১
ইসলামের অর্থনীতি
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৮
চিন্তার বিপর্যয়
শুধা তাহাই নহে, বিগত দুই শতাব্দীকাল পর্যন্ত পাশ্চাত্য দর্শন এবং অর্থনীতি যে ভাবধারা ও দৃষ্টিকোণে উৎকর্ষ লাভ করিয়াছে, তাহাতে চিন্তা ঐক্র ও সামঞ্জস্য মাত্রই রক্ষা পায় নাই। উপরন্তু তাহা মানুষের চিন্তা ও কর্মের জগতে বিকেন্দ্রিকতা, বিশ্লিষ্টতা ও নিদারুণ বিপর্যয় সৃষ্টি করিয়া দিয়াছে। সংশয়-সংকুল মানস হইতে যে চিন্তাদারা ফুটিয়া বাহির হয়, তাহাতে ঈমান ও দৃঢ়-প্রত্যয়ের কোন অবকাশই থাকিতে পারে না, আর সন্দেহ-সংকুল চিন্তাধারা হইতে মানুষ কোন স্বস্তি,কোন স্থায়ী কল্যাণ পথের সন্ধান লাভ করিতে পারে না; উহার সাহায্যে জীবনকে কোন নির্দিষ্ট গতিপথে পরিচালিত করা মাত্রই সম্ভব নয়। এই কারণেই অর্থনীতির সমগ্র বিষয়টি এমন অস্পষ্ট, জটিল ও অসমাধ্য হইয়া দেখা দিয়াছে। অর্থনীতির এই দূরবস্থার কথা ‘বারবারা উটন’ (Woothen) ন্যায় বিখ্যাত চিন্তাবিদও স্পষ্ট কণ্ঠে স্বীকার করিয়াছেন। তাঁহার লিখিত Lament for Economics গ্রন্থের কয়েকটি কথা এখানে উদ্ধৃত করা যাইতেছে।
“আমরা আমাদের মূল্যবান সময়ের অধিকাংশই কেবল মতবাদের অস্ত্র তৈয়ার করার কাজে ব্যয় করিতেছি। অথচ বাস্তব কর্মজীবনে উহার প্রয়োগ মাত্রই করা হয় না।”
–“বর্তমান সময় মানুষ যে অর্থবিজ্ঞানের অনুশীলন করতেছ, তাহা হইতে সমাজের কোন কল্যাণ হয় না। আর তাহা সাধারন মানুষের বোধগম্যও নয়।” অর্থশাস্ত্রবিদগণ কখনই একটি কথায় একমত হন না- হইতে পারেন না, এবং বাস্তব কর্মজীবনের সহিত আধুনিক অর্থবিজ্ঞানের কোনই সম্পর্ক নাই।”
এইজন্য বর্তমান সময়ে একদিকে ‘অর্থ দর্শনকেই একমাত্র দর্শন এবং পেট ও অন্ন সমস্যাকেই একমাত্র সমস্যা হিসাবে পেশ করা হইতেছে। অধ্যাপক জোডের ভাষার, “বর্তমান যুগের বিজয়ী দর্শন হইতেছে পেট, পেট বা পকেটেরে দৃষ্টিতেই এ যুগের সব কিছুর বিচার ও যাচাই করা হয়।” অন্যদিকে এ কথাও শুনিতে পাওয়া যায় যে, অর্থনৈতিক সমস্যা বলিতে কোন সমস্যাই কোথাও নাই এবং তাহা জীবনকে কোন দিক দিয়াই প্রভাবান্বিত করিতে পারে না। এই দুইটি মত ও দৃষ্টিকোণ যেমন পরস্পর বিপরীত দুই প্রান্তিকে অবস্থিত; তেমনি এই উভয় প্রকার মত ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃত ব্যাপারের সম্পূর্ণ বিপরীত- ইহা এই প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে চরমতর অজ্ঞতার পরিণতি। অথচ মূলতভাবে কোন বিষয় সম্পর্কে চিন্তার ব্যাপারে ভারসাম্যহীন হইয়া পড়া- কোন একদিকেরও সীমালংঘন করা- মানুষের গবেষণা নীতির বুনিয়াদি ভুল আমাদের মতে চিন্তা গবেষণার এই পদ্ধতি মূলতই ত্রুটিপূর্ণ। অর্থনীতি যে মানব জীবনের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে একটি গুরুতর সমস্যা, তাহাতে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকিতে পারে না। সেই সঙ্গে ইহাও অনস্বীকার্য যে, অর্থনৈতিক সমস্যাই মানব জীবনের একমাত্র সমস্যা নয়, সর্বশ্রেষ্ট বা প্রধানতম সমস্যাও তাহা নয়। আর মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হইয়া গেলেই তাহার সামগ্রিক জীবনের সর্ববিধ সমস্যারও সমাধান আপনা আপনিই হইয়া যাইবে, এই রূপ কথার শুধু বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয় না বরং মহা বিভ্রান্তিরও কারণ হইয়া দাড়ায়। এই কারণে মানব জীবনে পরম সুষ্ঠুতা ও সুসংবদ্ধতা স্থাপনের জন্য একান্তই অপরিহার্য হইতেছে এক সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবন-ব্যবস্থা, যহা একটি কেন্দ্রবিন্দুতে দাড়াইয়া মানুষের সর্ববিধ সমস্যার সুবিচারপূর্ণ সমাধান দিতে সমর্থ হইবে এবং উহার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও অনুরূপ সামঞ্জস্যশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ হইবে।
“আমরা আমাদের মূল্যবান সময়ের অধিকাংশই কেবল মতবাদের অস্ত্র তৈয়ার করার কাজে ব্যয় করিতেছি। অথচ বাস্তব কর্মজীবনে উহার প্রয়োগ মাত্রই করা হয় না।”
–“বর্তমান সময় মানুষ যে অর্থবিজ্ঞানের অনুশীলন করতেছ, তাহা হইতে সমাজের কোন কল্যাণ হয় না। আর তাহা সাধারন মানুষের বোধগম্যও নয়।” অর্থশাস্ত্রবিদগণ কখনই একটি কথায় একমত হন না- হইতে পারেন না, এবং বাস্তব কর্মজীবনের সহিত আধুনিক অর্থবিজ্ঞানের কোনই সম্পর্ক নাই।”
এইজন্য বর্তমান সময়ে একদিকে ‘অর্থ দর্শনকেই একমাত্র দর্শন এবং পেট ও অন্ন সমস্যাকেই একমাত্র সমস্যা হিসাবে পেশ করা হইতেছে। অধ্যাপক জোডের ভাষার, “বর্তমান যুগের বিজয়ী দর্শন হইতেছে পেট, পেট বা পকেটেরে দৃষ্টিতেই এ যুগের সব কিছুর বিচার ও যাচাই করা হয়।” অন্যদিকে এ কথাও শুনিতে পাওয়া যায় যে, অর্থনৈতিক সমস্যা বলিতে কোন সমস্যাই কোথাও নাই এবং তাহা জীবনকে কোন দিক দিয়াই প্রভাবান্বিত করিতে পারে না। এই দুইটি মত ও দৃষ্টিকোণ যেমন পরস্পর বিপরীত দুই প্রান্তিকে অবস্থিত; তেমনি এই উভয় প্রকার মত ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃত ব্যাপারের সম্পূর্ণ বিপরীত- ইহা এই প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে চরমতর অজ্ঞতার পরিণতি। অথচ মূলতভাবে কোন বিষয় সম্পর্কে চিন্তার ব্যাপারে ভারসাম্যহীন হইয়া পড়া- কোন একদিকেরও সীমালংঘন করা- মানুষের গবেষণা নীতির বুনিয়াদি ভুল আমাদের মতে চিন্তা গবেষণার এই পদ্ধতি মূলতই ত্রুটিপূর্ণ। অর্থনীতি যে মানব জীবনের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে একটি গুরুতর সমস্যা, তাহাতে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকিতে পারে না। সেই সঙ্গে ইহাও অনস্বীকার্য যে, অর্থনৈতিক সমস্যাই মানব জীবনের একমাত্র সমস্যা নয়, সর্বশ্রেষ্ট বা প্রধানতম সমস্যাও তাহা নয়। আর মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হইয়া গেলেই তাহার সামগ্রিক জীবনের সর্ববিধ সমস্যারও সমাধান আপনা আপনিই হইয়া যাইবে, এই রূপ কথার শুধু বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয় না বরং মহা বিভ্রান্তিরও কারণ হইয়া দাড়ায়। এই কারণে মানব জীবনে পরম সুষ্ঠুতা ও সুসংবদ্ধতা স্থাপনের জন্য একান্তই অপরিহার্য হইতেছে এক সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবন-ব্যবস্থা, যহা একটি কেন্দ্রবিন্দুতে দাড়াইয়া মানুষের সর্ববিধ সমস্যার সুবিচারপূর্ণ সমাধান দিতে সমর্থ হইবে এবং উহার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও অনুরূপ সামঞ্জস্যশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ হইবে।