hadith book logo

ইসলামের অর্থনীতি

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬৭

জমির মালিকানা

আল্লাহ তা’আলা সারা জাহানের সৃষ্টিকর্তা এবং একচ্ছত্র মালিক। কিন্তু তাহার এই মালিকানা যে তাঁহার নিজের ভোগ-ব্যবহারের জন্য নয়, তাহ সর্বজনবিদিত। আল্লাহ তা’আলা নিখিল বিশ্বভূবনকে নিজ ইচ্ছায় ও নিজ শক্তির বলেই সৃষ্টি করিয়াছেন: কিন্তু সৃষ্ট জগতের এই অফুরন্ত দ্রব্য-সামগ্রীর কোন একটিও আল্লাহর ভোগ ও ব্যবহারের জন্য দরকার হয় না। তিনি সকল প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে, কোন অভাব ও আবশ্যকতাই তাঁহাতে স্পর্শ করিতে পারে না, তাঁহার সীমাহীন নিরংকুশ ক্ষমতা কেহ সংকুচিত করিতে সক্ষম নয়। বস্তুত তিনি এই সব কিছুই মানুষের কল্যাণের জন্য- মানুষেরই ভোগ-ব্যবহারের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন। অতএব নিখিল জাহানের সৃষ্টি, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন, নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ এবং মানুষের ভোগ-ব্যবহারের নিয়ম-পদ্ধতি প্রণয়নের নিরংকুশ অধিকার প্রয়োগের দিক-দিয়াই আল্লাহর নিরংকুশ মালিকানা স্বীকৃত ও কার্যকর হইবে। আর এইজন্যই মানুষ আল্লাহর দেওয়া বিধান ও পদ্ধতি অনুযায়ী পৃথিবী ভোগ ও ব্যবহার করিয়াছে কিনা, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাঁহার চূড়ান্ত ও পূংখানুপুংখ হিসাব গ্রহণ করিবেন। এই ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা সম্পূর্ণরূপে একক এবং অংশীদারহীন। বস্তুত আল্লাহর তাওহীদী মালিকানার প্রকৃত অর্থ ইহাই। এই কথাই ঘোষণা করা হইয়াছে নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে:

(আরবী)

সেই আল্লাহ তা’আলাই প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করিয়াছেন এবং অতঃপর উহার ব্যবহার ও প্রয়োগের জন্য বিধান ও ব্যবস্তাও দান করিয়াছেন।

সমগ্র পৃথিবী এবং ইহাতে যাহা কিছু আছে, তাহা সবই আল্লাহ তা’আলা মানুষের ভোগ ও ব্যবহারের জন্য, মানুষেরই কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন।

(আরবী)

জমি ও পৃথিবীর বুকে যাহা কিছু রহিয়াছে, আল্লাহ তা’আলা তাহা সবই-হে মানুষ, তোমাদেরই জন্য ‍ সৃষ্টি করিয়াছেন।

আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টি এই জমি ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি বস্তুই মানুষের ভোগ ও ব্যবহারে জন্য নির্দিষ্ট হইয়াছে, তাহা আমরা উক্ত আয়াত হইতে নিঃসন্দেহে জানিত পারি। মানুষ উহা কিভাবে করায়ত্ব করবে এবং কোন নীত ও নিয়মে তাহা ভোগ ও ব্যবহার করিবে, তাহার মূলনীতিও আল্লাহ তা’আলাই দান করিয়াছেন। কুরআন মজীদে সূরা আ’রাফের নিম্নলিখিত আয়অতে তাহার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়অ যায়:

(আরবী)

জমি আল্লাহ তা’আলার, তাঁহার বান্দাদের মধ্য হইতে তিনি যাহাকে ইচ্ছা উহার উত্তরাধিকার দান করেন।

