hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৮৯

শুল্প ও আমদানি বিকল্প

উচ্চ শুল্প হার একধারী তলোয়ারর ন্যায়। যদি কার্যকরভাবে উচ্চ শুল্কহার প্রয়োগ করা যায়, তবে আমদানি নিরুৎসাহিত হয়, কিন্তু রপ্তানি উৎসাহিত হয় না। এতদসত্ত্বেও কোনো উন্নয়নশীল দেশে সামাজিক মূল্যমান পরিবর্তনের লক্ষ্যে নৈতিক সংশোধন ছাড়াই অকার্যকর ও দুর্নীতিপরায়ণ শুল্কব্যবস্থার দ্বারা যদি উচ্চ শুল্কহার কার্যকর করা হয়, তবে আমদানিকৃত দ্রব্যের স্বল্প মূল্য প্রদর্শন (under invoicing), চোরাচালান ও কর ফাঁকি দেয়া বৃদ্দি পায়। এতে উচ্চ করারোপ বাড়ে, কিন্তু চোরাপথে আমদানিকৃত বিলাসদ্রব্যের মুনাফা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পায় এবং প্রকৃত প্রয়োজন পূরণকল্টে সম্পদের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে অধিকতর কার্যকরী পন্থা হলো পূর্বালোচিত বিলাসদ্রব্যের শ্রেণীভুক্ত দ্রব্য ও সেবার আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।

নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদগণের ধারণা মোতাবেক আমদানি বিকল্প শিল্প ততটা খারাপ নাও হতে পারে, যদি করদাতাগণের বিপুল কষ্টের বিনিময়ে অদক্ষ শ্বেতহস্তী সৃষ্টি করা না হয়। যখন পৃথিবীর সকল দেশ এ নীতি অনুসরণ করছে এবং তা অব্যাহত রেখেছে, তখন মুসলিম দেশগুলোর পক্ষে এ নীতি অনুসরণ না করার কোনো যুক্তি নেই। এটি কেবল কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্যই প্রয়োজনীয় নয়, বরং এটি রপ্তানি বৃদ্ধির ব্যাপক ভিত্তি সৃষ্টির জন্যও প্রয়োজন। তবে আমদানি বিকল্প হিসেবে যে শিল্পকে নির্বাচন করা হবে, জটিল প্রশ্ন তার জন্যই। যথাযথ উন্নয়ন দর্শনের অভাবে এ নির্বাচন স্বেচ্ছাচারী হওয়ার এবং মাকাসিদ হাসিল ও সম্পদ বরাদ্দের জাতীয নীতির সাথে সম্পৃক্ত না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। একটি সত্যিকার ইসলামী সমাজে এ দু’টি বিষয়ই গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।

স্বেচ্ছাচারীভাবে নির্বাচিত শিল্পসমূহ ভর্তুকিভিত্তিক অর্থায়ন, উচ্চ শুল্ক সংরক্ষণ, মূলধন ও কাঁচামাল আমদানিতে কর মওকুফ ও রেয়াতি মেয়াদ আকারে সর্বোচ্চ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে থাকে। সাধারণত এরূপ শিল্প প্রতিষ্ঠান বৃহদায়তন হয় এবং শহরাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। যেহেতু এ সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান মূলধন-নিবিড় হয়ে থাকে এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, সেহেতু কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক আয়তনের প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এগুলো পর্যাপ্ত অবদান রাখতে সক্ষম হয় না। এ সকল শিল্প সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রতিযোগী পণ্যের উপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করার ফলে ভোক্তাগণ কেবল উচ্চ মূল্য দিতেই বাধ্য হয় না; বরং এ সকল শিল্পের জন্য মূলধন, দ্রব্য ও কাঁচামাল আমদানির লাইসেন্স প্রাপ্ত ব্যক্তিগণ অনুপার্জিত সম্পদে ধনী হওয়ার সুযোগ লাভ কলে। এছাড়া আমদানিকৃত দ্রব্যের মূল্য কম প্রদর্শনের মাধ্যমে কর ফাঁকি দেয়ারও সুযোগ সৃষ্টি হয়। জাতীয় সম্পদ যত বেশি এ ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত করা হবে, সম্পদের প্রবাহ ততই বিশৃঙ্খল হবে এবং শহরের ও গ্রামীণ ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ অধিকতর ধনাঢ্য হওয়ার সুযোগ লাভ করবে। অধিকন্তু ব্যাপক সংরক্ষণ লাভকারী শিল্পে সাধারণত কোনো প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় না।

প্রবৃদ্ধি প্রকৃত চাহিদা পূরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনার বিবেচনায় কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক সংরক্ষণ লাভ করার অধিকারী। কিন্তু এগুলো উপেক্ষিত হয়। এ খাতগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বৈদেশিক মুদ্রার উচ্চমূল্য, আমদানি ভর্তুকি ও পণ্য সাহায্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ খাতে কার্যরত ইউনিটগুলো আকারে ক্ষুদ্র, অসংগঠিত ও অবিকশিত হওয়ায় কোনো রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে সক্ষম হয় না। ভূমির মালিকানা একীভূত হওয়ায় ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিতিতে এ খাতগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হয়। ফলে উপেক্ষা ও দারিদ্র্য এবং উন্নতর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে অর্থায়নের ক্ষেত্রে অসামর্থ্যের মতো একটি দুষ্টচক্র সৃষ্ট হয়। নিঃসন্দেহে এ অবস্থা ‘মাকাসিদের’র সাথে প্রত্যক্ষভাবে সাংঘর্ষিক।