hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৯

সেকুলার মতবাদের উপর গুরুত্বারোপ

জ্ঞানালোকের বিশ্বদুষ্টি (The Enlightenment Worldview)

সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্যন্ত প্রায় দুই শতাব্দীব্যাপী রেঁনেসা আন্দোলন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধারণাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। ‘রেঁনেসা’ যা প্রায়শ ‘যুক্তির যুগ’ এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তার চূড়ান্তরূপে দেখা যায় যে, তারা খৃস্টিয় বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধিতা করেছে। এ ধর্মবিরোধী ভূমিকার কারণসমূহ অনুসন্ধান করার অবকাশ এ পুস্তকে নেই। তবে অবশ্যই অন্যতম কারণ হিসেবে চার্চের দুর্নীতি ও কুপমণ্ডুকতাকে চিহ্নিত করা যায়। ‘যাজকশ্রেণীর মাঝে ধর্মীয় অবস্থার অবনতি এত বিশাল যে, তা প্রমাণের জন্য হাজারো উদাহরণ উপস্থাপন করf যেতে পারে’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ যাজক- বিরোধী মনোভাব প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের প্রতিও আস্থার ভিত নাড়িয়ে দেয়। ফলে চার্চের সাথে সম্পৃক্ত সকল প্রকার বিশ্বাসকেই “অগ্রহণযোগ্য” বলে ধরে নেয়া হয়। রেঁনেসার সামগ্রিক সময়ে ভলতেয়ারের “কুখ্যাত জিনিসটি ধ্বংস কর” এ বাণী প্রতিধ্বনি করে বেরিয়েছে। ডুরান্ট যথার্থই মন্তব্য করেছেন, যদি যাজক শ্রেণী সুরুচিশীল ও ভক্তিবাদী জীবনযাপন করত, তবে হয়ত খৃস্টিয় প্রত্যাদিষ্ট কিতাব ও ঐতিহ্যের মর্যাদাকে চার্চ রক্ষা করতে পারতো’।

রেঁনেসা আন্দোলনের অগ্রগামী চিন্তানায়কগণ ধর্মীয় বিশ্বাসের বদলে মানব জীবনের ক্ষেত্রে যুক্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাদের মতে, কেবলমাত্র প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা হতে জ্ঞান অর্জন সম্ভব। আধ্যাত্মিক সত্যকে অনুভব বা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও কেবলমাত্র যুক্তিকেই সর্বাধিক প্রাধান্য প্রদান করা হয়। একের পর এক ক্ল্যাসিক চিন্তাবিদ লক, বার্কলি, হিউম, কান্ট বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সম্মানজনক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেন এবং তারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব, আত্মার অমরত্ব, নৈতিক মূল্যবোধ, পারলৌকিক জীবন এবং অন্যান্য ধর্মীয় মতাদর্শের প্রতি সংশয় সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। হিউম ধর্মীয় বিশ্বাসকে আধিভৌতিক ও কল্পনাপ্রবণ বিভ্রম বলে অভিহিত করেন। এ ধরনের মন্তব্য নিউটনের জগত সম্পর্কে ধারণাকে গ্রহণযোগ্য করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করল। নিউটনের মতে, ঈশ্বর একজন ঘড়ি নির্মাতার মতো, যিনি এ জগৎ সৃষ্টি করে একে স্বয়ংক্রিয় ঘড়ির মতো চালিত করে দিয়েছেন, কিন্তু এরপর আর এর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেননি। ভলতেয়ার এ কথাটাই তার বহুল প্রচলিত প্রবচনে এভাবে ব্যক্ত করেছেন, “যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব নাও থাকত, তবে তাকে আবিষ্কার করে নেয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ত”।

বিশ্বের এ যান্ত্রিক ব্যাখ্যার ফলে মানব আত্মারও যান্ত্রিক ব্যাখ্যা করা শুরু হলো। মানুষকে অন্ধ, উদ্দেশ্যহীন প্রকৃতির স্বয়ংক্রিয় বিবর্তন প্রক্রিয়ার এক দুর্ঘটনাজাত উপজাত হিসেবে দেখা হলো। মানুষ এক অন্ধ নিষ্ঠুর শক্তির করুণার শিকার, যাকে ঐ শক্তি অজ্ঞাতসারে জন্ম দিয়েছে। যেসব প্রতিপাদ্যের উপর ধারণা অবয়ব লাভ করল তা কতটুকু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তা বিবেচ্য বলে গণ্য হলো না। বরং বিজ্ঞানের নামে এসব ধারণা স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে পরিগণিত হলো।

ধর্মের বাধন, যা নৈতিকতা ও মানব ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে জীবনের ভিত গঠন করে, তা এভাবে ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ল। যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয় অথবা মানব জীবনের জন্য কোনো তাৎপর্য বহন না করে, তবে মৃত্যুর পর পারলৌকিক জীবনে স্রষ্টার সামনে জবাবদিহিতার কোনো প্রশ্ন আসে না। যদি জীবনের কোনো চরম ও গূঢ় উদ্দেশ্য থাকেও, তবে দেকার্তের ভাষায় তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। মানব জীবনের উদ্দেশ্য এমন একটি ধারণা যা ‘বৈজ্ঞানিকভাবে অর্থহীন’ এবং ক্রমান্বয়ে সামাজিক চিন্তাধারা থেকে তা অপসৃত হচ্ছে। তদানুসারে বার্ট্রান্ড রাসেল মন্তব্য করেছেন, ‘সকল যুগের সকল পরিশ্রম, সকল অনুপ্রেরণা, মানব প্রতিভার সকল ঔজ্জল্য এ সৌরজগতের মৃত্যুর সাথে অমোঘ নিয়তির মতো নিভে যাবে। মানবকীর্তির সকল সৌধ এ বিশ্বজগতের ধ্বংস্তূপের নিচে কবরস্থ হয়ে যাবে’। ‘জীবনের যদি কোনো চূড়ান্ত উদ্দেশ্য না থাকে, তবে কোনো প্রকার উচ্চতর অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস ও আদর্শকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকারও কোনো অর্থ হয় না’। তাই জাঁপল সাত্রের ভাষায় ‘মূল্যবোধের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে মানবীয় স্বাধীনতা। কোন মূল্যবোধের ভিত্তিতে জীবন পরিচালিত হবে তার জন্য বাহ্যিক বা অতিলৌকিক কোনো নির্দেশনার প্রয়োজন নেই’। সামাজিক ডারউইনবাদ এ ধারণাকে আরো জোরদার করল। ‘অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম’ এবং ‘যোগ্যতমের বেঁচে থাকার অধিকার’ এ ধারণাদ্বয় শেকড় গেড়ে বসল।