hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩৯

ব্যবসা-বাণিজ্য ও নীতি-নৈতিকতার মধ্যে অসহযোগিতা ও বিরোধ

উপচে পড়া সম্পদের এই সঙ্কটের যুগে অথবা লর্ড ম্যাকলের অর্থপূর্ণ ভাষায় “স্বল্পতম সময়ে অধিক থেকে অধিকতর সম্পদ আহরণের আকাক্ষী এবং যথাসম্ভব সত্বর ধনী হতে আগ্রহী লোকদের শাসনামলে এক প্রচণ্ড বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা চলছে যার ফল হলো এই, ক্রীড়া ও বিনোদনসামগ্রী, আরাম-আয়েশের উপকরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও বিবিধ প্রকারের সৌন্দর্যসামগ্রীর এক বিপুল সমাহার প্রতিদিন কল-কারখানায় ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত হয়ে শহুরে এসে আছড়ে পড়ছে। বাজারে নিত্য-নতুন ডিজাইনের পোশাক-পরিচ্ছদ, জুতা ও বিভিন্ন চোখ ধাঁধানো আয়েশ-সামগ্রী দোকানের শেলফে ঝলমল করতে থাকে। এরপর একদিন সেগুলো সেকেলে হিসেবে আখ্যায়িত হয়। তারপর তার স্থলে নামমাত্র ঘষা-মাজার পর সেগুলো নতুন পণ্য ও নতুন সামগ্রী হিসেবে পসার জাকিয়ে বসে। রূপ-সৌন্দর্য ও উন্নতি-অগ্রগতির মাপকাঠি প্রতিদিন বদলাতে থাকে এবং তা সমান তালে অগ্রসর হয়। এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা কারখানাগুলোর এই অপ্রয়োজনীয় খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকের উৎপাদন এবং এই প্রতিযোগিতার ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার যা বিপণিকেন্দ্রসমূহ ও কলকারখানাগুলোতে কাজ করছে এবং যা লোকের নৈতিক চরিত্র ও সমাজ, শক্তি, অধিকন্তু ক্রয় ক্ষতা সম্পর্কে একেবারেই বেপরওয়া। এর ফল হলো এই, জীবন প্রতিদিনই দুর্বিষহ, জীবন মান বিগত দিনের তুলনায় সমুন্নত, জীবনের চাহিদা ও দাবি এবং জীবনের কৃত্রিম অনুষঙ্গসমূহের ক্রমহারে বৃদ্ধি এবং সেগুলো পূরণের জন্য বৃহৎ থেকে বৃহত্তর আয়ও যথেষ্ট নয়। আর এর ফলে অল্পে তুষ্টি একটি অর্থহীন শব্দে পরিণত হয়। তৃপ্তি ও চিত্তের প্রশান্তি স্বপ্ন ও কল্পনায় পর্যবসিত হয়। সবার সামনেই নিজের তুলনায় উন্নত মানের জীবনের স্বপ্ন এবং সেখান অবধি পৌঁছাকে সবাই নিজের সব চাইতে বড় কর্তব্য মনে করে। পরিবেশও তার কাছে তারই দাবি। পেশ করে এবং এরই প্রত্যাশা করে। তানা হলে সে নিজেকে ছোট ও অবজ্ঞেয় ভাবতে থাকে। এর প্রাণান্তকর প্রয়াসেই তার একটা বিরাট সময় কেটে যায়। যখন সে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে থাকে তখন তার আকাক্ষা আরও বৃদ্ধি পায় এবং আরেকটি উন্নত জীবন মান তার সামনে এসে ধরা দেয়। আর এভাবেই জীবন এক অন্তহীন প্রয়াস, এমন এক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরিণত হয় যার কোন আদি নেই, অন্ত নেই। এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া হলো, জীবনে তিক্ততা ও যন্ত্রণা খুবই বেড়ে গেছে এবং যেই ঘর খুব সহজেই জান্নাতের নমুনা হতে পারত, সুখ-শান্তির আদর্শ মডেল হতে পারত এবং যার ভেতর জীবনের সর্বপ্রকার স্বাভাবিক ও প্রকৃত আবশ্যকীয় বিষয়গুলো সবই মেলে, কোন না কোন কল্পিত ও ধারণাপ্রসূত জিনিসের ঘাটতির কারণে সাক্ষাৎ জাহান্নামে পরিণত। হয়েছে। সেখানে প্রকৃত ও সত্যিকারের সুখ-শান্তি ও হৃদয়ের তৃপ্তি উবে গেছে।

জনৈক মুসলিম পণ্ডিত ব্যক্তি রোমক ও পারসিক সভ্যতা-সংস্কৃতির যেই চিত্র এঁকেছেন যা বর্তমান গ্রন্থের প্রথম দিককার পৃষ্ঠাগুলোতে বর্ণিত হয়েছে তা সামনে রেখে দেখুন, বর্তমান সভ্যতা-সংস্কৃতির চিত্র তা থেকে কি আদৌ ভিন্নতর? এর নৈতিক ও চারিত্রিক প্রভাবে নৈতিক সীমারেখা ও বিধানসমূহ স্থায়ী ও সুস্থির থাকে নি। সীমিত আয়ের মধ্যে সীমাহীন দাবি, চাহিদা ও ফাই-ফরমায়েশ পূরণের জন্য উৎকোচ গ্রহণ এবং অবৈধ ও বেআইনী উপকরণ আমদানী ব্যতিরেকে সম্ভব নয়। এর পরিণতিতে উৎকোচ (বিভিন্ন নামে) ও অপরাধমূলক লেনদেন এবং গোপন আয়-উপার্জনের বাজার আজ গরম। ফলে জীবনে যে সংকট এবং সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আজ যে অরাজকতা ও বিশৃংখলা দেখা দিয়েছে তা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার।

এই পরিণাম ফল সাধারণত জীবনের স্বাভাবিক ও প্রকৃত প্রয়োজনগুলোর চাহিদা নয়, বরং কৃত্রিম ও মেকী প্রয়োজনগুলোর দাবি থেকে উদ্ভূত। এর বাধন শুধুই আইনের প্রয়োগ ও উৎকোচ নির্মূলকরণ প্রয়াসের দ্বারা সম্ভব নয়। এর জন্য দায়ী সেই জীবন-ব্যবস্থা যা এক দীর্ঘকাল ধরে নৈতিক দিক-নির্দেশনা থেকে। মাহরূম, পরকালীন পুরস্কার ও শান্তির ধারণা থেকে মুক্ত এবং সেই শিক্ষা ব্যবস্থা যা তার সার্বিক বস্তুবাদী কাঠামোর দরুন নৈতিক অনুভূতি ও বিবেকবোধ সৃষ্টি করতে এতটাই ব্যর্থ যতটা সুত্রধর ও কর্মকারের পেশা কিংবা চিত্রাংকন ও সঙ্গীত শিল্প হতে পারে। এর জন্য দায়ী সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা যা আয় ও উৎপাদন ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাকে তো আপন দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করে, কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও নৈতিক চরিত্রের পারস্পরিক সহযোগিতাকে জরুরী মনে করে না।