hadith book logo

মুখতাসারুল ফিক্হিল ইসলামী

লেখকঃ মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম বিন আব্দুল্লাহ আত্ তুয়াইজিরী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৩

ঈমানদারদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদায় শ্রেণী ভিন্নতা:

সৃষ্টিকুলের ঈমান বিভিন্ন স্তর বিশিষ্ট।

১- ফেরেশতাকুলের ঈমান স্থির-অবিচল। বৃদ্ধিও পায় না আবার হ্রাসও পায় না। তারা মহান আল্লাহ তাআলার কোন নির্দেশই অমান্য করে না। তাদের যা বলা হয় তাই তারা বাস্তবায়ন করে। তারা সকলে একই শ্রেণীভুক্ত নয় বরং তাঁদের মধ্যে স্তর ও মর্যাদায় বিভিন্নতা রয়েছে।

২-নবী ও রাসূলগণের (আলাইহিস সালাম) ঈমান শুধু বৃদ্ধিই পায়- হ্রাস পায় না। কারণ আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তাঁদের ধারণা ও জ্ঞান পরিপূর্ণ ও পরিস্কার। তারাও পরস্পর বিভিন্ন স্তর বিশিষ্ট, সকলে একই স্তরের নন।

৩-সাধারণ মুসলমানদের ঈমান, ইবাদত-আনুগত্যের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় আর পাপ ও অবাধ্যতার কারণে হ্রাস পায়। ঈমানের ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণীভুক্ত। আর ঈমানও বিভিন্ন স্তর বিশিষ্ট।

প্রথম শ্রেণীর ঈমান একজন মুসলমানকে এমনভাবে তৈরী করে এবং এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছে দেয় যে, সে সদা-সর্বদা আল্লাহ তাআলার ইবাদত আদায়ে সচেষ্ট থাকে। আন্তরিকতাপূর্ণ তৎপরতার সাথে সব সময় আনুগত্য প্রকাশ করে। ইবাদতের মাধ্যমে মজা পায় এবং সর্ব প্রকার ইবাদত সর্বাত্মক সংরক্ষণ করে। তার সমপর্যায় বা উপরস্থ লোকদের সাথে উন্নত আচরণ অব্যহত রাখার জন্যে আরো মজবুত ঈমানের প্রয়োজন যা তাকে নিজ ও অন্যের উপর অন্যায়-অবিচার থেকে বিরত রাখবে। আর নিজ থেকে নিম্ন পর্যায়ের লোকদের সাথে যেমন রাজা- প্রজাদের সাথে, পরিবারের প্রধান- তার অধীনস্থদের সাথে, স্বামী- স্ত্রীর সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখার জন্যেও আরো মজবুত ঈমানের প্রয়োজন যা তাকে নিম্নশ্রেণীর লোকদের উপর যুলুম থেকে বাধা প্রদান করবে। যখনই ঈমান বৃদ্ধি পাবে ইয়াক্বীন ও নেকআমলও বৃদ্ধি পাবে। আর বান্দা আল্লাহর হক ও অপরাপর বান্দাদের হক আদায়ে যারপরনাই যত্নবান থাকবে। সে হবে সৃষ্টি ও স্রষ্টার সাথে সদাচরণ ও উত্তম আখলাক প্রদর্শনে অনুকরণীয় নমুনা। এ পর্যায়ের ঈমানবিশিষ্ট ব্যক্তিরা হচ্ছেন দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। এটিই হচ্ছে ইহকাল ও পরকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মর্যাদা।

