hadith book logo

মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?

লেখকঃ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫১

জাহেলিয়াতের সংক্ষিপ্ত চিত্র

পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে পাঠক পরিমাপ করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবকালে দুনিয়ার অবস্থা এমন একটি ঘরের মতই ছিল যার ভিত্তি এক প্রবল ভূমিকম্প দুর্বল ও নড়বড়ে করে দিয়েছিল। প্রতিটি বস্তু ছিল স্থানচ্যুত ও সামঞ্জস্যহীন। এই ঘরের সাজ-সরঞ্জাম সব ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিল। ভাঙাচোরার হাত থেকে বেঁচে যাওয়াগুলোর আকার-আয়তন পাল্টে গিয়েছিল। এক জায়গার জিনিস আরেক জায়গায় গিয়ে পড়ে ছিল। কোথাও সামানের স্থূপ, আবার কোথাও একেবারে খালি। দর্শক সেখানে এমন সব মানুষ দেখতে পেত যাদের চোখে তাদের নিজেদের অস্তিত্বই ছিল নগণ্য ও মূল্যহীন। তারা গাছপালা, প্রস্তরখণ্ড ও পানির পূজা করতে শুরু করেছিল, এমন কি তারা নিষ্প্রাণ ও জড় বস্তুমাত্রকেই পূজা করতে শুরু করেছিল। তাদের বিকৃতি এ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, দৈনন্দিন জীবনের স্থল সত্যগুলো বুঝতেও তারা অক্ষম ছিল। তাদের চিন্তাশক্তিও বিশৃংখল ও বিস্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। তাদের অনভূতি ভুল পথে চলছিল। স্কুল ও সহজবোধ্য জ্ঞানও তাদের কাছে সূক্ষ্ম ও অবোধগম্য এবং সূক্ষ্ম ও অবাধ্যগুলোও তাদের কাছে স্থূল ও সহজবোধ্য পরিণত হয়েছিল। নিশ্চিত ও অকাট্য বিষয়ও তাদের কাছে সন্দেহযুক্ত এবং সন্দেহ ও সংশয়যুক্ত বিষয়ও তাদের কাছে নিশ্চিত ও অকাট্য বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। তাদের রুচি বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। ফলে তিক্ত ও বিস্বাদ জিনিসও সুস্বাদু এবং সুস্বাদু জিনিসও তাদের কাছে তিক্ত ও বিস্বাদ বলে বোধ হচ্ছিল। তাদের অনুভূতি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে বন্ধু ও শুভাকাক্ষীর সঙ্গে শত্রুতা এবং শক্র ও অশুভাকাঙক্ষীর সঙ্গে ছিল তাদের বন্ধুত্ব।

সমাজের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। এ যেন গোটা বিশ্বেরই একটি ছোট সংস্করণ! প্রতিটি বস্তুই ভুল আকার-আকৃতিতে ও ভুল স্থানে চোখে পড়বে। এই সমাজে নেকড়ে বাঘকে মেষপালের রাখালী করতে দেওয়া হয়েছিল আর বানরকে দেওয়া হয়েছিল পিঠা ভাগ করতে। এই সমাজে দুরাচারী অপরাধীরা ছিল সৌভাগ্যবান ও পরিতৃপ্ত আর সদাচারী চরিত্রবান লোকেরা ছিল দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট। সদাচরণ ও সচ্চরিত্রতার চাইতে বড় অপরাধ ও বোকামি আর অসচ্চরিত্র ও অসদাচরণের চাইতে বড় যোগ্যতা ও গুণ এ সমাজে আর কিছুই ছিল না।

এ সমাজের আচার-আচরণ ছিল ধ্বংসাত্মক যা এই দুনিয়াটাকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। মদ পান, মস্তানি, চরিত্রহীনতা, উন্মত্ততা, সুদখোরী, লুটপাট, ছিনতাই ও অর্থলিপ্সা চরমে পৌঁছেছিল। নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয়েছিল। শিশুদেরকে তাদের শৈশবেই হত্যা করা হতো। রাজা-বাদশাহরা আল্লাহর মালকে হাতের ময়লা এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে তাদের ক্রীতদাস মনে করত। সাধু-সন্তরা খোদা সেজে বসেছিল। লোকের মাল না-হক খেত, ওড়াত এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে ফেরানো ছাড়া তাদের আর কোন কাজ ছিল না।

আল্লাহপ্রদত্ত মানবীয় গুণাবলীকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে নষ্ট অথবা অপাত্রে ব্যয় করা হচ্ছিল। এর থেকে কোন উপকার গ্রহণ বা সঠিক স্থানেই তা ব্যবহার করা হচ্ছিল না। শৌর্য-বীর্য জুলুম-যবরদস্তিতে, উদারতা ও বদান্যতা অপব্যয় -অপচয়ে, গায়রত ও আত্মমর্যাদাবোধ জাহেলী অহমিকায়, মেধা প্রতারণা ও অপকৌশলে রূপান্তরিত হয়েছিল। জ্ঞানবুদ্ধির কাজ কেবল এটাই ছিল যে, অপরাধের নিত্য-নতুন কৌশল উদ্ভাবন করবে এবং প্রবৃত্তির পরিতৃপ্তির নতুন নতুন পথ খুঁজে বের করবে।

মানুষ ও মূল্যবান মানবীয় সম্পদ বহুকাল থেকেই নষ্ট হচ্ছিল। মানুষই ছিল এমন এক কাঁচামাল যার ভাগ্যে অভিজ্ঞ কোন কারিগর জোটে নি যিনি তা থেকে সংস্কৃতির বিশুদ্ধ অবকাঠামো তৈরি করতে পারতেন। এ ছিল যেন কাঠের তক্তার স্কুপ যা বৃষ্টিতে ভিজে ও রোদে পুড়ে নষ্ট হচ্ছিল। এমন কেউ ছিল না যিনি এগুলো জোড়া দিয়ে যিন্দেগীর জাহাজ নির্মাণ করতেন।

সংগঠিত ও সুশৃংখল জাতিগোষ্ঠীর স্থলে ভেড়ার কয়েকটি পাল চোখে পড়ত যার কোন রাখাল ছিল না। রাজনীতি ছিল সেই উটের ন্যায় যার নাকে দড়ি নেই। অর্থাৎ বল্গাহীন আর শক্তি ছিল এমন এক তলোয়ার যা এক পাড়-মাতালের হাতে গিয়ে পড়েছিল যদ্বারা সে স্বয়ং নিজেকে এবং নিজ সন্তান ও ভাইদেরকে আহত ও ক্ষতবিক্ষত করছিল।