১
কিতাবুস্ সালাত
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৫৩
জামাআত বর্জন করার পরিণতি
১. জামাআত বর্জনকারীরা কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত হবে :
﴿يَوْمَ يُكْشَفُ عَنْ سَاقٍ وَّيُدْعَوْنَ اِلَى السُّجُوْدِ فَلَا يَسْتَطِيْعُوْنَ ‐ - خَاشِعَةً اَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ - وَّقَدْ كَانُوْا يُدْعَوْنَ اِلَى السُّجُوْدِ وَهُمْ سَالِمُوْنَ﴾
যেদিন পায়ের গোছা প্রকাশ পাবে (কিয়ামতের কঠিন মুসিবত আসবে) এবং মানুষকে সিজদা করার জন্য ডাকা হবে, তখন তারা সিজদা করতে পারবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত হয়ে যাবে, অপমান তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। কারণ দুনিয়াতে তাদেরকে সিজদা করার জন্য ডাকা হতো; কিন্তু তারা নিরাপদ থাকা সত্ত্বেও সাড়া দিত না। (সূরা কালাম- ৪২, ৪৩)
قَالَ الْمُفَسِّرُوْنَ : يَسْجُدُ الْخَلْقُ كُلُّهُمْ لِلّٰهِ سَجْدَةً وَاحِدَةً ، وَيَبْقَى الْكُفَّارُ وَالْمُنَافِقُوْنَ يُرِيْدُوْنَ أَنْ يَّسْجُدُوْا فَلَا يَسْتَطِيْعُوْنَ؛ لِأَنَّ أَصْلَابَهُمْ تَيَبَّسَتْ فَلَا تَلِيْنُ لِلسُّجُوْدِ
মুফাসসিরীনে কেরাম বলেছেন, (হাশরের ময়দানে) আল্লাহর সকল সৃষ্টি তাকে সিজদা করবে; কিন্তু কাফির এবং মুনাফিকরা সিজদা করতে পারবে না। তারা সিজদা করতে ইচ্ছা করবে কিন্তু সক্ষম হবে না। কেননা সেদিন তাদের মেরুদন্ড কাঠের মতো শক্ত হয়ে যাবে, সুতরাং তা সিজদার জন্য ঝুঁকতে পারবে না। [তাফসীরে ফাতহুল কাদীর, ৭/২৮৯।]
২. জামাআত বর্জনকারীদের প্রতি নবীর ক্ষোভ :
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ ، اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ : وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهٖ لَقَدْ هَمَمْتُ اَنْ اٰمُرَ بِحَطَبٍ فَيُحْطَبَ ثُمَّ اٰمُرَ بِالصَّلَاةِ فَيُؤَذَّنَ لَهَا ثُمَّ اٰمُرَ رَجُلًا فَيَؤُمَّ النَّاسَ ثُمَّ اُخَالِفَ اِلٰى رِجَالٍ فَاُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوْتَهُمْ وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهٖ لَوْ يَعْلَمُ اَحَدُهُمْ اَنَّهٗ يَجِدُ عَرْقًا سَمِيْنًا ، اَوْ مِرْمَاتَيْنِ حَسَنَتَيْنِ لَشَهِدَ الْعِشَاءَ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ। আমি ইচ্ছা করছি, জ্বালানী কাঠ একত্র করার আদেশ করব। তারপর আদেশ করব যাতে সালাতের জন্য আযান দেয়া হয়। তারপর কোন ব্যক্তিকে আদেশ করব, সে যেন লোকদের ইমামতি করে। তারপর আমি বাড়িতে অবস্থানকারী ঐ সকল লোকের কাছে যাব (যারা জামাআতে হাযির হয়নি)। তারপর তাদের ঘরগুলো জ্বালিয়ে দেব। সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, যদি তাদের কেউ এ কথা জানত যে, সে হাড্ডির সাথে সংযুক্ত মোটাতাজা মজাদার গোশ্ত পাবে, অথবা বকরীর উত্তম দুটি খুর পাবে, তাহলে তারা অবশ্যই এশার সালাতের জামাআতে হাযির হতো। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/২৯০; সহীহ বুখারী, হা/৬৪৪; মুসলিম, হা/১৫১৩; আবু দাউদ, হা/৫৪৮; নাসাঈ, হা/৮৪৮; ইবনে মাজাহ, হা/৭৯১; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৩২৪; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৪১৯৬।]
একজন রহমতের নবী হয়েও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। জামাআতে সালাত আদায় করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না হলে নবী ﷺ এরকম ইচ্ছা পোষণ করতেন না। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, একজন মানুষের ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গেলে যত ক্ষতি হয়; তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় জামাআতের সাথে সালাত না আদায় করার কারণে।
