১
কিতাবুস্ সালাত
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩০
অযুর আদবসমূহ
১. অযুর পূর্বে মিসওয়াক করা :
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلٰى أُمَّتِيْ لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ وُضُوءٍ
আবু হুরায়রা (রাঃ) নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমার উম্মতের যদি কষ্ট না হতো, তাহলে অবশ্যই আমি তাদেরকে প্রত্যেক অযুর পূর্বে মিসওয়াক করার আদেশ করতাম। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১৪৫; সহীহ বুখারী, হা/৮৮৭, সহীহ মুসলিম, হা/৬১২; আবু দাউদ, হা/৪৬; তিরমিযী, হা/২২; নাসাঈ, হা/৭; ইবনে মাজাহ, হা/২৮৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬০৭।]
২. অঙ্গগুলো ডান দিক থেকে ধৌত করা :
عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ الله عَنْهَا قَالَتْ : كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُعْجِبُهُ التَّيَمُّنُ فِي تَنَعُّلِه وَتَرَجُّلِه وَطُهُوْرِه وَفي شَأْنِه كُلِّه
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে কোন কাজ ডান দিক থেকে শুরু করা নবী ﷺ এর পছন্দনীয় ছিল। যেমন জুতা পরিধান করা, মাথার চুল আঁচড়ানো, পবিত্রতা অর্জন করা, এমনিভাবে সকল কাজ তিনি ডান দিক থেকে শুরু করতেন। [সহীহ বুখারী, হা/১৬৮; বায়হাকী, হা/৯৭৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৫৮৬; বায়হাকী, হা/৪০৮।]
৩. অযুর অঙ্গসমূহ একটু বাড়িয়ে ধৌত করা :
মুস্তাহাব হলো, পরিপূর্ণভাবে অযু করা এবং মাথার অগ্রভাগ পর্যন্ত মুখমন্ডল বেশি করে ধৌত করা। এটাকে اِطَالَةُ الْغُرَّةِ তথা উজ্জ্বলতা দীর্ঘকরণ বলে। আর দু’কনুই ও পায়ের গিঁট বেশি করে ধৌত করা। এটাকে اِطَالَةُ التَّحْجِيْلِ তথা শুভ্রতা দীর্ঘকরণ বলে। আবু হুরায়রা (রাঃ) এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
إِنَّ أُمَّتِي يُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنْ آثَارِ الْوُضُوْءِ فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يُطِيلَ غُرَّتَهُ فَلْيَفْعَلْ
অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আমার উম্মতকে এমন অবস্থায় ডাকা হবে যে, অযুর প্রভাবে তাদের হাত-পা ও মুখমন্ডল থাকবে উজ্জ্বল। তাই তোমাদের মধ্যে যে এ উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নিতে পারে, সে যেন তা করে। [সহীহ বুখারী, হা/১৩৬; সহীহ মুসলিম, হা/৬০৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯১৮৪, ১০৭৮৮; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১০৪৯; জামেউস সগীর, হা/৩৭৬৮; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৭৬; মিশকাত, হা/২৯০।]
আবু হাযেম (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, একদিন আমি আবু হুরায়রা (রাঃ) এর পেছনে ছিলাম। (দেখলাম) তিনি সালাতের জন্য অযু করছেন। তিনি হাতের বগল পর্যন্ত ধুলেন। তখন আমি বললাম, হে আবু হুরায়রা! এটা কেমন ধরনের অযু? তিনি অবাক হয়ে বললেন, হে বনী ফার্রূখ! যদি আমি জানতাম তোমরা এখানে আছো, তাহলে আমি এ ধরনের অযু করতাম না। আমি আমার বন্ধু (রাসূলুল্লাহ ﷺ) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে স্থান পর্যন্ত অযুর পানি পৌঁছবে সে স্থান পর্যন্ত মুমিন ব্যক্তির উজ্জ্বলতা অথবা সৌন্দর্যও পৌঁছবে। [সহীহ মুসলিম, হা/৬০৯; নাসাঈ, হা/১৪৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৮৬৭।]
৪. পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া :
عَنْ أَنَسٍ يَقُوْلُ : كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَغْسِلُ أَوْ كَانَ يَغْتَسِلُ بِالصَّاعِ إِلٰى خَمْسَةِ أَمْدَادٍ، وَيَتَوَضَّأُ بِالْمُدِّ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ কখনো কখনো এক সা‘ হতে পাঁচ মুদ্দ [১ সা = ৪ মুদ, আর এক মুদ প্রায় আধা লিটারের সমান।] পানি দিয়ে গোসল করতেন এবং এক মুদ্দ্ পানি দিয়ে অযু করতেন। [সহীহ বুখারী, হা/২০১; বায়হাকী, হা/৮৮৫; শারহুস সুন্নাহ, হা/২৭৬।]
