hadith book logo

মুখতাসারুল ফিক্হিল ইসলামী

লেখকঃ মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম বিন আব্দুল্লাহ আত্ তুয়াইজিরী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫০

আমাদের জীবনে উক্ত ঈমান প্রতিষ্ঠিত ও ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে হলে, নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখতে হবে।

(এক) আমাদের জানা ও বিশ্বাস রাখা যে, পৃথিবীর দৃশ্যমান বা লুকায়িত, ছোট কিংবা বড় সকলকিছুর স্রষ্টা হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। আকাশসমূহের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। যমীন সমূহের সৃষ্টিকর্তা সে আল্লাহ তাআলাই। আরশে আজীমের সৃষ্টিকর্তাও আল্লাহ গ্রহ-নক্ষত্রের সৃষ্টিকর্তাও তিনিই। পাহাড়, সমুদ্রের স্রষ্টাও তিনিই। মানুষ, জীব-জন্তু, উদ্ভিত-তরুলতার স্রষ্টাও মহান আল্লাহ। জান্নাতের সৃষ্টিকর্তাও সে আল্লাহ তাআলাই। জাহান্নামের সৃষ্টিকর্তাও তিনিই।

اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ ﴿62﴾ ( الزمر : 62)

আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনিই সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। [সূরা যুমার : ৬২।]

আমরা এ বিষয়গুলো সম্পর্কে বলব-আলোচনা করব, শুনব, এগুলো নিয়ে গবেষণা করব এবং জাগতিক ও কুরআনী নিদর্শনাবলির দিকে চিন্তা ও শিক্ষাগ্রহণের দৃষ্টিতে লক্ষ্য করব। এতে আমাদের হৃদয়ে ঈমান প্রগাঢ় হয়ে বসবে, মজবুত হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন।

(১) আল্লাহ বলেন:

قُلِ انْظُرُوا مَاذَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا تُغْنِي الْآَيَاتُ وَالنُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ . سورة يونــس : 101)

বল, ‘আসমানসমূহ ও যমীনে কী আছে তা তাকিয়ে দেখ। আর নির্দশনসমূহ ও সতর্ককারীগণ এমন কওমের কাজে আসে না, যারা ঈমান আনে না’। [সূরা ইউনুস : ১০১।]

(২) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآَنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا . سورة محمد : 24)

তবে কি তারা কোরআন সম্বন্ধে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে? [সূরা মুহাম্মদ: ২৪।]

(৩) অন্যত্র ইরশাদ করেন:

وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آَمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ ﴿124﴾ ( سورة التوبة : 124)

আর যখনই কোন সূরা নাযিল করা হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, ‘এটি তোমাদের কার ঈমান বৃদ্ধি করল’? অতএব যারা মুমিন নিশ্চয় তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়। [সূরা তাওবা:১২৪।]

(দুই) আমাদের জানা ও বিশ্বাস করা প্রয়োজন যে, মহান স্রষ্টা আললাহ তাআলা এ বিশ্বজগত ও সৃষ্টিকুল সৃজন করেছেন এবং তাতে নিদর্শন ও প্রভাব রেখে দিয়েছেন। তিনি চক্ষু সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে রেখে দিয়েছেন নিদর্শন, আর তা হচ্ছে দৃষ্টি শক্তি। কান সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে সৃজন করেছেন নিদর্শন, আর তা হচ্ছে শ্রুতি বা শ্রবন শক্তি। জিহবা সৃষ্টি করেছেন আর তাতে সৃষ্টি করেছেন নিদর্শন, আর সেটি হচ্ছে, কথা। সূর্য সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে সৃষ্টি করেছেন নিদর্শন, আর সেটি হচ্ছে আলো। অগ্নি সৃষ্টি করেছেন আর তাতে সৃজন করেছেন নিদর্শন, আর তা হচ্ছে দাহন। বৃক্ষ সৃষ্টি করেছেন, সাথে সৃষ্টি করেছেন নিদর্শন। সেটি হচ্ছে ফল। এরূপ সকল সৃষ্টিতেই কোন না কোন নিদর্শন রেখেছেন।

(তিন) আমাদের জানা ও বিশ্বাস করা যে, যিনি সমগ্র সৃষ্টিকুলের উপর কর্তৃত্ব করেন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন, তিনি হচ্ছেন একক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ। যার কোন সমকক্ষ ও অংশীদার নেই। আকাশসমূহ ও যমীনে যত সৃষ্টি আছে। ছোট কিংবা বড় প্রত্যেকেই আল্লাহর গোলাম ও তাঁর মুখাপেক্ষী। তারা নিজেরা নিজেদের উপকার, ক্ষতি কিংবা সাহায্যের ক্ষমতা রাখে না। নিজেদের জীবন, মরণ ও পুনরুত্থানের ক্ষমতাও রাখে না। আল্লাহ তাআলাই তাদের মালিক ও তাদের উপর কর্তৃত্বশীল। তারা সকলেই তাঁর মুখোপেক্ষী, তিনি তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রয়োজন মুক্ত। আল্লাহ তাআলা সমগ্র বিশ্বজগত পরিচালনা করেন এবং সৃষ্টিকুলের যাবতীয় বিষয়াদি পর্যবেক্ষন ও নিয়ন্ত্রণ করেন। সুতরাং যিনি আকাশ ও যমীনে কর্তৃত্ব করেন। কর্তৃত্ব করেন পানি ও সমুদ্রে, অগ্নি ও বাতাসে, জীব ও উদ্ভিদে, গ্রহ-নক্ষত্র ও জড় পদার্থে, শাসক ও শাসিতের মাঝে, নেতা ও মন্ত্রীবর্গের মাঝে, ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে, দুর্বল ও শক্তিশালীদের মাঝে , তিনি হচ্ছেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ তাআলা।