আফসোস এ যুগের মুসলিমদের জন্য, যারা জামাআতে সালাত আদায় করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং যারা অনুধাবন করতে পারছে না যে, তারা জামাআত ছেড়ে কতটুকু ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
৩. অন্ধকেও ছাড় দেয়া হয়নি :
عَنِ ابْنِ اُمِّ مَكْتُومٍ اَنَّهٗ سَاَلَ النَّبِىَّ -ﷺ - فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ اِنِّىْ رَجُلٌ ضَرِيْرُ الْبَصَرِ شَاسِعُ الدَّارِ وَلِى قَائِدٌ لَا يُلَائِمُنِىْ فَهَلْ لِىْ رُخْصَةٌ اَنْ اُصَلِّىَ فِىْ بَيْتِىْ قَالَ : هَلْ تَسْمَعُ النِّدَاءَ ؟ قَالَ نَعَمْ . قَالَ : لَا اَجِدُ لَكَ رُخْصَةً
আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা তিনি নবী ﷺ কে প্রশ্ন করলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একজন অন্ধ ব্যক্তি। আমি বাড়িতে অবস্থান করি। আমার এমন কোন লোক নেই যে, আমাকে মসজিদে নিয়ে যাবে। অতএব আমার জন্য এমন কোন ছাড় আছে কি যে, আমি আমার বাড়িতেই সালাত আদায় করতে পারব? তখন তিনি বললেন, তুমি কি আযান শুনতে পাও? আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাহলে আমি তোমার জন্য কোন ছাড় দিতে পারছি না। [আবু দাউদ, হা/৫৫২; ইবনে মাজাহ, হা/৭৯২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৯০৩।]
নবী ﷺ এর এ বাণী শোনার পর সাহাবীরা যেভাবেই হোক মসজিদে এসে উপস্থিত হতেন এবং জামাআতে সালাত পড়তেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, অন্ধ লোককেও বাড়িতে সালাত আদায়ের অনুমতি দেয়া হয়নি। এখন যারা সুস্থ্য, দেখতে পায়, চলতে পারে তারা কীভাবে বাড়িতে সালাত আদায় করতে পারে?
৪. ওজর ছাড়া জামাআত ত্যাগ করা যাবে না :
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ -ﷺ - : مَنْ سَمِعَ الْمُنَادِىَ فَلَمْ يَمْنَعْهُ مِن اِتِّبَاعِهٖ عُذْرٌ . قَالُوْا وَمَا الْعُذْرُ؟ قَالَ : خَوْفٌ اَوْ مَرَضٌ لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ الصَّلَاةُ الَّتِى صَلّٰى
ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আযান শুনে কোন ওজর ব্যতীত মসজিদে না গিয়ে একাকী সালাত আদায় করে, তার এ সালাত গ্রহণযোগ্য হবে না। লোকেরা বলল, ওজর বলতে কী বুঝায়? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ভয় ও রোগ। [আবূ দাঊদ, হা/৫৫১; দার কুতনী, হা/১৫৫৭; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮৯৬; সুনানে বায়হাকী, হা/৪৮২৬।]
ভয় অর্থ হলো প্রাণের ভয়। দুশমন, হিংস্র জন্তু অথবা বিষাক্ত সাপ-বিচ্ছুর কারণে এ ভয় হতে পারে। আর রোগের অর্থ হলো এমন রোগ, যে রোগের কারণে মসজিদ পর্যন্ত যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৫. একাকী সালাত আদায়কারীর উপর শয়তান চেপে বসে :
عَنْ اَبِىْ الدَّرْدَاءِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ - يَقُولُ : مَا مِنْ ثَلَاثَةٍ فِىْ قَرْيَةٍ وَلَا بَدْوٍ لَا تُقَامُ فِيْهِمُ الصَّلَاةُ اِلَّا قَدِ اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَعَلَيْكَ بِالْجَمَاعَةِ فَاِنَّمَا يَأْكُلُ الذِّئْبُ الْقَاصِيَةَ
আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কোন গ্রাম বা জনপদে যদি তিনজন লোক থাকে এবং সেখানে জামাআতের সাথে সালাত কায়েম না হয়, তবে বুঝতে হবে যে, তাদের উপর শয়তানের আধিপত্য রয়েছে। অতএব তোমরা জামাআতকে আঁকড়ে ধরো। কারণ নেকড়ে বাঘ বিচ্ছিন্ন মেষকেই শিকার করে থাকে। [আবূ দাঊদ, হা/৫৪৭; নাসাঈ, হা/৮৪৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৭৫৮, সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৪৮৬; সহীহ ইবনে হিববান, হা/২১০১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৭৬৫; মিশকাত, হা/১০৬৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তাহযীব, হা/৪২৭।]
৬. জামাআত বর্জনকারীরা পথভ্রষ্ট ও মুনাফিক :
عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ مَنْ سَرَّهٗ اَنْ يَلْقَى اللهَ غَدًا مُسْلِمًا فَلْيُحَافِظْ عَلٰى هٰؤُلَاءِ الصَّلَوَاتِ حَيْثُ يُنَادٰى بِهِنَّ فَاِنَّ اللهَ شَرَعَ لِنَبِيِّكُمْ -ﷺ - سُنَنَ الْهُدٰى وَاِنَّهُنَّ مِنْ سُنَنِ الْهُدٰى وَلَوْ اَنَّكُمْ صَلَّيْتُمْ فِى بُيُوتِكُمْ كَمَا يُصَلِّى هٰذَا الْمُتَخَلِّفُ فِى بَيْتِهٖ لَتَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ وَلَوْ تَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ لَضَلَلْتُمْ وَمَا مِنْ رَجُلٍ يَتَطَهَّرُ فَيُحْسِنُ الطُّهُورَ ثُمَّ يَعْمِدُ اِلٰى مَسْجِدٍ مِنْ هٰذِهِ الْمَسَاجِدِ اِلَّا كَتَبَ اللهُ لَهٗ بِكُلِّ خَطْوَةٍ يَخْطُوهَا حَسَنَةً وَيَرْفَعُهٗ بِهَا دَرَجَةً وَيَحُطُّ عَنْهُ بِهَا سَيِّئَةً وَلَقَدْ رَاَيْتُنَا وَمَا يَتَخَلَّفُ عَنْهَا اِلَّا مُنَافِقٌ مَعْلُومُ النِّفَاقِ وَلَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يُؤْتٰى بِهٖ يُهَادٰى بَيْنَ الرَّجُلَيْنِ حَتّٰى يُقَامَ فِى الصَّفِّ
আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আগামীকাল কিয়ামতের দিন মুসলিম হিসেবে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পেতে আনন্দবোধ করে, সে যেন ঐ সালাতের রক্ষণাবেক্ষণ করে, যেসব সালাতের জন্য আযান দেয়া হয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের নবীর জন্য হেদায়াতের পথ বর্ণনা করেছেন। আর জামাআতে সালাত আদায় করাও হেদায়াতের একটি পথ। সুতরাং যদি তোমরা জামাআতে উপস্থিত না হয়ে বাড়িতে সালাত আদায় করে থাক, যেভাবে পেছনে থাকা লোকেরা তাদের বাড়িতে সালাত আদায় করে নেয়, তাহলে তোমরা হেদায়াতের পথ হারিয়ে ফেলবে। আর এভাবে যদি তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নাত পরিত্যাগ কর, তাহলে অবশ্যই হেদায়াতের পথ হারিয়ে ফেলবে।
কোন ব্যক্তি যদি অতি উত্তমভাবে পবিত্রতা অর্জন করে (সালাত আদায় করার জন্য) কোন একটি মসজিদে উপস্থিত হয় তাহলে মসজিদে যেতে সে যতবার পদক্ষেপ ফেলবে তার প্রতিটি পদক্ষেপের পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য একটি নেকী লিখে দেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন এবং একটি করে পাপ মোচন করে দেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, আমরা মনে করি যার মুনাফিকী সর্বজনবিদিত এমন মুনাফিক ছাড়া কেউ-ই জামাআতে সালাত আদায় করা ছেড়ে দিত না। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যামানায় এমন ব্যক্তিও জামাআতে উপস্থিত হতো, যাকে দু’জন মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে এনে সালাতের কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো। [সহীহ মুসলিম, হা/১৫২০; নাসাঈ, হা/৪৮৯; ইবনে মাজাহ, হা/৭৭৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৯৩৬; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/৯৮৮; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৪০৪; মিশকাত, হা/১০৭২।]
