hadith book logo

ইসলামের অর্থনীতি

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৬

জাতীয়করণ নীতির অবৈজ্ঞানিকতা

একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মতাদর্শ হিসাবে জাতীয়করণ নীতি (Nationalization) প্রকৃতপক্ষেই অবৈজ্ঞানিক, মানবতা পক্ষে এতদাপেক্ষা মারাত্মক অভিশাপ আর একটিও হইতে পারে না।

বস্তুত, মানুষের মধ্যে স্বভাবগত যে ‘অহম জ্ঞান’ (Ego) রহিয়াছে তাহা ব্যক্তিগত মালিকানা-সম্পর্কিত ভাবধারার উৎসমূল। একটি শিশু যখন নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের কথা অনুভব করে এবং সে তাহার নিজস্ব শক্তি সম্পন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের কথা অনুভব করে এবং সে তাহার নিজস্ব শক্তি সম্পন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিচালনা করিতে শুরু করে, তখনি তাহার মধ্যে ব্যক্তিগত মালিকানার চেতনা জাগ্রহ হয়। ক্রমশঃ ইহা পরিবর্ধিত হইতে থাকে। যে কারণে মানুষ ‘আমি’, ‘তুমি’ এবং ‘সে’ বলিয়া পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে, ঠিক সেই কারণেই মানুষ ‘আমার’, ‘তোমার’ ও ‘তাহার’ বলিয়া দ্রব্য-সম্পদের উপর অধিকার প্রয়োগের দিক দিয়াও পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য করিতে বাধ্য হয়। ইহারই পরিণামে ‘আমার মালিকানা’ ‘তোমার মালিকানা’ এবং ‘তাহার মালিকানা’র ধারণা মানব-মনে সুস্টষ্ট হইয়া উঠে। এইভাবে মানুষের ‘আমি’ ও ব্যক্তিগত মালিকানার স্বতঃস্ফূর্ত ভাবধারা গোটা সমাজ ও তমুদ্দুনের প্রতি ধমনিতে প্রবাহিত হইতে শুরু করে। মনস্তত্তের বিচারে ইহা এক নির্ভূল ও সর্বজনস্বীকৃত সত্য।

এই স্বভাবগত ভাবধারা শক্তি এত তীব্র যে, ব্যক্তিকে তাহার ব্যক্তিগত মালিকানা অধিকার হইতে বঞ্চিত রাখিয়া হাজার লক্ষগুণ বেশী সুযোগ সুবিধা ও আরাম-আয়েশের সামগ্রী দান করিলেও সে কিছুতেই সন্তুষ্টী হইতে পারিবে না। তাহাকে তাহার নিজ ঘর হইতে বাহির করিয়া কোন উচ্চশ্রেণীর হোটেলে সর্ববিধ আরামের সুবন্দোবস্ত করিয়া দিলেও সে সেখানে at home (বা নিজের বাড়িতে) হওয়ার মত তৃপ্তি কখনও লাভ করিতে পারিবে না। ব্যক্তিগত মালিকানা-সংক্রান্ত ভাবধারা মূলত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত ক্ষমতা ইখতিয়ার লাভের প্রেরণা হইতেই উৎসারিত হইয়া থাকে। কাজেই ব্যক্তিকে এই স্বাধীনতা ও অধিকার হইতে বঞ্চিত রাখিয়া সমস্ত ধন-সম্পত্তিকে জাতীয় মালিকানার অক্টোপাসে বন্দী করিলে তাহা কোন ক্রমেই স্বাভাবিক ব্যবস্থা হইতে পারে না। একজন ব্যক্তিকে সীমাবদ্ধ অধিকার ও স্বাধীনতা দান করে একজন বক্তির স্বতন্ত্র দেহ ও সত্তার স্বীকৃতির অনুরূপ উহার সীমাবদ্ধ মালিকানাকেও স্বীকার করাই প্রকৃতপক্ষে বৈজ্ঞানিক পন্থা। সমাজ বিজ্ঞানের দিকক দিয়া ইহাই এক সুষ্ঠু ব্যবস্থা।

ব্যক্তিগত মালিকানা হরণ করিয়া সর্বগ্রাসী জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় মালিকানা স্থাপন করা যে মানবতার পক্ষে একান্তই মারাত্মক ব্রব্থা, তাহার জ্বলন্ত প্রমাণ বর্তমান দুনিয়ার শ্রেষ্ট ও সর্ববৃহত সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত রাশিয়া।