১
মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?
লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১২০
ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ এবং চার্চের জুলুম
ঘটনাক্রমে এটা ছিল এমন এক সময় য়ুরোপে যখন ইসলাম ও মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চাপাপড়া আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটে। দার্শনিক, চিন্তানায়ক ও বিজ্ঞানীরা অন্ধ আনুগত্যের শেকল ভেঙে ফেলল। তারা এমন সব দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করল যেগুলো ভূগোল, ইতিহাস ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের নামে ধর্ম গ্রন্থগুলোতে ঢুকিয়েছিল এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ও খোলাখুলিভাবে তাত্ত্বিক সমালোচনা করল। তারা না বুঝে চোখ বন্ধ করে সেগুলো মেনে নিতে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানাল। এরই সাথে সাথে তারা অর্থাৎ দার্শনিক ও বিজ্ঞানিগণ নিজেদের আবিষ্কার-উদ্ভাবন ও অভিজ্ঞতার ঘোষণাও প্রদান করল। ব্যস! আর কি! ঘঘাষণা প্রদানের সাথে সাথেই ধর্মীয় মহলে তুমুল হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। চার্চ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। তারা ছিল ক্ষমতা ও সীমাহীন প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক। প্রথমত তারা এদের ধর্মদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করল। অতঃপর খ্রিস্ট ধর্মের নামে তাদের হত্যা করা এবং তাদের সহায়-সম্পদ ও মালামাল ক্রোক করা বৈধ ঘোষিত হলো। এসব অবিশ্বাসী বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের বিচারের উদ্দেশে চার্চ কর্তৃক Court of Inquisition প্রতিষ্ঠিত হলো। পোপের ভাষায়ঃ কোর্ট সেই সব ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিকদের শাস্তি প্রদান করবে যারা শহরে-বন্দরে, ঘরে-বাইরে, অন্ধকার গৃহ কোণে, বনে-জঙ্গলে, পর্বত-গুহায় ও ক্ষেতে-খামারে ছড়িয়ে রয়েছে। এই সব কোর্ট তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা ও উৎসাহের সাথেই পালন করে। তাদের গোয়েন্দা সমগ্র য়ুরোপের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল এবং এ ব্যাপারে গোেয়ন্দা বিভাগ অপরাধীদের পাকড়াও করতে এবং সন্দেহজনক লোকদের তৎপরতার ওপর খবরদারি করতে চেষ্টার আদৌ কোন ত্রুটি করেনি। জনৈক খ্রিস্টান পণ্ডিতের ভাষায়ঃIt was hardly possible for a man to be a Christian and die in his bed. অর্থাৎ একজন খ্রিস্টান বিছানায় মারা যাবে তা একেবারেই অসম্ভব। অনুমিত হয়, এই বিভাগ (Court of Inquisition) যেসব লোককে শাস্তি দিয়েছে তাদের সংখ্যা ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিন লক্ষের কম হবে না। এদের মধ্যে ৩২. হাজার লোককে জীবিত পুড়িয়ে মারা হয়। আর পুড়িয়ে মারা এসব লোকের। মধ্যে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ব্রুনোও ছিলেন যার প্রধান অপরাধ ছিল, এই পৃথিবী ছাড়াও আরও পৃথিবী আছে যেখানে অন্যান্য প্রাণীর বসবাস রয়েছে, তিনি এই মত পোষণ করতেন। ইনকুইজিশন বিভাগের কর্মকর্তারা তাঁকে এই সুপারিশসহ জাগতিক বিষয়ক কর্মকর্তাদেরকে নিকট অর্পণ করে যে, এঁকে যেন খুবই লঘু শান্তি প্রদান করা হয় এবং এও যেন খেয়াল রাখা হয়, তার শরীর থেকে এক ফোটা রক্ত যেন মাটিতে না পড়ে। এর অর্থ ছিল এই যে, তাকে যেন জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। ঠিক তেমনি বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত গ্যালিলিওকে এজন্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়, তিনি পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে’ –এই মত পোষণ করতেন।