﴿يَوْمَ يُكْشَفُ عَنْ سَاقٍ وَّيُدْعَوْنَ اِلَى السُّجُوْدِ فَلَا يَسْتَطِيْعُوْنَ ‐ - خَاشِعَةً اَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ - وَّقَدْ كَانُوْا يُدْعَوْنَ اِلَى السُّجُوْدِ وَهُمْ سَالِمُوْنَ﴾
যেদিন পায়ের গোছা প্রকাশ পাবে (কিয়ামতের কঠিন মুসিবত আসবে) এবং মানুষকে সিজদা করার জন্য ডাকা হবে, তখন তারা সিজদা করতে পারবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত হয়ে যাবে, অপমান তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। কারণ দুনিয়াতে তাদেরকে সিজদা করার জন্য ডাকা হতো; কিন্তু তারা নিরাপদ থাকা সত্ত্বেও সাড়া দিত না। (সূরা কালাম- ৪২, ৪৩)
قَالَ الْمُفَسِّرُوْنَ : يَسْجُدُ الْخَلْقُ كُلُّهُمْ لِلّٰهِ سَجْدَةً وَاحِدَةً ، وَيَبْقَى الْكُفَّارُ وَالْمُنَافِقُوْنَ يُرِيْدُوْنَ أَنْ يَّسْجُدُوْا فَلَا يَسْتَطِيْعُوْنَ؛ لِأَنَّ أَصْلَابَهُمْ تَيَبَّسَتْ فَلَا تَلِيْنُ لِلسُّجُوْدِ
মুফাসসিরীনে কেরাম বলেছেন, (হাশরের ময়দানে) আল্লাহর সকল সৃষ্টি তাকে সিজদা করবে; কিন্তু কাফির এবং মুনাফিকরা সিজদা করতে পারবে না। তারা সিজদা করতে ইচ্ছা করবে কিন্তু সক্ষম হবে না। কেননা সেদিন তাদের মেরুদন্ড কাঠের মতো শক্ত হয়ে যাবে, সুতরাং তা সিজদার জন্য ঝুঁকতে পারবে না। [তাফসীরে ফাতহুল কাদীর, ৭/২৮৯।]
২. জামাআত বর্জনকারীদের প্রতি নবীর ক্ষোভ :
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ ، اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ : وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهٖ لَقَدْ هَمَمْتُ اَنْ اٰمُرَ بِحَطَبٍ فَيُحْطَبَ ثُمَّ اٰمُرَ بِالصَّلَاةِ فَيُؤَذَّنَ لَهَا ثُمَّ اٰمُرَ رَجُلًا فَيَؤُمَّ النَّاسَ ثُمَّ اُخَالِفَ اِلٰى رِجَالٍ فَاُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوْتَهُمْ وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهٖ لَوْ يَعْلَمُ اَحَدُهُمْ اَنَّهٗ يَجِدُ عَرْقًا سَمِيْنًا ، اَوْ مِرْمَاتَيْنِ حَسَنَتَيْنِ لَشَهِدَ الْعِشَاءَ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ। আমি ইচ্ছা করছি, জ্বালানী কাঠ একত্র করার আদেশ করব। তারপর আদেশ করব যাতে সালাতের জন্য আযান দেয়া হয়। তারপর কোন ব্যক্তিকে আদেশ করব, সে যেন লোকদের ইমামতি করে। তারপর আমি বাড়িতে অবস্থানকারী ঐ সকল লোকের কাছে যাব (যারা জামাআতে হাযির হয়নি)। তারপর তাদের ঘরগুলো জ্বালিয়ে দেব। সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, যদি তাদের কেউ এ কথা জানত যে, সে হাড্ডির সাথে সংযুক্ত মোটাতাজা মজাদার গোশ্ত পাবে, অথবা বকরীর উত্তম দুটি খুর পাবে, তাহলে তারা অবশ্যই এশার সালাতের জামাআতে হাযির হতো। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/২৯০; সহীহ বুখারী, হা/৬৪৪; মুসলিম, হা/১৫১৩; আবু দাউদ, হা/৫৪৮; নাসাঈ, হা/৮৪৮; ইবনে মাজাহ, হা/৭৯১; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৩২৪; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৪১৯৬।]
একজন রহমতের নবী হয়েও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। জামাআতে সালাত আদায় করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না হলে নবী ﷺ এরকম ইচ্ছা পোষণ করতেন না। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, একজন মানুষের ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গেলে যত ক্ষতি হয়; তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় জামাআতের সাথে সালাত না আদায় করার কারণে।
