hadith book logo

ইসলামের অর্থনীতি

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৮৫

ব্যবসায়ীর দায়িত্ব

বহির্বাণিজ্যের ব্যাপারে নর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্ব রহিয়াছে ব্যবসায়ীর। ব্যবসায়ী একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মনীতির কার্যকারিতার জন্য যথেষ্টভাবে সহায়ক ও পৃষ্ঠপোষক হইতে পারে। ব্যবসায়ী যদি নিজের ব্যবসা সংক্রান্ত লাভ-ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে দেশের অপরিহার্য প্রয়োজন, জনগণের প্রয়োজন ও মানুষের সাধারণ কল্যাণ সাধনের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখে- জনগণের কল্যাণ সাধন নিজের ঈমানের অংশ মনে করে, তাহার নিজের স্বার্থের সহিত দেশের গণস্বার্থের নিবিড় সম্পর্ক আছে বলিয়া যদি প্রতিমুহূর্ত অনুভব করে, দেশের ব্যবসায়ী যদি নিজের প্রকৃত মর্য়যাদা বুঝিয়ে লয় এবং ইসলামী অর্থনীতি কার্যকর করার জন্য যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়,তাহা স্বেচ্ছাপ্রণোদিতগ হইয়া যথাযথভাবেই পালন করিয়া চলে, তবেই একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়িত হইতে পারে।

প্রত্যেকটি মানুষই নিজের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার উদ্দেশ্যে অর্থোৎপাদনের জন্য চেষ্টা ও শ্রম করে। বস্তুত অর্থনৈতিক চেষ্টা সাধনার মূল উৎস এইভাবেই নিহিত রহিয়াছে। ফলে প্রত্যেকেইকেবল নিজের স্বার্থ লক্ষ্য করিয়াই কাজ করে, ইহা অনস্বীকার্য সত্য। এমতাবস্থায় সঠিক কর্মনীতি ইহাই হইতে পারে যে, প্রত্যেকেই নিজের স্বার্থ-লাভের জন্য চেষ্টা ও সাধনা করিবে, কিন্তু এই কাজে কেহই যেন অপরের স্বার্থের কোনরূপ ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখাও কর্তব্য। কারণ তাহার ব্যক্তিগত স্বার্থের সহিত গণস্বার্থেরও নিবিড় যোগ রহিয়াছে।

একজন কৃষক কেবল নিজের খাদ্য প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্যই ভূমি চাষ ক রে না, উৎপন্ন যাবতীয় ফসলই সে নিজের খাদ্য হিমাবে খরচও করে না; অন্যান্য লোক- যাহারা খাদ্যোৎপাদনের পরিবর্তে জীবনযাত্রা নির্বাহের অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনে লিপ্ত রহিয়াছে, তাহাদের খাদ্য-প্রয়োজনও সে উদ্ধৃত্ত শস্য হইতে পূর্ণ করে। এইজন্য সমাজের এইসব লোকের স্বার্থহানি করিয়া কোন কাজ করার সুযোগ কিছুতেই কৃষককে দেওয়া যাইতে পারে না। একজন ব্যবসায়ীরও ঠিক অনুরূপ অবস্থা। পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করার ব্যাপারে ব্যবসায়কে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হইবে- যথেষ্ট মুনাফা লাভেরও তাহাকে সুযোগ দিতে হইবে; কিন্তু পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় ও মুনাফার পরিমাণ নির্ধারণ করার সময় জনগণের প্রয়োজন, ক্রয়-ক্ষমতা এবং দেশের সাধারণ অবস্থার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হইবে। এই সমস্ত কাজে সর্বতোভাবে দেশবাসীর কল্যাণই শোষণ করার কোন অবকাশই ব্যবসায়কে দেওয়া যাইতে পারে না। বিশেষ বিশেষ অবস্থায় পণ্যদ্রব্যের পরিমাণ হ্রাস, কিংবা সঞ্চয় করার ফলে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করিয়া জনগণের শ্রমলব্ধ অর্থ জোকের মত শুষিয়া লওয়ার কোন কৌশলই ইসলাম বরদাশত করে না।

দেশের জন্য কোন প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য যদি বিদেশ হইতে আমদানী করা অপরিহার্য হয়, তবে ইসলামী রাষ্ট্র উহার যথাযথ ব্যবস্থা করিবে। হয় রাষ্ট্র সরাকরী পর্য়ায়ে এই দ্রব্য আমদানী করিবে, অন্যথায় দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য ইহার যথাসম্ভব সুযোগ সুবিধা করিয়া দিবে। এমন ব্যবস্থা করিবে, যেন দেশের আইনের বিধিবন্ধন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ইহার পথে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করিতে না পারে। তখন একজনখাঁটি ইসলামপন্থী ব্যবসায়ীদের কর্তব্য হইবে তাহার আমদানী ও রফতানী বাণিজ্যকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করা এবং ‍ উভয়ের মধ্যে এমনবাবে সামঞ্জস্য বিধান কর যে, দেশের সম্পদ যেন কোনরূপেই দেশান্তরিত হইতে না পারে। এইরূপ করিতে গেলে যদিও তাহার নিজের মুনাফার পরিমাণ অনেকখানি হ্রাস পাইবে- ব্যক্তিগতভঅবেব সে ক্ষতিগ্রস্ত হইবে; কিন্তু তবুও দেশের পক্ষে তাহাই একমাত্র কল্যাণকর নীতি, সন্দেহ নাই।