করা হতো। কঠোর-কঠিন শ্রমের হাত থেকে তারা কখনোই মুক্তি পেত না। এই কঠোর শ্ৰমপূর্ণ ও পশু জীবনের ফল হতো এই যে, তারা কোনদিনই মাথা তুলবার এবং পরকালীন সৌভাগ্য লাভের চিন্তা বা ধারণা করবারও অবকাশ পেত না। অনেক সময় গোটা দেশে এমন একজন লোকও পাওয়া যেত না যার কাছে আপন দীন বা ধর্মের কোন চিন্তা-ভাবনা বা গুরুত্ব থাকত।১
[১. হুজ্জাতুল্লাহি'ল-বালিগা, (আরবি) দ্র ]
হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র.) (মৃ. ১১৭৬ হি.) তদীয় বিখ্যাত গ্রন্থ হুজ্জাতুল্লাহি’ল-বালিগায় ইসলাম-পূর্ব যুগের এমত অবস্থারই পরিপূর্ণ ছবি এঁকেছেন এভাবেঃ
“শতাব্দীর পর শতাব্দী থেকে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে করতে এবং দুনিয়ার স্বাদ ও আমোদ-আহ্লাদের ভেতর লিপ্ত থেকে পরকালীন জীবন একেবারেই বিস্মৃত হার এবং শয়তানের পরোপুরি খপ্পরে পড়ে যাবার দরুন ইরানী ও রোমীয়দের জীবনের সারল্য ও উপকরণের ভেতর বিরাট সূক্ষ্ম দৃষ্টি ও নাযুক ধারণা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। তারা বিলাসবহুল জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে পরস্পরে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়। দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে এসব কেন্দ্রে বড় বড় গুণী ও কুশলী শিল্পী এসে জমায়েত হয়েছিল যারা এসব বিলাস উপকরণ ও আরাম-আয়েশের ভেতর কমনীয়তা ও পেলবতা সৃষ্টি করত এবং নিত্য-নতুন সাজগোজ ও প্রসাধনী বের করত। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে এর ওপর আমল শুরু হয়ে যেত। কেবল তাই নয়, বরাবর তা বৃদ্ধি পেতে থাকত এবং এ নিয়ে গর্ব করা হতো। জীবনমান এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, আমীর-উমারার ভেতর কারুর এক লক্ষ টাকার কম মূল্যের মেখলা বা কোমর বন্ধনী বা শিরোভূষণ পরিধান রীতিমত অমর্যাদাকর ছিল। যদি কারুর কাছে আলীশান মহল, ফোয়ারা, হাম্মাম, বাগ-বাগিচা, উত্তম খোরাক, তৈরি পশু, সুদর্শন যুবক ও দাস-দাসী না থাকত, খাবারের ভেতর লৌকিকতা এবং পোশাক-পরিচ্ছদের ভেতর শোভা-সমৃদ্ধি না থাকত তাহলে সতীর্থদের মধ্যে তার কোন সম্মান হতে। এর ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। নিজ দেশের রাজা-বাদশাহদের১ অবস্থা সম্পর্কে যা দেখছ ও জান এর থেকেই তোমরা তা অনুমান করতে পারবে।
[১. দিল্লীর মুগল সম্রাটদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ]
“এই সব লৌকিকতা তাদের জীবন ও সমাজ-সামাজিকতার অংশে পরিণত হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের দিলের ভেতর এমনভাবে বসে গিয়েছিল যা কোনভাবেই বের হবার নয়। এর ফলে এমনই এক দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল যা তাদের গোটা নাগরিক জীবন এবং তাদের সমগ্র সাংস্কৃতিক রীতিনীতির ভেতর অনুপ্রবেশ করেছিল। এ ছিল এক বিরাট মুসীবত যার হাত থেকে বিশিষ্ট ও সাধারণ, ধনী-গরীব কেউই মুক্ত ছিল না। প্রত্যেক নাগরিকের ওপর এই কৃত্রিম লৌকিকতাপূর্ণ ও আমীরানা জীবনযাত্রা এমনই জেঁকে বসেছিল যা তাদের জীবনকে দুর্বহ ও দুর্বিষহ করে তুলেছিল এবং তাদের মাথার ওপর দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার এক বিরাট পাহাড় সব সময় ঝুলত। ব্যাপার ছিল এই যে, এই সব লৌকিকতা বিরাট অংকের অর্থ ব্যয় ব্যতিরেকে হাসিল করা যেত না। আর এই সব অর্থ ও অপরিমেয় সম্পদ কৃষককুল, ব্যবসায়ী বণিক ও অপরাপর পেশাজীবী লোকদের ওপর খাজনা-ট্যাক্স না বসিয়ে ও বিবিধ প্রকার কর বৃদ্ধি না করে, তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে না তুলে সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না। যদি তারা এসব দাবি পূরণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করত তাহলে তাদের ওপর লোক-লশকর, পাইক-পেয়াদা ও বরকন্দাজ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং তাদের শাস্তি দেওয়া হতো। আর দাবি পূরণ করলে তাদেরকে গাধা ও কলুর বলদ বানানো হতো যাদের দিয়ে ক্ষেতে পানি দেওয়াসহ ক্ষেত মজুরের কাজ নেওয়া হতো। আর কেবল শ্রম দেবার জন্যই তাদের লালন-পোষণ করা হতো। কঠোর-কঠিন শ্রমের হাত থেকে তারা কখনোই মুক্তি পেত না। এই কঠোর শ্ৰমপূর্ণ ও পশু জীবনের ফল হতো এই যে, তারা কোনদিনই মাথা তুলবার এবং পরকালীন সৌভাগ্য লাভের চিন্তা বা ধারণা করবারও অবকাশ পেত না। অনেক সময় গোটা দেশে এমন একজন লোকও পাওয়া যেত না যার কাছে আপন দীন বা ধর্মের কোন চিন্তা-ভাবনা বা গুরুত্ব থাকত।১
[১. হুজ্জাতুল্লাহি'ল-বালিগা, (আরবি) দ্র ]