hadith book logo

কিতাবুস্ সালাত

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭১

সালাতুল ইসিত্মস্কা বা পানি চাওয়ার সালাত

ইসিত্মস্কা শব্দের অর্থ হচ্ছে, পানি প্রার্থনা করা। পারিভাষিক অর্থে অনাবৃষ্টিজনিত কারণে আল্লাহর নিকট পানি প্রার্থনা উপলক্ষে জামাআত সহকারে যে সালাত আদায় করা হয় তাকে সালাতুল ইসিত্মস্কা বলে।

ইসিত্মস্কা সালাতের নিয়ম :

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা এক ব্যক্তি জুমু‌‘আর দিন মসজিদে প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। লোকটি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দিকে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! (বৃষ্টির অভাবে) ধনসম্পদ নষ্ট হয়ে গেল এবং রাস্তা-ঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আপনি আল্লাহর নিকট দু‘আ করুন, যেন তিনি আমাদেরকে বৃষ্টি দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর দু’হাত তুলে দু‘আ করলেন এবং উপস্থিত লোকেরাও তাঁর সাথে হাত তুলে এভাবে দু‘আ করল,

اَللّٰهُمَّ أَغِثْنَا ، اَللّٰهُمَّ أَغِثْنَا ، اَللّٰهُمَّ أَغِثْنَا

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা আগিসনা, আল্লা-হুম্মা আগিসনা, আল্লা-হুম্মা আগিসনা।

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন। (৩ বার) [সহীহ বুখারী, হা/১০১৪; সহীহ মুসলিম, হা/৮৯৭; নাসাঈ, হা/১৫১৮।]

অন্য বর্ণনায় রয়েছে,

اَللّٰهُمَّ اسْقِنَا ، اَللّٰهُمَّ اسْقِنَا ، اَللّٰهُمَّ اسْقِنَا

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাসক্বিনা-, আল্লা-হুম্মাসক্বিনা-, আল্লা-হুম্মাসক্বিনা-।

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে পানি দান করুন। [সহীহ বুখারী, হা/১০১৩; নাসাঈ, হা/১৫১৭; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৪২৩।] (৩ বার)

আনাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! তখন আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মেঘও নেই, মেঘের সামান্য অংশও নেই, এমনকি সাল‘আ পর্বতের আশপাশের ঘর-বাড়ি ও আমাদের মধ্যে কিছুই নেই। এমতাবস্থায় হঠাৎ সাল‘আ পর্বতের ওপাশ থেকে মেঘ উঠে এলো এবং আকাশের মাঝ বরাবর এসে তা বিস্তৃত হলো। তারপর খুব বৃষ্টি বর্ষণ হলো। (বৃষ্টি এত অধিক হলো যে) আল্লাহর কসম! আমরা এক সপ্তাহ পর্যন্ত সূর্য দেখতে পাইনি। এরপর পরবর্তী জুমু‌‘আয় সে দরজা দিয়ে এক ব্যক্তি প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন দাঁড়ানো অবস্থায় খুৎবা দিচ্ছিলেন। ব্যক্তিটি তাঁর দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! (অত্যধিক বৃষ্টির কারণে) ধনসম্পদ (বিশেষ করে গৃহপালিত পশু) নষ্ট হয়ে গেল এবং রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে গেল। তাই আপনি আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন, তিনি যেন বৃষ্টি বন্ধ করে দেন। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন দু’হাত তুললেন এবং উপস্থিত লোকেরাও তাঁর সাথে হাত তুলে দু‘আ করল,

اَللّٰهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا ، اَللّٰهُمَّ عَلَى الْاَ كَامِ وَ الظِّرَابِ وَ بُطُوْنِ الْاَوْدِيَةِ وَ مَنَابَةِ الشَّجَرَةِ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা হাওয়া-লাইনা ওয়ালা- ‘আলাইনা, আল্লা-হুম্মা ‘আলাল আকা-মি ওয়ায্যিরা-বি ওয়াবুতূনিল আওদিয়াতি ওয়ামানা-বাতিশ শাজারাহ্।

শাব্দিক অর্থ : اَللّٰهُمَّ হে আল্লাহ! حَوَالَيْنَا আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় (বর্ষণ করুন) وَلَا عَلَيْنَا আমাদের উপর নয়। اَللّٰهُمَّ হে আল্লাহ! عَلَى الْاَ كَامِ উঁচু ভূমিতে وَ الظِّرَابِ ও পাহাড়-পর্বতে, وَ بُطُوْنِ الْاَوْدِيَةِ উপত্যকা অঞ্চলে وَ مَنَابَةِ الشَّجَرَةِ এবং বনাঞ্চলে (বর্ষণ করুন)।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় (বর্ষণ করুন), আমাদের উপর নয়। হে আল্লাহ! উঁচু ভূমিতে ও পাহাড়-পর্বতে, উপত্যকা অঞ্চলে এবং বনাঞ্চলে (বর্ষণ করুন)। [সহীহ বুখারী, হা/১০১৩; নাসাঈ, হা/১৫১৫; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৭৮৮; মিশকাত, হা/৫৯০২।]

