hadith book logo

কিতাবুস্ সালাত

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৮

সালাতের মাধ্যমে গোনাহ মাফ হয়

সালাত গোনাহের কাফফারা স্বরূপ :

عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ -ﷺ - قَالَ : الصَّلَاةُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ اِلَى الْجُمُعَةِ كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ مَا لَمْ تُغْشَ الْكَبَائِرُ

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমু‘আ হতে অপর জুমু‘আর মধ্যবর্তী সময়ের গোনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়, যদি কবীরা গোনাহসমূহ হতে বেঁচে থাকা হয়। [সহীহ মুসলিম, হা/৫৭২; মুসনাদে আবু ই‘আলা, হা/৬৪৮৬।]

পানি যেমন ময়লা দূর করে, সালাত তেমন গোনাহ মিটিয়ে দেয় :

عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ اَنَّهٗ سَمِعَ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ يَقُوْلُ : اَرَاَيْتُمْ لَوْ اَنَّ نَهَرًا بِبَابِ اَحَدِكُمْ يَغْتَسِلُ فِيْهِ كُلَّ يَوْمٍ خَمْسًا مَا تَقُوْلُ ذٰلِكَ يُبْقِيْ مِنْ دَرَنِهٖ؟ قَالُوْا : لَا يُبْقِيْ مِنْ دَرَنِهٖ شَيْئًا قَالَ فَذٰلِكَ مِثْلُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ يَمْحُو اللهُ بِهَا الْخَطَايَا

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমাদের কারো বাড়ির সামনে যদি একটি নদী থাকে এবং সে ঐ নদীতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোন ময়লা থাকতে পারে? সাহাবারা বললেন, না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সালাতের উদাহরণও অনুরূপ। সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা বান্দার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। [সহীহ বুখারী, হা/৫২৮, সহীহ মুসলিম, হা/১৫৫৪; তিরমিযী, হা/২৮৬৮; নাসাঈ, হা/৪৬২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৯১১; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১৭২৬; দারেমী, হা/১২২১; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩৫২; মিশকাত, হা/৫৬৫।]

গাছের শুকনো পাতার ন্যায় সালাত আদায়কারীর গোনাহ ঝরে পড়ে :

عَنْ اَبِيْ ذَرٍّ ، اَنَّ النَّبِيَّ ﷺ خَرَجَ زَمَنَ الشِّتَاءِ وَالْوَرَقُ يَتَهَافَتُ ، فَاَخَذَ بِغُصْنَيْنِ مِنْ شَجَرَةٍ ، قَالَ : فَجَعَلَ ذٰلِكَ الْوَرَقُ يَتَهَافَتُ ، قَالَ : فَقَالَ : يَا اَبَا ذَرٍّ قُلْتُ : لَبَّيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ . قَالَ : اِنَّ الْعَبْدَ الْمُسْلِمَ لَيُصَلِّي الصَّلَاةَ يُرِيْدُ بِهَا وَجْهَ اللهِ ، فَتَهَافَتُ عَنْهُ ذُنُوْبُهٗ كَمَا يَتَهَافَتُ هٰذَا الْوَرَقُ عَنْ هٰذِهِ الشَّجَرَةِ

আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ একদিন শীতকালে বাইরে বের হলেন। তখন গাছের (শুকনো) পাতা ঝরছিল। এ সময় তিনি গাছ হতে দুটি ডাল ভেঙ্গে নিলেন। এতে পাতাগুলো আরো অধিক ঝরতে লাগল। তখন নবী ﷺ বললেন, হে আবু যর! আমি উত্তর দিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। তিনি বললেন, নিশ্চয় মুসলিম বান্দা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সালাত আদায় করে, তখন তার গোনাহসমূহ ঐভাবে ঝরতে থাকে যেভাবে এই পাতাগুলো ঝরছে। [মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৫৯৬; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩৮৪; মিশকাত, হা/৫৭৬।]

সালাতের মাধ্যমে গোনাহ মাফ হওয়ার দৃষ্টান্ত :