মন রাখিতে হইবে যে, আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা তাঁহারই বিরচিত নিয়মের মূল কথা। অতএব পৃথিবীর ও ভূমির প্রকৃত মালিক আল্লাহ নিজে হইলেও উহার উত্তরাধিকার আল্লাহর দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী মানুষেরই জন্য নির্দিষ্ট। মানুষ আল্লাহর বিধান অনুসারে পৃথিবীর বিভিন্ন উৎপাদক শক্তি ও দ্রব্য-সম্পদ উপার্জন করিবে, করায়ত্ব করিবে এবং ভোগ ও ব্যবহার করিবে। ইহাই হইতেছে আল্লাহর ‘মালিকানা’র অধীন মানুষের ‘মালিকানা’র ব্যবহারিক তাৎপর্য। আল্লাহর মালিকানা সম্পর্কে এই মৌলিক আলোচনার ফলে এ কথা সুস্পষ্ট হইয়াছে যে,

(আরবী) (পৃথিবী আল্লাহর) (আরবী)(পৃথিবীকে আল্লাহ সমগ্র জীবের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন এবং (আরবী) ‘আকাশ এবং পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে, তাহা সবই আল্লাহর- প্রভৃতি আয়াত হইতে ‘জাতীয় মালিকানা’র মার্কসীয় মতবাদ প্রমাণ করিতে চেষ্টা করা এবং ‘জমির মালিক আল্লাহ- কোন ব্যক্তি নয়’ বলিযঅ দেশের যাবতীয় জমিক্ষেত রাষ্ট্রের- আর প্রকৃত পক্ষে ক্ষমতাসীন মুষ্টিমেয় শাসন-কর্তৃপক্ষের নিরংকুশ কর্তৃত্বে সমর্পণ করা সম্পূর্ণ নীতি। তদুপরি এই ভুল নীতিকে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা-হিসাবে পেশ করা ইসলামের উপর কুঠারাঘাত ভিন্ন আর কিছুই নয়।

মানব-সমাজে অর্থনীতির দিক দিয়া ভূীমর যতখানি গুরুত্ব রহিয়াছে, উহার ভোগ ও ব্যবহারের নিয়ম-নীতি-নির্ধারণ করার ব্যাপারে পৃথিবীর মানুষ ততখানি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছে। এই জন্যই দেখা যায়, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মতবাদ- অনুসারে বিভিন্ন প্রকারের ভূীম-ব্যবস্থা চালু রহিয়াছে। ইংলন্ড ও ইউরোপের অন্যান্য কয়েকটি দেশে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে জমির নিরঙ্কুষ মালিকানা –অধিকার দান করা হইয়াছিল; জমি সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের হর্তাকর্তা ছিল তাহারা নিজেরাই। রাষ্ট্র বা দেশের কোটি কোটি জনসাধারণ- কাহারোই কোন অধিকার তাহাতে স্বীকৃত ছিল না। জমির মালিক-জায়গীরদারগণ- কৃষক চাষীদিগকে অল্প-অল্প জমি চাষ করিবার জন্য দিত, চাষীরা তাহাতে যে যে ফসল ফলাইত তাহার অর্ধকেরও বেশী অংশ জমির মালিক জায়গীরদারকে এবং গির্জাকে আদায় করিয়া দিত।নিজেদের ভাগে খুব কম অংশই অবশিষ্ট থাকিত। প্রকৃতপক্ষে তাহারা ছিল ভূমিদাস আর জায়গীরদারগণ ছিল তাহাদের প্রভু ও মালিক। অতঃপর ইউরোপের ভূমি-ব্যবস্থার বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়। তখন ভূমির কৃষি-প্রণালীতে নতুন পদ্ধতি প্রযুক্ত হয় এবং উহর ফলে কৃষি-উৎপন্ন ফসল পূর্বাপেক্ষা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। ইহা দেখিয়া সেকালের বড়বড় পুঁজিমালিকগণ স্বাভাবিকভাবেই ভূমি দখল করিতে শুরু করে। কৃষি-ব্যবস্থায় এই মৌলিক পরিবর্তনের করণে ছোট-ছোট ভুমিচাষীগণ কৃষিক্ষেত হইতে উৎখাত হইতে আরম্ভ করে। তাহাদের ক্ষুদ্র-ক্ষ্রু জমি জমিদারগণ ক্রয় করিয়া কিংবা বলপূর্বক দখল করিয়া করায়ত্ব করিতে শুরু করে এবং বিরাট আকারে জমি চাষ করিয়া তাহা হইতে বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করিতে থাকে। ক্ষুদ্র কৃষকগণ জমি হইতে সম্পূর্ণরূপে বহ্চিত হইয়া শিল্পায়িত শহরের দিকে ধাবিত হয়, বেতার শ্রমিক হিসাবে শিল্প-কারখানার সম্মুখে আসিয়া ভীড় জমাইতে থাক। ভূমির এই সামন্তবাদী-ব্যবস্থায় সমাজের ভূমিহীন মানুষ তথা বিরাট সমাজকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করা হইয়াছে। মানুষের সমষ্টিগত স্বার্থকে ভূমির উপর হইতে উচ্ছেদ করা হইয়াছে।

