hadith book logo

ইসলামের অর্থনীতি

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮৮

ধন-বন্টন

ইসলামের শিল্পনীতি ও ভূমি-ব্যবস্থার দীর্ঘ আলোচনা হইতে অর্থোৎপাদনে সংগত পন্থা সম্পর্কে আমরা অবহিত হইয়াছি। এই আলোচনা হইতে আমরা ইহাও জানিতে পারিয়অছি যে, ব্রক্তি-মানুষ সংগত উপায়ে যাহা কিছু উপার্জন করিবে- তাহা নগদ সম্পদই হউক আর জমি-জায়গা ও দালান কোঠাই হউক- সে তার ‘মালিক’ হইবে। এইভাবে ব্যক্তিগত মালিকানার সূত্রে এক-এক ব্যক্তির নিকট বিপুল ধন-সম্পত্তি একীভূত ও কুক্ষিগত হইতে পারে। অথচ এইরূপে ধন-সম্পদের একীভূত হইতে দেওয়া মানব সমাজের পক্ষে যে কত মারাত্মক তাহা কাহারো অবিদিত নয়। ইহারই সুযোগে দুনিয়ার পুঁজিবাদের সৃষ্টি হয় এবং তাহা বিরাট মানবতাকে (Humamity at large) জীবন-যাত্রা নির্বাহের বুনিয়াদী ও অপরিহার্য প্রয়োজন হইতে নির্মমভাবে বঞ্চিত করে।কাজেই ইসলাম বিশ্ব-মানবতার যে স্বাভাবিত ও বিজ্ঞান সম্ত অর্থ ব্যবস্থা উপস্থাপিত করিয়াছে, তাহাতে এইরূপ মানবতা-বিরোধী নীতি কিছুতেই অব্যাহতভাবে চালু থাকিতে পারে না। এইজন্য ইসলাম সকল প্রকার ধন ও সম্পত্তি সম্পর্ক মূলনীতি হিসাবে ঘোষণা করিয়াছে:

(আরবী)

যাবতীয় ধন-সম্পত্তির আবর্তন যেন তোমাদের শুধু ধনিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হ ইয়া না থাকে।

কিন্তু অর্থ এবং সম্পদের উৎপাদন যতই প্রচুর হউক না কেন, উহার বন্টন ব্যবস্থা যদি বিশুদ্ধ নীতি ও নির্ভুল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কার্যকর না হয়, তবে তাহা নির্বিশেষে দেশ ও দেশবাসীর পক্ষে সাংঘাতিক হইতে পারে। বন্টন-ব্যবস্থার ভুল নীতির দরুনই বর্তমান মানুষে-মানুষে আকাশছোঁয়অ বিরোধ ও বৈষম্যের সৃষ্টি হইয়াছে। একদিকে ধনের প্রাচুর্য এবং অপরদিকে দুঃসহ দারিদ্রের সর্বগ্রাসী আক্রমণ মানব-সমাজকে ভারসাম্যহীন (Balanceless) করিয়া একেবারে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করিয়াছে এবং কেবল ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতির পরস্পরের মধ্যেই আজ অনুরূপ বৈষম্য প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে।

অথচ ধন-সম্পদ যদি বাস্তবিকই নির্ভুল ও সুবিচারপূর্ণ পন্থায় বন্টন হইতে পারে, ধন-সম্পদের আবর্তন-উৎপাদন ও বন্টন- যদি বৈজ্ঞানিক ও স্বাভাবিক পন্থায় হয়, স্থায়ী ও সর্বকালের প্রয়োজ্য কোন বিধানের মারফতে হয়, তাহা হইলে সমগ্র পৃথিবীর বুক হইতেই অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত হইতে পারে। একদিকে অর্থ-সম্পদের পর্বত তুষারস্তুপের ন্যায় বিগলিত হইয়া এমন উদ্দাম ঝর্ণাস্রোতরূপে প্রবাহিত হইতে পারে, যাহা নিকট ও দূরের সকল ‘শুষ্ক অঞ্চল’কেই সিক্ত করিতে পারে। একটি অর্থোৎপাদনকারী যন্ত্রের উৎপাদন অসংখ্য খাতে বাহিয়া অসংখ্য মানুষের প্রয়োজন পূর্ণ করিতে পারে।

ইসলামী অর্থনীতিতে ধন-বন্টনের স্বাভাবিক পন্থা অনুযায়ী চারটি প্রধান উপায় অবলম্বন করা হইয়াছে।

(ক) নিজের, পরিবার-পরিজন, পিতামাতা, নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশী সর্বসাধারণ মুসলমানের অধিকার পূর্ণ করার দায়িত্ব পালন।

(খ) সমাজের অক্ষম, অভাবী পংগু ও অর্থোৎপার্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ লোকদের প্রয়োজন পূর্ণকণার্থে অবশ্য দেয়- যাকাত, ছদকা, ফিতরা এবং কুরবানী, সাধারণ দান-খয়রাত ইত্যাদি।

(গ) সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োন পূর্ণ করার জন্য দেয় নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায় করার বাধ্যবাধকতা, প্রয়োজনবশতঃ আরো অধিক দানের কর্তব্য।

(ঘ) মালিকের অন্তর্ধানের পর তাহার যাবতীয় ধন-সম্পদ তাহার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে (ইসলামী বিধান অনুযায়ী) বন্টন করিয়া দেওয়া।