বর্ণনাকারী বলেন, তখন বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল এবং আমরা রৌদ্রে চলাফেরা করতে শুরু করলাম। [সহীহ বুখারী, হা/১০২৯; বায়হাকী, হা/৬২৪২।]

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা লোকেরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে অনাবৃষ্টি এবং দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করল। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি দিন নির্দিষ্ট করে সূর্যোদয়ের পর মিম্বার সহকারে ঈদগাহে গেলেন এবং মিম্বারে বসলেন, তারপর তিনি তাকবীর দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, তোমরা তোমাদের এলাকার দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করেছ। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে তাঁর কাছে দু‘আ করতে বলেন এবং তিনি তোমাদের দু‘আ কবুল করার ওয়াদা করেছেন। তারপর তিনি এ দু‘আ পাঠ করেন,

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ ‐ اَلرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ ‐ مٰلِكِ يَوْمِ الدِّيْنِ ‐ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ يَفْعَلُ مَا يُرِيْدُ ‐ اَللّٰهُمَّ أَنْتَ اللهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ الْغَنِىُّ وَنَحْنُ الْفُقَرَاءُ أَنْزِلْ عَلَيْنَا الْغَيْثَ وَاجْعَلْ مَا أَنْزَلْتَ لَنَا قُوَّةً وَّبَلَاغًا إِلٰى حِيْنٍ

উচ্চারণ : আলহামদু লিল্লা-হি রাবিবল আলামীন। আর রাহমা-নির রাহীম। মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন। লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু, ইয়াফ‘আলু মা-ইউরীদু, আল্লা-হুম্মা আনতাল্লা-হু লা-ইলা-হা ইল্লা- আনতাল গানীয়্যু ওয়া নাহনুল ফুকারা-উ, আনযিল আলাইনাল গায়সা ওয়াজ‘আল মা-আনযালতা লানা কূওয়াতাওঁ ওয়া বালা-গান ইলা-হীন।

শাব্দিক অর্থ : اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ সমসত্ম প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। رَبِّ الْعَالَمِيْنَ যিনি সারা জাহানের প্রতিপালক। اَلرَّحْمٰنِ যিনি পরম করুণাময় ও الرَّحِيْمِ অতীব দয়ালু। مٰلِكِ যিনি মালিক يَوْمِ الدِّيْنِ বিচার দিনের। لَا إِلٰهَ (প্রকৃতপক্ষে) কোন উপাস্য নেই إِلَّا اللهُ আল্লাহ ছাড়া। يَفْعَلُ তিনি তাই করেন مَا يُرِيْدُ যা তিনি ইচ্ছা করেন। اَللّٰهُمّ হে আল্লাহ! أَنْتَ اللهُ আপনিই আল্লাহ, لَا إِلٰهَ কোন উপাস্য নেই إِلَّا أَنْتَ আপনি ব্যতীত। الْغَنِىُّ আপনি পরমুখাপেক্ষীহীন وَنَحْنُ الْفُقَرَاءُ আর আমরা ফকীর, أَنْزِلْ عَلَيْنَا আপনি আমাদের উপর নাযিল করুন الْغَيْثَ বৃষ্টি وَاجْعَلْ مَا أَنْزَلْتَ لَنَا এবং যা নাযিল করবেন তাতে আমাদের জন্য বানিয়ে দিন قُوَّةً শক্তির উৎস وَبَلَاغًا এবং উপকারী إِلٰى حِيْنٍ এক যুগ পর্যমত্ম।

অর্থ : সমসত্ম প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। যিনি সারা জাহানের প্রতিপালক। যিনি অতীব দয়ালু ও করুণাময়। বিচার দিনের মালিক। আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন উপাস্য নেই। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই করেন। হে আল্লাহ! আপনিই আল্লাহ, আপনি ব্যতীত কোন প্রকৃত উপাস্য নেই। আপনি পরমুখাপেক্ষীহীন আর আমরা ফকীর-মিসকীন, আপনি আমাদের উপর বৃষ্টি নাযিল করুন এবং যা নাযিল করবেন তাতে আমাদের জন্য এক যুগ পর্যমত্ম শক্তির উৎস ও উপকারী বানিয়ে দিন।