৫. প্রত্যেক অঙ্গে পানি পৌঁছানো :
অযুর প্রত্যেক অঙ্গে পানি পৌঁছানো অত্যাবশ্যক। যদি সামান্য পরিমাণ স্থানও শুষ্ক থাকে তবে অযু হবে না।
৬. চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো :
মুখমন্ডলের উপর গজানো সমস্ত চুল তথা দাড়ি, গোঁফ, ভ্রু ও দু’চোখের পশমসমূহ ঘন হওয়ার ফলে যদি মুখের চামড়া দেখা না যায়, তাহলে বাহ্যিকভাবে তা ধুয়ে ফেললেই চলবে। আর যদি চামড়া দেখা যায়, তাহলে দাড়ির সাথে চামড়াও ধুয়ে ফেলতে হবে।
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন অযু করতেন তখন তিনি এক অঞ্জলী পানি থুতনীর নিচে দিয়ে তা দ্বারা দাড়ি খিলাল করতেন। [আবু দাউদ, হা/১৪৫; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/২৫০; মু‘জামুল আউসাত, হা/২৯৭৬।]
৭. সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করা :
বিদ্বানগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, মাথা মাসাহ করা ফরয। তবে কতটুকু মাসাহ করলে যথেষ্ট হবে তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
১ম অভিমত : নারী-পুরুষ সকলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করা ওয়াজিব।
২য় অভিমত : মাথার কিছু অংশ মাসাহ করলেই যথেষ্ট হবে।
তবে বিশুদ্ধ অভিমত হলো অযুতে সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করাই ওয়াজিব। কারণ এর দলীল বেশি শক্তিশালী। আর এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান।
৮. কানদ্বয় মাসাহ করা :
মাথার সাথে কানদ্বয় মাসাহ করতে হবে। কেননা দু’কান মাথার অন্তর্ভুক্ত।
৯. তারতীব রক্ষা করা :
তারতীব বা ধারাবাহিকতা হলো অযুর অঙ্গসমূহকে ক্রমান্বয়ে ধারাবাহিকভাবে পবিত্র করা, যেভাবে আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে কারীমায় নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং প্রথমে মুখমন্ডল, তারপর দু’হাত ধৌত করা, এরপর মাথা মাসাহ করা, এরপর দু’পা ধৌত করা। আলিমদের অনেকের মতে এটা মুস্তাহাব। আবার অনেকের মতে এটা ওয়াজিব।
১০. অযুর অঙ্গগুলো তাড়াতাড়ি ধৌত করা :
অযুর অঙ্গগুলো ধৌত করার সময় বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ধৌত করা জরুরি, যেন ধৌত করা অঙ্গটি পরবর্তী অঙ্গ ধৌত করার আগেই শুকিয়ে না যায়। তবে অযুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ধৌত করার ক্ষেত্রে যদি সময়ের সামান্য ব্যবধান হয় তাহলে কোন ক্ষতি নেই। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
১১. অযু করার পর দু‘আ পাঠ করা :
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি উত্তম ও পূর্ণরূপে অযু করবে এবং নিচের দু‘আটি পড়বে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খোলা থাকবে। ফলে সে যেকোন দরজা দিয়ে তাতে প্রবেশ করতে পারবে।
اَشْهَدُ اَنْ لَّا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَحْدَهٗ لَا شَرِيْكَ لَه ، وَاَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهٗ وَرَسُوْلُهٗ
উচ্চারণ : আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহু লা-শারীকালাহু ওয়াআশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়ারাসূলুহ্।
শাব্দিক অর্থ : اَشْهَدُ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, اَنْ لَّا اِلٰهَ কোন উপাস্য নেই اِلَّا اللهُ আল্লাহ ব্যতীত, وَحْدَهٗ তিনি একক, لَا شَرِيْكَ لَهٗ তাঁর কোন শরীক নেই وَاَشْهَدُ এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, أَنَّ مُحَمَّدًا নিশ্চয় মুহাম্মাদ ﷺ عَبْدُهٗ তাঁর বান্দা وَرَسُوْلُهٗ ও রাসূল।
অর্থ : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন মাবূদ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসূল। [সহীহ মুসলিম, হা/ ৫৭৬; আবু দাউদ, হা/১৬৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪৩১; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২২; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১০৫০; বায়হাকী, হা/৩৩৩৪; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২২৪; মিশকাত, হা/২৮৯।]
২. উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি অযু করবে এবং উত্তমভাবে অযু করবে তারপর নিচের দু‘আটি পড়বে, তার জন্য জান্নাতের ৮টি দরজা খুলে দেয়া হবে। অতঃপর সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে। [নাসাঈ, হা/১৪৮; ইবনে মাজাহ, হা/৪৭০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪০১।]
اَشْهَدُ اَنْ لَّا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَحْدَهٗ لَا شَرِيْكَ لَهٗ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهٗ وَرَسُوْلُهٗ ‐ اَللّٰهُمَّ اجْعَلْنِىْ مِنَ التَّوَّابِيْنَ وَاجْعَلْنِىْ مِنَ الْمُتَطَهِّرِيْنَ
উচ্চারণ : আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহূ লা-শারীকালাহূ ওয়াআশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহূ ওয়ারাসূলুহ্। আল্লা-হুম্মাজ‘আল্নী মিনাত্তাওয়া-বীনা, ওয়াজ্‘আল্নী মিনাল্ মুতাত্বাহ্হিরীন।
শাব্দিক অর্থ : اَشْهَدُ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, اَنْ لَّا اِلٰهَ কোন উপাস্য নেই اِلَّا اللهُ আল্লাহ ব্যতীত, وَحْدَهٗ তিনি একক, لَا شَرِيْكَ لَهٗ তাঁর কোন শরীক নেই وَاَشْهَدُ এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, أَنَّ مُحَمَّدًا নিশ্চয় মুহাম্মাদ ﷺ عَبْدُهٗ তাঁর বান্দা وَرَسُوْلُهٗ ও রাসূল। اَللّٰهُمَّ হে আল্লাহ! اجْعَلْنِىْ আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন مِنَ التَّوَّابِيْنَ তাওবাকারীদের وَاجْعَلْنِىْ আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন مِنَ الْمُتَطَهِّرِيْنَ পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের।
অর্থ : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। [তিরমিযী, হা/৫৫; মুজামুল আওসাত, হা/৪৮৯৫; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২২৪।]
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلٰى أُمَّتِيْ لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ وُضُوءٍ
আবু হুরায়রা (রাঃ) নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমার উম্মতের যদি কষ্ট না হতো, তাহলে অবশ্যই আমি তাদেরকে প্রত্যেক অযুর পূর্বে মিসওয়াক করার আদেশ করতাম। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১৪৫; সহীহ বুখারী, হা/৮৮৭, সহীহ মুসলিম, হা/৬১২; আবু দাউদ, হা/৪৬; তিরমিযী, হা/২২; নাসাঈ, হা/৭; ইবনে মাজাহ, হা/২৮৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬০৭।]
২. অঙ্গগুলো ডান দিক থেকে ধৌত করা :
عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ الله عَنْهَا قَالَتْ : كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُعْجِبُهُ التَّيَمُّنُ فِي تَنَعُّلِه وَتَرَجُّلِه وَطُهُوْرِه وَفي شَأْنِه كُلِّه
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে কোন কাজ ডান দিক থেকে শুরু করা নবী ﷺ এর পছন্দনীয় ছিল। যেমন জুতা পরিধান করা, মাথার চুল আঁচড়ানো, পবিত্রতা অর্জন করা, এমনিভাবে সকল কাজ তিনি ডান দিক থেকে শুরু করতেন। [সহীহ বুখারী, হা/১৬৮; বায়হাকী, হা/৯৭৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৫৮৬; বায়হাকী, হা/৪০৮।]
৩. অযুর অঙ্গসমূহ একটু বাড়িয়ে ধৌত করা :
মুস্তাহাব হলো, পরিপূর্ণভাবে অযু করা এবং মাথার অগ্রভাগ পর্যন্ত মুখমন্ডল বেশি করে ধৌত করা। এটাকে اِطَالَةُ الْغُرَّةِ তথা উজ্জ্বলতা দীর্ঘকরণ বলে। আর দু’কনুই ও পায়ের গিঁট বেশি করে ধৌত করা। এটাকে اِطَالَةُ التَّحْجِيْلِ তথা শুভ্রতা দীর্ঘকরণ বলে। আবু হুরায়রা (রাঃ) এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
إِنَّ أُمَّتِي يُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنْ آثَارِ الْوُضُوْءِ فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يُطِيلَ غُرَّتَهُ فَلْيَفْعَلْ
অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আমার উম্মতকে এমন অবস্থায় ডাকা হবে যে, অযুর প্রভাবে তাদের হাত-পা ও মুখমন্ডল থাকবে উজ্জ্বল। তাই তোমাদের মধ্যে যে এ উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নিতে পারে, সে যেন তা করে। [সহীহ বুখারী, হা/১৩৬; সহীহ মুসলিম, হা/৬০৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯১৮৪, ১০৭৮৮; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১০৪৯; জামেউস সগীর, হা/৩৭৬৮; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৭৬; মিশকাত, হা/২৯০।]
আবু হাযেম (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, একদিন আমি আবু হুরায়রা (রাঃ) এর পেছনে ছিলাম। (দেখলাম) তিনি সালাতের জন্য অযু করছেন। তিনি হাতের বগল পর্যন্ত ধুলেন। তখন আমি বললাম, হে আবু হুরায়রা! এটা কেমন ধরনের অযু? তিনি অবাক হয়ে বললেন, হে বনী ফার্রূখ! যদি আমি জানতাম তোমরা এখানে আছো, তাহলে আমি এ ধরনের অযু করতাম না। আমি আমার বন্ধু (রাসূলুল্লাহ ﷺ) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে স্থান পর্যন্ত অযুর পানি পৌঁছবে সে স্থান পর্যন্ত মুমিন ব্যক্তির উজ্জ্বলতা অথবা সৌন্দর্যও পৌঁছবে। [সহীহ মুসলিম, হা/৬০৯; নাসাঈ, হা/১৪৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৮৬৭।]
৪. পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া :
عَنْ أَنَسٍ يَقُوْلُ : كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَغْسِلُ أَوْ كَانَ يَغْتَسِلُ بِالصَّاعِ إِلٰى خَمْسَةِ أَمْدَادٍ، وَيَتَوَضَّأُ بِالْمُدِّ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ কখনো কখনো এক সা‘ হতে পাঁচ মুদ্দ [১ সা = ৪ মুদ, আর এক মুদ প্রায় আধা লিটারের সমান।] পানি দিয়ে গোসল করতেন এবং এক মুদ্দ্ পানি দিয়ে অযু করতেন। [সহীহ বুখারী, হা/২০১; বায়হাকী, হা/৮৮৫; শারহুস সুন্নাহ, হা/২৭৬।]
৫. প্রত্যেক অঙ্গে পানি পৌঁছানো :
অযুর প্রত্যেক অঙ্গে পানি পৌঁছানো অত্যাবশ্যক। যদি সামান্য পরিমাণ স্থানও শুষ্ক থাকে তবে অযু হবে না।
৬. চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো :
মুখমন্ডলের উপর গজানো সমস্ত চুল তথা দাড়ি, গোঁফ, ভ্রু ও দু’চোখের পশমসমূহ ঘন হওয়ার ফলে যদি মুখের চামড়া দেখা না যায়, তাহলে বাহ্যিকভাবে তা ধুয়ে ফেললেই চলবে। আর যদি চামড়া দেখা যায়, তাহলে দাড়ির সাথে চামড়াও ধুয়ে ফেলতে হবে।
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন অযু করতেন তখন তিনি এক অঞ্জলী পানি থুতনীর নিচে দিয়ে তা দ্বারা দাড়ি খিলাল করতেন। [আবু দাউদ, হা/১৪৫; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/২৫০; মু‘জামুল আউসাত, হা/২৯৭৬।]
৭. সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করা :
বিদ্বানগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, মাথা মাসাহ করা ফরয। তবে কতটুকু মাসাহ করলে যথেষ্ট হবে তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
১ম অভিমত : নারী-পুরুষ সকলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করা ওয়াজিব।
২য় অভিমত : মাথার কিছু অংশ মাসাহ করলেই যথেষ্ট হবে।
তবে বিশুদ্ধ অভিমত হলো অযুতে সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করাই ওয়াজিব। কারণ এর দলীল বেশি শক্তিশালী। আর এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান।
৮. কানদ্বয় মাসাহ করা :
মাথার সাথে কানদ্বয় মাসাহ করতে হবে। কেননা দু’কান মাথার অন্তর্ভুক্ত।
৯. তারতীব রক্ষা করা :
তারতীব বা ধারাবাহিকতা হলো অযুর অঙ্গসমূহকে ক্রমান্বয়ে ধারাবাহিকভাবে পবিত্র করা, যেভাবে আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে কারীমায় নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং প্রথমে মুখমন্ডল, তারপর দু’হাত ধৌত করা, এরপর মাথা মাসাহ করা, এরপর দু’পা ধৌত করা। আলিমদের অনেকের মতে এটা মুস্তাহাব। আবার অনেকের মতে এটা ওয়াজিব।
