hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০১

লিবারেলিজমের উপাদানসমূহ

নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির সমন্বয় প্রোগ্রামের বুনন হয়েছে লিবারেলিজমের সুতোয়। লিবারেলিজম বস্তুত ‘এনলাইটেনমেন্ট’ তত্ত্বের ভিতে গড়া। অর্থনীতিবিদদের ‘গরীবের অভিভাবক’ হবার অনেক বাকবিতণ্ডা সত্ত্বেও তারা এমন কোনো প্রণোদনা ও অনুপ্রেরণা সঞ্চারক ব্যবস্থাপনার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে পারেননি, যাতে শক্তিশালী ও বিত্তশালীদের সমন্বয় প্রক্রিয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়া গরীবের উপর না ফেলে নিজেদের হজম করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যায়। কিন্তু দেখা যায়, গরীব মানুষের জীবনযাত্রার উপর তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুধু পরোক্ষভাবে সামান্য লাঘবের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং তা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ভারসাম্য আনয়নের মাধ্যমে যে অধিকতর প্রবৃদ্ধির আবহ সৃষ্টি হবে তারই উচ্ছিষ্ট হিসেবে আসবে।

আইএমএফ-এর সমন্বয় প্রোগ্রামে নিওক্লাসিক্যাল লিবারেলিজমের যেসব উপাদান প্রস্তাব করা হয়েছে তা হচ্ছেঃ (ক) অর্থনীতিতে সরকারি ভূমিকা হ্রাস; (খ) বাজার অর্থনীতিকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া; (গ) বৈদেশিক বাণিজ্যকে বিমুক্তকরণ। এ মূল লক্ষ্য পূরণের জন্য স্থিতি ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনয়ন করতে হবে। সার্বিক অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক দক্ষতা পরিমার্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণ করতে হবে। অবশ্য বণ্টন ন্যায়পরতার বিষয়টি মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক এডজাস্টমেন্ট বা সমন্বয় সাধনের প্রক্রিয়ায় যে বিরূপ বণ্টন বিষয়ক সমস্যার সৃষ্টি হয়, তার নিরসন বৈদেশিক বা আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তাপুষ্ট প্রোগামের মূল লক্ষ্য থাকে না, যদিও পরোক্ষভাবে কিছু ইতিবাচক ফল লাভ করা যায়। ফলশ্রুতিতে দেখা যায় সদস্য দেশগুলোর উপর আইএমএফ-এর বার্ষিক কনসাল্টেশন রিপোর্টের কোনোটিতেই দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য দূরীকরণ বা প্রাত্যহিক প্রয়োজন পূরণের উপর কোনো আলোচনা নেই। যদি একটি দেশ অভ্যন্তরীন আয় বৈষম্যকে আরো তীব্রতর করে হলেও বৈদেশিক ভারসাম্যহীনতাকে কমাতে পারে, তবে সেটাই আইএমএফ-এর নিকট অভিনন্দনযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, অর্থনীতিতে সরকারি ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ হ্রাস করা হলে কর নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট খাতটি কমানোর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ব্যয়ভার হ্রাস করা সম্ভব হবে। বেসরকারি খাত স্ব-স্বার্থ দ্বারা উদ্বুদ্ধ বিধায় তা অধিকতর কার্যকর ও বৃহত্তর ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে। ঋণ প্রসারের লাগাম টেনে ধরা হলে অভ্যন্তরীণ সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার হ্রাস পাবে। বাজার শক্তিকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়ার ফলে সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারসহ সকল উৎপাদন উপকরণ, পণ্য ও সেবার মূল্য সঠিক হারে সঠিক খাতে প্রবাহিত হবে। বাজার শক্তিসমূহ সঠিক সংকেত পাওয়ার কারণে উৎপাদন উপকরণসমূহ সঠিক খাতে প্রবাহিত হতে থাকবে। অর্থনৈতিক সম্পদের অপচয় হ্রাস পাবে। এ নীতির ফলে অধিকাংশ দ্রব্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি পেলেও, নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতি প্রকৃত মজুরি হ্রাসের এ ধারাকে সমর্থন করে, যদিও সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর উপর এতে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে উচ্চতর কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির মারফত তা পুষিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধা গ্রহণ করে সমন্বয় সাধনকারী উন্নয়নশীল দেশ প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদের সংরক্ষণ নীতিজনিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংকোচন প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারবে। সকল আমদানি বাণিজ্যের বাধা তুলে দিতে হবে। আমদানি ও রপ্তানি উভয়কে উৎসাহিত করতে হবে। বাস্তবসম্মত বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার আমদানি ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। চলতি বাজেট ঘাটতি এতে হ্রাস পাবে। যদি ট্যারিফ ধার্য করতেই হয়, তা হওয়া উচিত নিম্নমাত্রার ও সুষম। কোনো কিছুর প্রতি পক্ষপাতিত্বের দ্বারা বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ সমীচীন হবে না। কেননা এর ফলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে সম্পদ সঞ্চালনে অস্বাভাবিক ও বিকৃত প্রবাহ সৃষ্টি হবে এবং উৎপাদন দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আমদানি প্রতিস্থাপনের জন্য শিল্পায়ন নীতির রয়েছে সীমিত সম্ভাবনা। কেননা এর লক্ষ্য হচ্ছে কেবলমাত্র সীমাবদ্ধ দেশীয় বাজার। অপরদিকে রপ্তানির ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিমাণগত সীমাবদ্ধতা নেই। উদারনৈতিক অর্থনৈতিক মতবাদ সরকারি ব্যয় হ্রাসের আহবান জানালেও বাজেটের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মাঝে অর্থনৈতিক ন্যায়পরতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারি ব্যয়ের বিভিন্ন খাতের মধ্যে বাঞ্ছিত পরিবর্তন আনয়নের সমস্যাটির দিকে আলোকপাত করে না। দরিদ্র জনগণকে মানব সম্পদে পরিণত করার লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহায়ন, যোগাযোগ ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সঞ্চয়ের পন্থা নিরূপণের কোনো দিকনির্দেশক আলোচনা এ উদার নৈতিক মতবাদে দেখা যায় না। এমনকি বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট কর্মসূচির সরবরাহের দিক সংক্রান্ত আলোচনাও প্রধানত সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও রপ্তানির বাস্তবসম্মত মূল্য, সুদের হার, বিনিময় হার এবং করের মাধ্যমে উৎসাহ প্রদানের মাঝে সীমাবদ্ধ। অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যসামগ্রীর সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে অর্থনীতির যে পুনর্গঠনের প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো আলোকপাত নেই। উন্নয়নশীল দেশের সম্পদ বণ্টনের বিশাল সমস্যাটির নিওক্লাসিক্যাল সমাধান দাঁড়ায় এসব দেশের জন্য বস্তুত একটি ক্ষীণ ও অনির্ভরযোগ্য সূত্রের উপর। তা হলো দ্রব্য ও সেবার সঠিক মূল্যের দিয়ে বাজার শক্তিসমূহকে সঠিক সংকেত প্রদান করা।