১
ইসলামের অর্থনীতি
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৬১
বাধ্যতামূলক শ্রম
এতদ্ব্যতীত বাধ্যতামূলক শ্রম (Forced Labour System) প্রথা রাশিয়ার জনগণের জীবনে এক মারাত্মক অভিশাপ হইয়া দেখা দিয়াছে। দাসশ্রমের এই প্রথা রাশিয়ার যাবতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য একান্ত অপরিহার্য হইয়া পড়িয়াছে। বলা বাহুল্য, প্রত্যেক কমিউনিস্ট সমাজেরই ইহা অবিচ্ছেদ্য অংশ হইয়া রহিয়াছে। যুগোশ্লাভ কমিউনিস্ট পার্টির প্রাক্তন সেক্রেটারী জেনারেল ও প্রাক্তন সহ-সভাপতি মিলন জিলাস তাঁহার The New Class নামক বইতে লিখিয়াছেন, ‘সমাজতানিত্রক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অপরিহার্য অবিচ্ছেদ্য ও স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হইতেছে এই বাধ্যতামূলক দাসশ্রম ব্যবস্থা। (১০৬ পৃঃ) তিনি এরা লিখিয়াছেন: সমাজতন্ত্রের যে নূতন শ্রেণী গড়িয়া উঠিয়াছে তাহা শ্রমিক ও কৃষক উভয়েরেই রক্ত শোষণ করিয়া।
স্বরণীয় যে, এই বই লেখার অপরাধে গ্রন্থকারকে কয়েক বৎসর পর্যন্ত কারাগারে বন্দী থাকিতে হইয়াছিল। বস্তুত এই প্রথা ব্যতী রাশিয়ার কোন পরিকল্পনা আজ পর্যন্ত কার্যকর হইতে পারে নাই। কিন্তু ইহার পাশ্চাতে যে রাজনৈতিক কার্যকারণ রহিয়াছে, তাহা আরো মারাত্মক।
রামিয়র হাটে-বাজারে দাস ক্রয়-বিক্রয় হয় না একথা ঠিক, কিন্তু সেখানে যে বিশাল বিরাট জেল ও সুপ্রশস্ত Concetration camps মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইয়া আছে, তাহাতে কয়েদীগণ মধ্যযুগের ক্রীতদাসের অপেক্ষাও মর্মান্তিক অবস্থায় দিন কাটাইতেছে। এই সব ক্যাম্পের একচেটিয়া ঠিকাদার হইতেছে ক্রেমলিন। ইহা অতীত কালের সকল ‘আড়তদার’ কে খতম করিয়া মানুষকে শ্রম করিতে বাধ্য করার এই লাভজনক ব্যবসায়ের আড়তদারির উপর নিরংকুশ কর্তৃত্ব স্থাপন করিয়াছে। এই ঠিকাদার দাস-শ্রমিকদিগকে অপর কোন ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করে না এ কথা সত্য; কিন্তু উহা প্রাদেশিক সরকার এবং বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে ঠিকা-হিসাবে শ্রমিক সরবরাহ করিয়া করে। সেখানে এই দাস-শ্রমিকগণ রুটি-কাপড়ের বিনিময়ে সরকারী পরিকল্পনাসমূহ কার্যকর থাকে। ১৯৪১ সনের বাজেটের ছয় শত কোটি রুবল অর্থোৎপাদনের দায়িত্ব দাস-শ্রমিক পরিবারের পরিচালক রাশিয়ার গোস্টাপ পুলিশ বিভাগের উপর ন্যাস্ত করা হয়। এই পরিমাণ অর্থ হইল সেখানকার মোট বাজেটের শতকরা চৌদ্দ ভাগ। এই সময় এই শিবিরে ২৫-৩৫ লক্ষ লোক দাস-শ্রমিক হিসাবেই কাজ করিতেছিল।