(২) প্রতিটি মানুষই চলমান, কেউই থেমে নেই। হয়ত উর্ধ্বপানে অথবা নীচের দিকে, হয়ত সম্মুখপানে কিংবা পেছনের দিকে। মানব প্রকৃতি ও শরীয়ত; কোনটিতেই থেমে থাকার কোন বিধান নেই। অতএব মানুষ বলতেই, সে সার্বক্ষনিক কোন না কোন পর্যায় দ্রুততার সাথে অতিক্রম করছে। অগ্রসর হচ্ছে হয়ত জান্নাত পানে অথবা জাহান্নামের দিকে। কেউ দ্রুতগামী, কেউ ধীর গতিতে। কেউ অগ্রসরমান কেউ পিছনে পড়েছে। চলার রাস্তায় কেউ দাঁড়িয়ে নেই; সবাই চলমান। বিভিন্নতা ও ব্যতিক্রম শুধুমাত্র চলার দিক এবং গতির দ্রুততা ও মন্থরতার ক্ষেত্রে।

সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমান ও নেক আমলের মাধ্যমে জান্নাত পানে অগ্রসর হচ্ছে না, অবশ্যই সে কুফর ও বদআমলের কারণে জাহান্নামের দিকে পশ্চাদ্বর্তী হচ্ছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন :-

نَذِيرًا لِلْبَشَرِ ﴿36﴾ لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَتَقَدَّمَ أَوْ يَتَأَخَّرَ ﴿37﴾ ( سورة المدثر : 36-37)

মানুষের জন্য সতর্ককারীস্বরূপ। তোমাদের মধ্যে যে চায় অগ্রসর হতে অথবা পিছিয়ে থাকতে, তার জন্য। [সূরা আল-মুদ্দাসসির : ৩৬-৩৭।]

(৩) ঈমানের অবস্থার ভিত্তিতে ঈমানদারদের মাঝে বড় ধরনের তারতম্য আছে। সুতরাং নবী ও রাসূলগণের ঈমান অন্যদের ঈমানের মত নয়। সাহাবাদের ঈমান অন্যদের ঈমানের মত নয়। নেককার মুমিনদের ঈমান, ফাসেক-পাপিষ্ঠদের ঈমানের মত নয়। এ তারতম্য ও ব্যবধান নির্ণিত হয় অন্তরে আল্লাহ তাআলা, তাঁর নাম ও গুণাবলি, তাঁর কর্ম, এবং বান্দাদের জন্যে তাঁর বিধিত বিষয়াদি সম্পর্কে ধারনা এবং তাঁর ভয় ও তাকওয়ার পরিমাণ অনুপাতে।

(যার অন্তরে এসব বিষয়ে ধারণা ও আল্লাহর তাকওয়া বেশি তার ঈমানের মানও সে অনুপাতে বেশি আর যার ধারণা কম তার ঈমানের মানও সে অনুপাতে কম এবং এভাবে...)

لا إله إلا الله ধারনকারীদের অন্তরে لا إله إلا الله - এর নূরের ব্যবধান একমাত্র আল্লাহ তাআলাই পরিমাপ করতে পারেন। তিনি ব্যতীত এ হিসাব আর কেউ জানে না, জানতে পারে না।

(৪) সৃষ্টিকুলের মধ্যে আল্লাহ সম্পর্কে যাদের ধারনা সবচে বেশি তারাই তাঁকে সর্বাধিক মুহাববত করেন। এ কারণেই নবী- রাসূলগণ মানুষের মধ্যে আল্লাহ তাআলাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন এবং সম্মান করতেন। (সম্মান প্রদর্শন ও ভালবাসার ক্ষেত্রে তাঁরাই ছিলেন মানবশ্রেষ্ঠ। কারণ আল্লাহ সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান ছিল সবদিক থেকে পরিপূর্ণ)

আল্লাহ তাআলাকে তাঁর সত্ত্বা, অনুগ্রহ, সৌন্দর্য ও মহত্বের কারণে ভালবাসা হচ্ছে ইবাদতের মূল উৎস। যখনই ভালবাসা প্রগাঢ় ও শক্তিশালী হবে ইবাদত-আনুগত্যও পরিপূর্ণ হবে। সম্মান প্রদর্শন হবে পূর্ণতাসম্পন্ন আর আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব হবে পূর্ণাঙ্গতর।