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি কোন একজন অপরিচিতা নারীকে চুম্বন করে ফেলে। তারপর সে নবী ﷺ এর কাছে এসে তার কৃতকর্মের কথা জানায়। তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতটি নাযিল করলেন-

﴿اَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ اِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذٰلِكَ ذِكْرٰى لِلذَّاكِرِيْنَ﴾

আর তুমি দিনের দু’প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে সালাত কায়েম করো; নিশ্চয় সৎকর্ম পাপকর্মকে মিটিয়ে দেয়। উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য এটি একটি মহা উপদেশ। (সূরা হূদ- ১১৪)

এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর সে ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এ উপহার কি শুধু আমার জন্য? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমার উম্মতের সকলের জন্য। [সহীহ বুখারী, হা/৫২৬, সহীহ মুসলিম, হা/৭১৭৭; তিরমিযী, হা/৩১১৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৬৫৩; দারেমী, হা/৪৮৩; ইবনে মাজাহ, হা/১৩৯৮; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১৭২৯; মিশকাত, হা/৫৭৫।]

এ হাদীসে যার কথা বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন একজন ঈমানদার লোক। স্বেচ্ছায় তিনি কোন পাপ কাজ করতেন না। তারপরও মানুষ হিসেবে স্বাভাবিক প্রবৃত্তির তাড়নায় একদিন পথিমধ্যে একটি পাপকর্ম করে ফেলেন। এ পাপকর্ম ঘটে যাওয়ার পর তার অনুভূতি ফিরে এল। তিনি তীব্র অনুশোচনা করতে লাগলেন। আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার উপায় বের করার আশায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট এসে বললেন, আমি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। সুতরাং আমাকে শাস্তি দিন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তার পাপের বিবরণ শুনে সূরা হুদের এ আয়াতটি পাঠ করে শোনালেন। আয়াতের মধ্যে মুমিন ব্যক্তিকে দিনে রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েমের হুকুম দেয়া হয়েছে। এরপর বলা হয়েছে, ‘‘নিশ্চয় সৎকর্ম পাপকে মিটিয়ে দেয়।’’ এ কথা শোনার পর তাঁর মনে শান্তি ফিরে এল এবং উদ্বেগ দূর হয়ে গেল।

عَنْ اَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : كُنْتُ عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ فَجَاءَهٗ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ اِنِّيْ اَصَبْتُ حَدًّا فَاَقِمْهُ عَلَيَّ قَالَ وَلَمْ يَسْاَلْهُ عَنْهُ قَالَ وَحَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَصَلّٰى مَعَ النَّبِيِّ ﷺ فَلَمَّا قَضَى النَّبِيُّ ﷺ الصَّلَاةَ قَامَ اِلَيْهِ الرَّجُلُ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ اِنِّيْ اَصَبْتُ حَدًّا فَاَقِمْ فِيَّ كِتَابَ اللهِ قَالَ اَلَيْسَ قَدْ صَلَّيْتَ مَعَنَا قَالَ نَعَمْ قَالَ فَاِنَّ اللهَ قَدْ غَفَرَ لَكَ ذَنْبَكَ ، اَوْ قَالَ حَدَّكَ

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি নবী ﷺ এর কাছে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আসলো এবং বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হদ্দ (শাস্তিযোগ্য অপরাধ) করে ফেলেছি, সুতরাং আমার উপর শাস্তি প্রয়োগ করুন। এ সময় সালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেল। নবী করীম ﷺ যখন সালাত শেষ করলেন, তখন সে দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হদ্দ এর কাজ করে ফেলেছি। আমার প্রতি আল্লাহর কিতাবে নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করুন। উত্তরে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তুমি কি আমাদের সাথে সালাত আদায় করনি? সে বলল, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমার গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। [সহীহ বুখারী, হা/৬৮২৩; সহীহ মুসলিম, হা/৭১৮২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৩২০; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩১১; মিশকাত, হা/৫৬৭।]

এসব হাদীস দ্বারা এটা পরিমাপ করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবাগণকে কত উঁচু মানের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, যার ফলে তারা কোন পাপকাজ করে ফেললে অস্থির হয়ে যেতেন।