আল্লাহ তাআলা স্বীয় শক্তি, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দ্বারা স্বাধীনভাবে কর্তৃত্ব ও পরিচালনা করেন।

কখনো কখনো এমনও হয় যে, কিছু সৃষ্টি করেন আর নিজ ক্ষমতায় তার নিদর্শন উঠিয়ে নেন। যেমন বহু চক্ষু পাওয়া যায় যা দেখে না, অনেক কান দেখা যায় যা শুনেনা, অনেক জিহবা আছে যা কথা বলতে পারে না, অনেক সমুদ্র আছে যা ডুবায় না, অনেক আগুন আছে যা দগ্ধ করে না। এসব (ব্যতিক্রম) আল্লাহ তাআলাই করেছেন। কারণ তিনিই সে সত্তা যিনি স্বীয় সৃষ্টিকুলে নিজ ইচ্ছানুযায়ী কর্তৃত্ব ও পরিচালনা করেন। তিনি ছাড়া আর কোন মা’বুদ নেই, তিনি অদ্বিতীয় মহা পরাক্রমশালী। সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

এমন অনেক হৃদয় আছে যেগুলো বস্ত্ত বিশেষ দ্বারা ঐ বস্ত্তর স্রষ্টা থেকেও অধিক পরিমাণে প্রভাবিত হয়। তাই বস্ত্তর স্রষ্টাকে ভুলে গিয়ে বস্ত্তর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। অথচ দায়িত্বশীলতার পরিচয় হচ্ছে, এ জ্ঞান ও অন্তরদৃষ্টির মাধ্যমে মাখলুক ছেড়ে খালেক কে মূল্যায়ন করা, তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। যিনি একে সৃষ্টি করেছেন এবং আকৃতি দান করেছেন। অতএব আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করব, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করব না।

আল্লাহ তাআলা বলেন :

قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ ﴿31﴾ فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ ﴿32﴾ ( سورة يونس : 31-32)

বল, আসমান ও যমীন হতে কে তোমাদের রিযক দেন? অথবা কে (তোমাদের) শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহের মালিক? আর কে মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন আর জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন? কে সব বিষয় পরিচালনা করেন? তখন তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ’। সুতরাং তুমি বল, ‘তারপরও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?’ অতএব তিনিই আল্লাহ, তোমাদের প্রকৃত রব। অত:পর সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া কী থাকে? অতএব কোথায় তোমাদেরকে ফেরানো হচ্ছে? [সূরা ইউনুস : ৩১-৩২। সূরা আল-হিজর: ২১]

(চার) আমাদেরকে জানা ও বিশ্বাস করা যে, পৃথিবীতে যা কিছু আছে সকল বস্ত্তর ভান্ডার একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছে, তিনি ব্যতীত অন্য কারো নিকট নয়। খাবার, পানীয়, শষ্য-দানা, ফল-ফলাদি, পানি, বাতাস, পণ্য সামগ্রী, সমুদ্র, পাহাড়সহ যাবতীয় বস্ত্তর ভান্ডার আল্লাহর নিকট। সুতরাং আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিষপত্র আল্লাহর নিকটই তালাশ করব। তাঁর নিকটই প্রার্থনা করব। এবং অধিক পরিমাণে তাঁর ইবাদত-আনুগত্য করব। তিনিই সকল প্রয়োজন সম্পন্নকারী, প্রার্থনা মঞ্জুরকারী। তিনিই শ্রেষ্ঠ প্রার্থনার স্থল- সর্বোত্তম দাতা, তিনি যা দান করেন তা প্রতিরোধকারী কেউ নেই, যা নিষেধ করেন তা প্রদানকারী কেউ নেই।

(১) আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন :

وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا عِنْدَنَا خَزَائِنُهُ وَمَا نُنَزِّلُهُ إِلَّا بِقَدَرٍ مَعْلُومٍ . ( سورة الحجر : 21)

আর প্রতিটি বস্ত্তরই ভান্ডারসমূহ রয়েছে আমার কাছে এবং আমি তা অবতীর্ণ করি কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণে। []

(২) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :

وَلِلَّهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ . ( سورة المنافقون : 7)

আর আসমানসমূহ ও যমীনের ধন-ভান্ডার তো আল্লাহরই, কিন্তু মুনাফিকরা তা বুঝে না। [সূরা মুনাফিকূন : ৭।]