এই পুঁজিবাদী ভূমি ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ দেখা দিয়াছে সমাজতান্ত্রিক ভূমি-নীতি। ইহার মূল দর্শনে বলা হইয়াছে যে, জমির মালিকানা কোন ব্যক্ত বা গোষ্ঠীর জন্য নয়, সমগ্র সম্পত্তির একচ্ছত্র মালিক হইবে রাষ্ট্র। দেশের প্রত্যেকটি মানুষকে পরিশ্রম করিয়া কেবলমাত্র কাজ করিয়াই রুজীরোজগার করিতে হইবে। ইহাতে জমির মালিকানা হইতে ব্যক্তিকে বঞ্চিত করিয়া তাহাকে রাষ্ট্রের দাসানুদাসে পরিণত করিয়া দেওয়া হইয়াছে।

কিন্তু এই উভয় প্রকার ভূমি ব্যবস্থাই অস্বাভাবিক, অমানুষিক ও বঞ্চনামূলক। প্রথম প্রকার ব্যবস্থায় সমাজ ও জাতি বঞ্চিত এবং দ্বিতীয় প্রকার ব্যবস্থায় ব্যক্তি-মানুষ শুধু বঞ্চিত নয়, নিপীড়িত এবং শোষিতও।…… আর সত্য কথা এই যে, মনুষ্যত্ব ও মানবতা এই উভয় ধরনের সমাজ হইতে একেবারে নির্বাসিত।