এই সব ক্যাম্পের অধিবাসী দাস-শ্রমিকগণ বাধ্যতামূলত শ্রম হইতে কোনমতেই রেহাই পাইতে পারে না। অসুস্থ হইলেও তাহাকে কাজ করিতে হয় ঠিক জন্তু জানোয়ারের মত। অন্যদিকে তাহাদের জন্য খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজন পুরণের খাতে যথাসম্ভব কম খরচ করা হয। এই ভাবে যথাসম্ভব বেশী মুনাফঅ লাভ করার সর্বাত্মক পুঁজিবাদী নীতি অনুসরণ করিয়াই দাঁড়াইয়া আছে বর্তমান সোভিয়েত রাশিয়া। সেখান মনুষ্যত্বকে চিরদিনের তরে কবর দিয়া চলিয়াছে পণ্যোৎপাদনের যন্ত্র-দানব।
রাশিয়অর রক্ত বিপ্লব মানুষকে যে কোন্ মহা সম্পদ দান করিয়াছে, তাহা বাস্তবিকই বুঝা গেল না। বস্তুত যে শ্রমিক শোষণের মর্মান্তিক বিবরণ দিয়া রাশিয়ায় বিপ্লব সৃষ্টি করা হইল জার শাসিত রামিয়ায়, তাহাতে প্রাচীন জারের পতন হইলেও নির্মম জারতন্ত্রের অবসান তো হয়-ই নায়, বরং পূর্বের তুলনায় উহা আরো কঠিন ও কঠোর হইয়া দাড়াইয়াছে। দুনিয়ার অন্যান্য পুঁজিবাদী সমাজে তাহার বহু কারণ বর্তমান থাকিতে পারে বটে, কিন্তু ইসলামী সমাজে তাহার কোন কারণই কোথায়ও থাকিতে পারে না। তথায় শ্রমিকদের শোষণ করার, বঞ্চিত করার কোন উপায়ই বর্তমান থাকা সম্ভবপর নয়। মজুরগণ ইসলামী সমাজে দাস-শ্রমিক নয়-স্বাধীন মর্যাদাসম্পন্ন ও স্বেচ্ছাপূরণ দেশকর্মী নাগরিক, দেশের সম্পদ উৎপাদনকারী শক্তিমান বাহু। ইসলামী সমাজের মজুর-শ্রমিককে নিঃস্ব সর্বস্ব হইয়া থাকিতে হয় না, উৎপাদন উপায় ও উৎপাদন যন্ত্রের উপর তাহারও মালিকানা অধিকার থাকিতে পারে। শুধু তাহাই নয়, সে যে জিনিসের মালিক স্বীকৃত হইবে, উপযুক্ত কোন কারণ ব্যতীত তাহা তাহার নিকট হইতে হরণ করার অধিকার সমাজ তথা রাষ্ট্র কাহারো নাই। উপরন্তু ইসলামী সমাজের মজুর পেটের দায়ে ক্ষুধার জ্বালায় পাড়িয়া পুঁজিমালিকের ইচ্ছামত কোন শ্রম করিতে উহার বিনিময়ে মালিক পক্ষের ইচ্ছামূলকভাবে নির্দিষ্ট করা মজুরী গ্রহণ করিতে এবং নিজের শ্রমশক্তি কম মূল্যে বিক্রয় করিতে বাধ্য হয় না। ইসলামী অর্থনীতিই মানুষকে- মজুর-শ্রমিক ও জনগণকে- ইসলামী বিধানের অধীন পূর্ণ-স্বাধীনতা দান করে, যাহা দুনিয়অর আর কোন সমাজ-বিধানে লক্ষ্য করা যায় না, তাহা অন্য কোথাও সম্ভবও নয়।
স্বরণীয় যে, এই বই লেখার অপরাধে গ্রন্থকারকে কয়েক বৎসর পর্যন্ত কারাগারে বন্দী থাকিতে হইয়াছিল। বস্তুত এই প্রথা ব্যতী রাশিয়ার কোন পরিকল্পনা আজ পর্যন্ত কার্যকর হইতে পারে নাই। কিন্তু ইহার পাশ্চাতে যে রাজনৈতিক কার্যকারণ রহিয়াছে, তাহা আরো মারাত্মক।
রামিয়র হাটে-বাজারে দাস ক্রয়-বিক্রয় হয় না একথা ঠিক, কিন্তু সেখানে যে বিশাল বিরাট জেল ও সুপ্রশস্ত Concetration camps মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইয়া আছে, তাহাতে কয়েদীগণ মধ্যযুগের ক্রীতদাসের অপেক্ষাও মর্মান্তিক অবস্থায় দিন কাটাইতেছে। এই সব ক্যাম্পের একচেটিয়া ঠিকাদার হইতেছে ক্রেমলিন। ইহা অতীত কালের সকল ‘আড়তদার’ কে খতম করিয়া মানুষকে শ্রম করিতে বাধ্য করার এই লাভজনক ব্যবসায়ের আড়তদারির উপর নিরংকুশ কর্তৃত্ব স্থাপন করিয়াছে। এই ঠিকাদার দাস-শ্রমিকদিগকে অপর কোন ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করে না এ কথা সত্য; কিন্তু উহা প্রাদেশিক সরকার এবং বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে ঠিকা-হিসাবে শ্রমিক সরবরাহ করিয়া করে। সেখানে এই দাস-শ্রমিকগণ রুটি-কাপড়ের বিনিময়ে সরকারী পরিকল্পনাসমূহ কার্যকর থাকে। ১৯৪১ সনের বাজেটের ছয় শত কোটি রুবল অর্থোৎপাদনের দায়িত্ব দাস-শ্রমিক পরিবারের পরিচালক রাশিয়ার গোস্টাপ পুলিশ বিভাগের উপর ন্যাস্ত করা হয়। এই পরিমাণ অর্থ হইল সেখানকার মোট বাজেটের শতকরা চৌদ্দ ভাগ। এই সময় এই শিবিরে ২৫-৩৫ লক্ষ লোক দাস-শ্রমিক হিসাবেই কাজ করিতেছিল।
এই সব ক্যাম্পের অধিবাসী দাস-শ্রমিকগণ বাধ্যতামূলত শ্রম হইতে কোনমতেই রেহাই পাইতে পারে না। অসুস্থ হইলেও তাহাকে কাজ করিতে হয় ঠিক জন্তু জানোয়ারের মত। অন্যদিকে তাহাদের জন্য খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজন পুরণের খাতে যথাসম্ভব কম খরচ করা হয। এই ভাবে যথাসম্ভব বেশী মুনাফঅ লাভ করার সর্বাত্মক পুঁজিবাদী নীতি অনুসরণ করিয়াই দাঁড়াইয়া আছে বর্তমান সোভিয়েত রাশিয়া। সেখান মনুষ্যত্বকে চিরদিনের তরে কবর দিয়া চলিয়াছে পণ্যোৎপাদনের যন্ত্র-দানব।
রাশিয়অর রক্ত বিপ্লব মানুষকে যে কোন্ মহা সম্পদ দান করিয়াছে, তাহা বাস্তবিকই বুঝা গেল না। বস্তুত যে শ্রমিক শোষণের মর্মান্তিক বিবরণ দিয়া রাশিয়ায় বিপ্লব সৃষ্টি করা হইল জার শাসিত রামিয়ায়, তাহাতে প্রাচীন জারের পতন হইলেও নির্মম জারতন্ত্রের অবসান তো হয়-ই নায়, বরং পূর্বের তুলনায় উহা আরো কঠিন ও কঠোর হইয়া দাড়াইয়াছে। দুনিয়ার অন্যান্য পুঁজিবাদী সমাজে তাহার বহু কারণ বর্তমান থাকিতে পারে বটে, কিন্তু ইসলামী সমাজে তাহার কোন কারণই কোথায়ও থাকিতে পারে না। তথায় শ্রমিকদের শোষণ করার, বঞ্চিত করার কোন উপায়ই বর্তমান থাকা সম্ভবপর নয়। মজুরগণ ইসলামী সমাজে দাস-শ্রমিক নয়-স্বাধীন মর্যাদাসম্পন্ন ও স্বেচ্ছাপূরণ দেশকর্মী নাগরিক, দেশের সম্পদ উৎপাদনকারী শক্তিমান বাহু। ইসলামী সমাজের মজুর-শ্রমিককে নিঃস্ব সর্বস্ব হইয়া থাকিতে হয় না, উৎপাদন উপায় ও উৎপাদন যন্ত্রের উপর তাহারও মালিকানা অধিকার থাকিতে পারে। শুধু তাহাই নয়, সে যে জিনিসের মালিক স্বীকৃত হইবে, উপযুক্ত কোন কারণ ব্যতীত তাহা তাহার নিকট হইতে হরণ করার অধিকার সমাজ তথা রাষ্ট্র কাহারো নাই। উপরন্তু ইসলামী সমাজের মজুর পেটের দায়ে ক্ষুধার জ্বালায় পাড়িয়া পুঁজিমালিকের ইচ্ছামত কোন শ্রম করিতে উহার বিনিময়ে মালিক পক্ষের ইচ্ছামূলকভাবে নির্দিষ্ট করা মজুরী গ্রহণ করিতে এবং নিজের শ্রমশক্তি কম মূল্যে বিক্রয় করিতে বাধ্য হয় না। ইসলামী অর্থনীতিই মানুষকে- মজুর-শ্রমিক ও জনগণকে- ইসলামী বিধানের অধীন পূর্ণ-স্বাধীনতা দান করে, যাহা দুনিয়অর আর কোন সমাজ-বিধানে লক্ষ্য করা যায় না, তাহা অন্য কোথাও সম্ভবও নয়।