দু‘আ পাঠ করার সময় দু’হাত এতটা তুললেন যে, তাঁর বগলের সাদা অংশ দেখা যেতে লাগল। তারপর তিনি লোকদের দিকে পিঠ ফিরালেন এবং কিবলামুখী হয়ে নিজের চাঁদর উল্টালেন, তখনো তিনি দু’হাত উঠানো অবস্থায় ছিলেন। তারপর তিনি আবার লোকদের দিকে মুখ করলেন এবং মিম্বার হতে নেমে তাদেরকে নিয়ে দু’রাক‘আত সালাত আদায় করলেন, ফলে প্রচুর বৃষ্টি হলো। বৃষ্টির কারণে লোকদের ছুটাছুটি দেখে তিনি এত হাসলেন যে, তাঁর সামনের দাঁত বেরিয়ে পড়ল। [আবু দাউদ, হা/১১৭৫; মুসত্মাদরাকে হাকেম, হা/১২২৫; মুসত্মাখরাজে ইবনে আবু আওয়ানা, হা/২০২৭; বায়হাকী, হা/৬২০২; মিশকাত, হা/১৫০৮।]

উপরোক্ত হাদীসদ্বয়ের মাধ্যমে জানা গেল যে,

১. ইসিত্মস্কার সালাত মসজিদে এবং মাঠে যে কোন স্থানে আদায় করা যায়।

২. ইসিত্মস্কার দু‘আ করার সময় কিবলামুখী হওয়া শর্ত নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ খুৎবা চলাকালীন সময় কিবলামুখী ছিলেন না। তবে অন্যান্য সময় কিবলামুখী হওয়াই উত্তম।

৩. ইসিত্মস্কার সালাত জামাআতবদ্ধভাবে আদায় করতে হয়।

৪. ইসিত্মস্কার সালাতের জন্য দিন নির্ধারণ করা যায়।

৫. ইসিত্মস্কার সালাতে খুৎবা প্রদান করতে হয়।

৬. ইসিত্মস্কার সালাত ময়দানে আদায়কালে মিম্বার নিয়ে যাওয়া উত্তম।

৭. ইসিত্মস্কার দু‘আর সময় দু’হাত উত্তোলন করতে হয়।

৮. ইমাম সাহেবকে মিম্বারে উঠে ইসিত্মস্কার দু‘আ পাঠ করতে হয়।

৯. এ সালাতের জন্য কোন আযান-ইকামত নেই।

ইসিত্মস্কার আরো দুটি দু‘আ :

اَللّٰهُمَّ اسْقِ عِبَادَكَ وَبَهَائِمَكَ وَانْشُرْ رَحْمَتَكَ وَأَحْىِ بَلَدَكَ الْمَيِّتَ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাসক্বি ইবা-দাকা ওয়া বাহাইমাকা ওয়ানশুর রাহমাতাকা ওয়া আহয়ি বালাদাকাল মাইয়্যিত।

শাব্দিক অর্থ : اَللّٰهُمَّ হে আল্লাহ! اِسْقِ তুমি পানি পান করাও عِبَادَكَ তোমার বান্দাদেরকে وَبَهَائِمَكَ এবং তোমার জমত্মুদেরকে وَانْشُرْ এবং ছড়িয়ে দাও رَحْمَتَكَ তোমার রহমত। وَأَحْىِ আর (বৃষ্টি দ্বারা) জীবিত করে দাও بَلَدَكَ الْمَيِّتَ তোমার মৃত শহরকে ।

অর্থ : হে আল্লাহ! তুমি তোমার বান্দাদেরকে ও জমত্মুদেরকে পানি পান করাও এবং তোমার রহমত ছড়িয়ে দাও। আর তোমার মৃত শহরকে (বৃষ্টি দ্বারা) জীবিত করে দাও। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/৪৪৯; আবু দাউদ, হা/১১৭৮; বায়হাকী, হা/৬২৩৪; জামেউস সগীর, হা/৮৭৯৫; মিশকাত, হা/১৫০৬।]

اَللّٰهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مُّغِيْثًا مَّرِيْئًا مَّرِيْعًا نَّافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ عَاجِلًا غَيْرَ أٰجِلٍ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাসক্বিনা গাইছান মুগীছান মারীআম মারী‘আন্না-ফি‘আন, গাইরা যা-র্রিন ‘আ-জিলান গাইরা আ-জিল।

শাব্দিক অর্থ : اَللّٰهُمَّ হে আল্লাহ! اسْقِنَا غَيْثًا مُّغِيْثًا তুমি আমাদেরকে এমন বৃষ্টি দাও, مَّرِيْئًا مَّرِيْعًا যা ফসল উৎপাদনের উপযোগী, نَّافِعًا কল্যাণকর, غَيْرَ ضَارٍّ ক্ষতিকারক নয়, عَاجِلًا শীঘ্র আগমনকারী, غَيْرَ أٰجِلٍ বিলম্বকারী নয়।

অর্থ : হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে এমন বৃষ্টি দাও, যা ফসল উৎপাদনের উপযোগী, কল্যাণকর, ক্ষতিকারক নয়, শীঘ্র আগমনকারী ও বিলম্বকারী নয়। [আবু দাউদ, হা/১১৭১; সহীহ ইবনে খুযাইম, হা/১৪১৬; মুসত্মাদরাকে হাকেম, হা/১২২২; মিশকাত, হা/১৫০৭।]