ব্যক্তিকে ভূমির একচ্ছত্র মালিক করিয়া দেওয়ার জায়গীরদারী-জমিদারী ব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত ও মর্মান্তিক। অনুরূপভাবে ব্যক্তির অধিকার হিইতে উহা কাড়িয়া লইয়া একান্তভঅবে রাষ্ট্রের নিরংকুশ কর্তৃত্বে সোপর্দ করিয়া দেওয়অর রুশীয় ও চীনা অভিজ্ঞতা আরো অধিক অমানুষিক ও হৃদয়বিদারক। এই কারণে ইসলাম এই উভয় প্রকার ভূমি নীতিকেই অস্বীকার করিয়াছে। ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তি ভূমির মালিক হইতে পারে যদিও নিরংকুশ মালিকানা সে কিছুতেই লাভ করিতে পারে না। তদ্রুপ ভূমির উপর সমাজ ও সমষ্টির অধিকারও ইসলাম স্বীকার করিয়াছে, কিন্তু তাহাও সীমাহীন ও সর্বগ্রাসী নয়, নয় ব্যক্তি-স্বার্থবিরোধী। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ভূমিনীতির দুই সীমান্তের মধ্যবর্তী পথ দিয়া চলিয়াছে ইসলামের ভূমিনীতি। ইসলম আল্লাহ প্রদত্ত আইনের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণাধীন ও সীমাবদ্ধ ইখতিয়ারের পরিবেশে ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকার করিয়াছে। তাহাতে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচার-জুলুম, শোষণ ও বঞ্চনামূলক নীতি গ্রহণ করার বিন্দুমাত্র অধিকার নাই। কৃষক-চাষীকে ক্রীতদাসের ন্যায় খাটাইবারও অধিকার রাষ্ট্রকে দেওয়া হয় নাই। ইসলামের ভূমিনীতিতে চাষাবাদ করিবে, উহার উপর সমাজ ও রাষ্ট্রের যে অংশ নির্দিষ্ট রহিয়াছে, তাহা সে রীতিমত জাতীয বায়তুলমাল-এ আদায় করিতে থাকিবে। কোন ভূমিমালিক নিজে জমি চাষ করিতে সমর্থ না হইলে বা করিতে না চাহিলে সে তাহা অন্য একজনের দ্বারা চাষ করাইবে। কারণ ‘লঙল যাহার, জমি তাহার’ দাবি ইসলামী অর্থনীতির নয়, এই দাবি বা মুলনীতি ঘোষিত হইয়াছে একমাত্র মার্কসীয় দর্শনে এবং চীন ও সোভিযেত রাশিয়ায়। (যদিও কার্যতঃ তাহাও শ্লোগানমাত্র, যাহার বাস্তব রূপ কোথাও দেখা যায় না।) কাজেই জমির মালিক হওয়ার জন্য বা ভোগাধিকার লাভ করার জন্য প্রত্যেককেই নিজের হাতে চাষ করিতে হইবে- ইসলামী অর্থনীতি এন কোন শর্ত আরোপ করে নাই।

কিন্তু দেশের সমস্ত জমিই যদি ব্যক্তির মালিকানা ও ভোগাধিকার ছাড়িয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে সার্বজনীন রাষ্ট্রীয় কাজ ও সামষ্টিক প্রয়োজন পূর্ণ করা নানাভঅবে ব্যাহত হইতে পারে। এইজন্য ইসলামী অর্থনীতি ভূমিহীন লোকদের মধ্যে তাহা বন্টন করা সম্ভব হয়। এতদ্ব্যতীত অসংখ্য রাষ্ট্রীয় নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়েঅজনীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য রাষ্ট্রের স্থায়ী কর্তৃত্বাধীন জায়গা-জমি থাকিতে পারে- থাকা আবশ্যক। এই সব জমিকে মসজিদের সঙ্গে তুলনা করা যাইতে পারে। সরকারী অফিসাদির স্থান, চারণভূমি, পার্ক, রাজপথ, পানিপথ, রেললাইন, সাধারণ ক্রীড়ার স্থান এবং জলাশয় প্রভৃতির জমি ইসলামী হুকুমতে সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন থাকিবে। এই সব জমির উপর কোন নাগরিকেরই ব্যক্তিগত নিরংকুশ মালিকান স্বীকৃত হইতে পারে না। তাহাতে দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের ব্যবহারাধিকার সমানভাবে স্বীকৃত হইবে। কুরআন, হাদীস, ইসলামের ইতিহাস, নবী করীম (ﷺ)-এর নিজস্ব কার্যক্রম এবং খুলাফায়ে রাশেদুনের ভূমিনীতি হইতে আমরা এই তত্ত্বই জানিতে পারি।[শাহ অলীউল্লাহ দিহলভী লিখিয়াছেন: (আরবী)

‘পূর্বে’ যেমন বলিয়াছি, সমস্ত ধনসম্পদই সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর মালিকানা। উহাতে প্রকৃত পক্ষেই কোন মানুষের অধিকার নাই। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা যখন উহা হইতে জনগণের উপকৃত হওয়ার অধিকার স্বীকার করিয়াছেন তখন উহাতে বিরোধের সৃষ্টি হইল। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা এই করা হয় যে, উহাতে অধিকার প্রয়োগ করিতে গিয়া অপর কাহারো ক্ষতি সাধন করিতে পারিবে না।”]