আফসোস এ যুগের মুসলিমদের জন্য, যারা জামাআতে সালাত আদায় করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং যারা অনুধাবন করতে পারছে না যে, তারা জামাআত ছেড়ে কতটুকু ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
৩. অন্ধকেও ছাড় দেয়া হয়নি :
عَنِ ابْنِ اُمِّ مَكْتُومٍ اَنَّهٗ سَاَلَ النَّبِىَّ -ﷺ - فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ اِنِّىْ رَجُلٌ ضَرِيْرُ الْبَصَرِ شَاسِعُ الدَّارِ وَلِى قَائِدٌ لَا يُلَائِمُنِىْ فَهَلْ لِىْ رُخْصَةٌ اَنْ اُصَلِّىَ فِىْ بَيْتِىْ قَالَ : هَلْ تَسْمَعُ النِّدَاءَ ؟ قَالَ نَعَمْ . قَالَ : لَا اَجِدُ لَكَ رُخْصَةً
আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা তিনি নবী ﷺ কে প্রশ্ন করলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একজন অন্ধ ব্যক্তি। আমি বাড়িতে অবস্থান করি। আমার এমন কোন লোক নেই যে, আমাকে মসজিদে নিয়ে যাবে। অতএব আমার জন্য এমন কোন ছাড় আছে কি যে, আমি আমার বাড়িতেই সালাত আদায় করতে পারব? তখন তিনি বললেন, তুমি কি আযান শুনতে পাও? আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাহলে আমি তোমার জন্য কোন ছাড় দিতে পারছি না। [আবু দাউদ, হা/৫৫২; ইবনে মাজাহ, হা/৭৯২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৯০৩।]
নবী ﷺ এর এ বাণী শোনার পর সাহাবীরা যেভাবেই হোক মসজিদে এসে উপস্থিত হতেন এবং জামাআতে সালাত পড়তেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, অন্ধ লোককেও বাড়িতে সালাত আদায়ের অনুমতি দেয়া হয়নি। এখন যারা সুস্থ্য, দেখতে পায়, চলতে পারে তারা কীভাবে বাড়িতে সালাত আদায় করতে পারে?
৪. ওজর ছাড়া জামাআত ত্যাগ করা যাবে না :
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ -ﷺ - : مَنْ سَمِعَ الْمُنَادِىَ فَلَمْ يَمْنَعْهُ مِن اِتِّبَاعِهٖ عُذْرٌ . قَالُوْا وَمَا الْعُذْرُ؟ قَالَ : خَوْفٌ اَوْ مَرَضٌ لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ الصَّلَاةُ الَّتِى صَلّٰى
ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আযান শুনে কোন ওজর ব্যতীত মসজিদে না গিয়ে একাকী সালাত আদায় করে, তার এ সালাত গ্রহণযোগ্য হবে না। লোকেরা বলল, ওজর বলতে কী বুঝায়? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ভয় ও রোগ। [আবূ দাঊদ, হা/৫৫১; দার কুতনী, হা/১৫৫৭; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮৯৬; সুনানে বায়হাকী, হা/৪৮২৬।]
ভয় অর্থ হলো প্রাণের ভয়। দুশমন, হিংস্র জন্তু অথবা বিষাক্ত সাপ-বিচ্ছুর কারণে এ ভয় হতে পারে। আর রোগের অর্থ হলো এমন রোগ, যে রোগের কারণে মসজিদ পর্যন্ত যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৫. একাকী সালাত আদায়কারীর উপর শয়তান চেপে বসে :
عَنْ اَبِىْ الدَّرْدَاءِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ - يَقُولُ : مَا مِنْ ثَلَاثَةٍ فِىْ قَرْيَةٍ وَلَا بَدْوٍ لَا تُقَامُ فِيْهِمُ الصَّلَاةُ اِلَّا قَدِ اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَعَلَيْكَ بِالْجَمَاعَةِ فَاِنَّمَا يَأْكُلُ الذِّئْبُ الْقَاصِيَةَ
আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কোন গ্রাম বা জনপদে যদি তিনজন লোক থাকে এবং সেখানে জামাআতের সাথে সালাত কায়েম না হয়, তবে বুঝতে হবে যে, তাদের উপর শয়তানের আধিপত্য রয়েছে। অতএব তোমরা জামাআতকে আঁকড়ে ধরো। কারণ নেকড়ে বাঘ বিচ্ছিন্ন মেষকেই শিকার করে থাকে। [আবূ দাঊদ, হা/৫৪৭; নাসাঈ, হা/৮৪৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৭৫৮, সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৪৮৬; সহীহ ইবনে হিববান, হা/২১০১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৭৬৫; মিশকাত, হা/১০৬৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তাহযীব, হা/৪২৭।]
৬. জামাআত বর্জনকারীরা পথভ্রষ্ট ও মুনাফিক :
عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ مَنْ سَرَّهٗ اَنْ يَلْقَى اللهَ غَدًا مُسْلِمًا فَلْيُحَافِظْ عَلٰى هٰؤُلَاءِ الصَّلَوَاتِ حَيْثُ يُنَادٰى بِهِنَّ فَاِنَّ اللهَ شَرَعَ لِنَبِيِّكُمْ -ﷺ - سُنَنَ الْهُدٰى وَاِنَّهُنَّ مِنْ سُنَنِ الْهُدٰى وَلَوْ اَنَّكُمْ صَلَّيْتُمْ فِى بُيُوتِكُمْ كَمَا يُصَلِّى هٰذَا الْمُتَخَلِّفُ فِى بَيْتِهٖ لَتَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ وَلَوْ تَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ لَضَلَلْتُمْ وَمَا مِنْ رَجُلٍ يَتَطَهَّرُ فَيُحْسِنُ الطُّهُورَ ثُمَّ يَعْمِدُ اِلٰى مَسْجِدٍ مِنْ هٰذِهِ الْمَسَاجِدِ اِلَّا كَتَبَ اللهُ لَهٗ بِكُلِّ خَطْوَةٍ يَخْطُوهَا حَسَنَةً وَيَرْفَعُهٗ بِهَا دَرَجَةً وَيَحُطُّ عَنْهُ بِهَا سَيِّئَةً وَلَقَدْ رَاَيْتُنَا وَمَا يَتَخَلَّفُ عَنْهَا اِلَّا مُنَافِقٌ مَعْلُومُ النِّفَاقِ وَلَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يُؤْتٰى بِهٖ يُهَادٰى بَيْنَ الرَّجُلَيْنِ حَتّٰى يُقَامَ فِى الصَّفِّ
আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আগামীকাল কিয়ামতের দিন মুসলিম হিসেবে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পেতে আনন্দবোধ করে, সে যেন ঐ সালাতের রক্ষণাবেক্ষণ করে, যেসব সালাতের জন্য আযান দেয়া হয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের নবীর জন্য হেদায়াতের পথ বর্ণনা করেছেন। আর জামাআতে সালাত আদায় করাও হেদায়াতের একটি পথ। সুতরাং যদি তোমরা জামাআতে উপস্থিত না হয়ে বাড়িতে সালাত আদায় করে থাক, যেভাবে পেছনে থাকা লোকেরা তাদের বাড়িতে সালাত আদায় করে নেয়, তাহলে তোমরা হেদায়াতের পথ হারিয়ে ফেলবে। আর এভাবে যদি তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নাত পরিত্যাগ কর, তাহলে অবশ্যই হেদায়াতের পথ হারিয়ে ফেলবে।
কোন ব্যক্তি যদি অতি উত্তমভাবে পবিত্রতা অর্জন করে (সালাত আদায় করার জন্য) কোন একটি মসজিদে উপস্থিত হয় তাহলে মসজিদে যেতে সে যতবার পদক্ষেপ ফেলবে তার প্রতিটি পদক্ষেপের পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য একটি নেকী লিখে দেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন এবং একটি করে পাপ মোচন করে দেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, আমরা মনে করি যার মুনাফিকী সর্বজনবিদিত এমন মুনাফিক ছাড়া কেউ-ই জামাআতে সালাত আদায় করা ছেড়ে দিত না। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যামানায় এমন ব্যক্তিও জামাআতে উপস্থিত হতো, যাকে দু’জন মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে এনে সালাতের কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো। [সহীহ মুসলিম, হা/১৫২০; নাসাঈ, হা/৪৮৯; ইবনে মাজাহ, হা/৭৭৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৯৩৬; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/৯৮৮; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৪০৪; মিশকাত, হা/১০৭২।]