hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৬

য়াহুদী জাতিগোষ্ঠী

য়ুরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় বসতি স্থাপনকারী য়াহুদী নামক জাতিগোষ্ঠী দুনিয়ার তাবৎ জাতিগোষ্ঠীর ভেতর এদিক দিয়েও অনন্য ছিল যে, তাদের নিকট দীন (ধর্ম)-এর এক বিরাট বড় পুঁজি ছিল এবং তাদের মধ্যে ধর্মীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পরিভাষাসমূহ অনুধাবনের সর্বাধিক যোগ্যতা ছিল। কিন্তু এই য়াহূদীরা ধর্ম, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে সেই মর্যাদার অধিকারী ছিল যাতে তারা অন্যদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, বরং অন্যেরা তাদেরকে শাসন করবে, সর্বদা তারা অন্যের জুলুম-নিপীড়ন সইবে, নানা রকম শাস্তি ও নির্যাতন ভোগ করবে, বিবিধ প্রকারের কঠোরতা ও ভয়-ভীতির শিকার হবে, এটাই ছিল তাদের ভাগ্যলিপি। দীর্ঘকাল ধরে গোলামি জীবন যাপন এবং নানা ধরনের কঠোরতা ও শাস্তি ভোগের দরুন তাদের মধ্যে এক বিশেষ ধরনের মানসিকতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। জাতিগত অহমিকা, গোত্রীয় ও বংশগত অহংকার, ধন-সম্পদের প্রতি সীমাতিরিক্ত লোভ-লালসা, অব্যাহত সুদী কারবারের দরুন বিশেষ ধরনের চরিত্র ও মানসিকতা, জাতিগত অভ্যাস ও স্বভাব সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল এবং এক্ষেত্রে তাদের কোন জুড়ি ছিল না। দুর্বল ও বিজিত অবস্থায় লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হওয়া ও বিজয়ী জাতিকে খোশামোদ-তোষামোদ করা আর বিজয়ী হতেই বিজিত জাতির সঙ্গে অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ এবং সাধারণ অবস্থায় প্রতারণা, শঠতা, মোনাফেকী, সংকীর্ণ মনোবৃত্তি ও স্বার্থপরতা, বিনা পয়সায় অপরের শ্রমের ফসল ভোগ, হারামখোরী, সত্যের পথে লোকদের বাধা প্রদান তাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কুরআনুল করীম ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে তাদের এই অবস্থার খুবই ভোলাখুলি ও পূর্ণাঙ্গ ছবি এঁকেছে এবং বলেছে যে, নৈতিক অবনতি, মানবিক অধঃপতন ও সামাজিক অনাচার-অরাজকতার মধ্যে তারা কোন্ স্তরে অবস্থান করছিল এবং কোন্ ও কী কারণে তারা চিরদিনের জন্য বিশ্বের নেতৃত্ব ও পৃথিবীর তাবৎ জাতিগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব করবার অধিকার হারাল।

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগে য়াহুদী ও খ্রিস্টানদের পারস্পরিক ঘৃণা ও শত্রুতা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, এদের এক পক্ষ অপর পক্ষকে লাঞ্ছিত, অপমানিত ও হেনস্তা করতে, প্রতিপক্ষ থেকে আপন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিশোধ নিতে এবং বিজিত পক্ষের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করতে কোন রকম কসুর করত না। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে য়াহুদীরা এন্টিয়কে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সম্রাট ফোকাস এই বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশে বিখ্যাত সমর অধিনায়ক বোনোসূস (Bonosus)-কে প্রেরণ করেন। তিনি গোটা য়াহূদী বসতিকে এভাবে উচ্ছেদ করেন যে, হাজার হাজার য়াহদীকে তলোয়ারের মুখে নিক্ষেপ করে, শত শত লোককে নদীবক্ষে ডুবিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে এবং আরও বহু লোককে হিংস্র পর মুখে নিক্ষেপ করে শেষ করেন। ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে ইরানীরা যখন শাম দেশ (সিরিয়া, লেবানন, জর্দান ও ফিলিস্তীনসহ বিস্তীর্ণ ভূভাগ। এখন থেকে আমরা শাম-এর পরিবর্তে সিরিয়া ব্যবহার করব। -আনুবাদক) জয় করে তখন য়াহুদীদের পরামর্শ ও প্ররোচনায় সম্রাট খসরূও খ্রিস্টানদের ওপর বর্বরোচিত অত্যাচার চালান এবং অধিকাংশ খ্রিস্টানকে হত্যা করেন। ইরানীদের ওপর বিজয় লাভের পর সম্রাট হেরাক্লিয়াস আহত ও নিপীড়িত খ্রিস্টানদের পরামর্শে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে য়াহূদীদের থেকে ভীষণ প্রতিশোধ গ্রহণ করেন এবং তাদেরকে এমনভাবে কচুকাটা করেন যে, গোটা রোম সাম্রাজ্যে কেবল সেই সব য়াহুদীই প্রাণরক্ষায় সমর্থ হয়েছিল যারা দেশ থেকে পালাতে কিংবা কোথাও আত্মগোপন করতে সক্ষম হয়েছিল।১ খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর বিরাজমান এই দুই মহান ধর্মের অনুসারীদের এই নৃশংসতা, বর্বরতা ও রক্তপিয়াসী মানসিকতার কাছে কি এ আশা করা যেত যে, তাদের শাসনামলে তারা মানবতার রক্ষক হিসেবে নিজেদেরকে প্রমাণ। করবেন এবং সত্য, সুবিচার, শান্তি ও সমঝোতার পয়গাম দুনিয়াবাসীকে শোনাবেন?

[১. বিস্তারিত জানতে চাইলে দ্র. কিতাব আল-খুতুল মাকরীযিয়্যা; ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৯২ এবং The Arabs conquest of Egypt. p. 133-34. ]