১০. অযুর অঙ্গগুলো তাড়াতাড়ি ধৌত করা :
অযুর অঙ্গগুলো ধৌত করার সময় বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ধৌত করা জরুরি, যেন ধৌত করা অঙ্গটি পরবর্তী অঙ্গ ধৌত করার আগেই শুকিয়ে না যায়। তবে অযুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ধৌত করার ক্ষেত্রে যদি সময়ের সামান্য ব্যবধান হয় তাহলে কোন ক্ষতি নেই। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
১১. অযু করার পর দু‘আ পাঠ করা :
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি উত্তম ও পূর্ণরূপে অযু করবে এবং নিচের দু‘আটি পড়বে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খোলা থাকবে। ফলে সে যেকোন দরজা দিয়ে তাতে প্রবেশ করতে পারবে।
اَشْهَدُ اَنْ لَّا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَحْدَهٗ لَا شَرِيْكَ لَه ، وَاَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهٗ وَرَسُوْلُهٗ
উচ্চারণ : আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহু লা-শারীকালাহু ওয়াআশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়ারাসূলুহ্।
শাব্দিক অর্থ : اَشْهَدُ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, اَنْ لَّا اِلٰهَ কোন উপাস্য নেই اِلَّا اللهُ আল্লাহ ব্যতীত, وَحْدَهٗ তিনি একক, لَا شَرِيْكَ لَهٗ তাঁর কোন শরীক নেই وَاَشْهَدُ এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, أَنَّ مُحَمَّدًا নিশ্চয় মুহাম্মাদ ﷺ عَبْدُهٗ তাঁর বান্দা وَرَسُوْلُهٗ ও রাসূল।
অর্থ : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন মাবূদ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসূল। [সহীহ মুসলিম, হা/ ৫৭৬; আবু দাউদ, হা/১৬৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪৩১; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২২; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১০৫০; বায়হাকী, হা/৩৩৩৪; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২২৪; মিশকাত, হা/২৮৯।]
২. উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি অযু করবে এবং উত্তমভাবে অযু করবে তারপর নিচের দু‘আটি পড়বে, তার জন্য জান্নাতের ৮টি দরজা খুলে দেয়া হবে। অতঃপর সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে। [নাসাঈ, হা/১৪৮; ইবনে মাজাহ, হা/৪৭০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪০১।]
اَشْهَدُ اَنْ لَّا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَحْدَهٗ لَا شَرِيْكَ لَهٗ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهٗ وَرَسُوْلُهٗ ‐ اَللّٰهُمَّ اجْعَلْنِىْ مِنَ التَّوَّابِيْنَ وَاجْعَلْنِىْ مِنَ الْمُتَطَهِّرِيْنَ
উচ্চারণ : আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহূ লা-শারীকালাহূ ওয়াআশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহূ ওয়ারাসূলুহ্। আল্লা-হুম্মাজ‘আল্নী মিনাত্তাওয়া-বীনা, ওয়াজ্‘আল্নী মিনাল্ মুতাত্বাহ্হিরীন।
শাব্দিক অর্থ : اَشْهَدُ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, اَنْ لَّا اِلٰهَ কোন উপাস্য নেই اِلَّا اللهُ আল্লাহ ব্যতীত, وَحْدَهٗ তিনি একক, لَا شَرِيْكَ لَهٗ তাঁর কোন শরীক নেই وَاَشْهَدُ এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, أَنَّ مُحَمَّدًا নিশ্চয় মুহাম্মাদ ﷺ عَبْدُهٗ তাঁর বান্দা وَرَسُوْلُهٗ ও রাসূল। اَللّٰهُمَّ হে আল্লাহ! اجْعَلْنِىْ আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন مِنَ التَّوَّابِيْنَ তাওবাকারীদের وَاجْعَلْنِىْ আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন مِنَ الْمُتَطَهِّرِيْنَ পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের।
অর্থ : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। [তিরমিযী, হা/৫৫; মুজামুল আওসাত, হা/৪৮৯৫; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২২৪।]