hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৬৫

নৈতিক ছাঁকনির প্রয়োজনীয়তা

সম্পদের অপ্রয়োজনীয় চাহিদা থেকে প্রয়োজনীয় চাহিদা পৃথক করার মধ্যে কিভাবে সকলকে অপ্রয়োজনীয় চাহিদা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করা যায়, তার মধ্যেই সমস্যার মূল নিহিত আছে। এজন্য একটি ছাঁকনি কৌশল ও উদ্বুদ্ধকরণ পদ্ধতি অত্যাবশ্যক।

বস্তুবাদী পরিবেশে মূল্যব্যবস্থা সম্পদের প্রয়োজনীয় চাহিদা ছাঁটাই করতে একদিকে যেমন কার্যকরী নয়, অন্যদিকে পূর্ণায্‌গ উদ্বুদ্ধকরণেও সক্ষম নয়। যদিও সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা সৃষ্টি ও ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণে মূল্যব্যবস্থার ব্যবহার অপরিহার্য, কিন্তু ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য এ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত, বিশেষ করে যে অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার পূর্বশর্ত অনুপস্থিত থাকে। মূল্যব্যবস্থার অধীনে কর, শুল্ক ও মুদ্রামান হ্রাস দ্বারা বিলাস সামগ্রীর মূল্র যতই বাড়ানো হোক না কেন, ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত বিলাসসামগ্রী ক্রয় করতে সক্ষম হবে। যদি কোনো পরিবারের এসব সামগ্রী থাকে তবে অন্য পরিবার সেগুলোকে অপরিহার্য। বিবেচনা করবে। যারা এসব বিলাসদ্রব্য অর্জন করতে সক্ষম নয়, তারাও সমানভাবে চলার জন্য সেসব দ্রব্য অর্জনের প্রচেষ্টা চালায় এবং এজন্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মুলতবী রাখে বা দুর্নীতি ও নৈতিকতা বর্জিত পন্থার আশ্রয় নেয়। উন্নয়নশলি দেশের অদক্ষ ও দুর্নীতি ও নৈতিকতা বর্জিত পন্থার আশ্রয় নেয়। উন্নয়নশীল দেশের অদক্ষ ও দুর্নীতিপরায়ন কর প্রশাসনের কারণে আমদানীকৃত দ্রব্যের মূল্য কম দেখানোর (under invoicing) এবং ঘুষ বা চোরাচালানের সাহায্যে উচ্চ শুল্ক বা কর ফাঁকি দেয়া সম্ভব। কিন্তু শল্ক ও করের ফলে সৃষ্ট উচ্চ মূল্য থেকে উচ্চ মুনাফার সৃষ্টি হয় এবং আমদানিই কেবল বৃদ্ধি পায় না, বরং এসব বিলাসসামগ্রীর দেশীয় উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। এতে অনিচ্ছাকৃতভাবে মর্যাদার প্রতীকরূপী বিলাসসামগ্রীর দিকে সম্পদের প্রবাহ পরিবর্তিত হয় এবং প্রকৃত চাহিদা পূরণে সম্পদের যোগান হ্রাস পায়। ফলে প্রকৃত চাহিদা পূরণকারী সামগ্রীর মূল্য যা হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়।

এর অর্থ এ নয় যে, মূল্য পদ্ধতির প্রয়োগে আনীত শৃঙ্খলা পরিহার করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো অপ্রয়োজনীয় ভোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য কেবলমাত্র মূল্য পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। এজন্য নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে অপর একটি বাছাই পদ্ধতি ও উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা ভোক্তার অগ্রাধিকার তালিকায় পরিবর্তন এনে প্রচলিত মূল্য পদ্ধতিকে শক্তিশালী করতে হবে। এটি এমন হবে যেন ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও তা মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ হয়। এ পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে বাজারে প্রভাব বিস্তারের আগেই একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাহিদা বিলোপ করা সম্ভব হবে। তখন সম্পদের সামগ্রিক সরবরাহ ও সামগ্রিক চাহিদার মধ্যে তুলনামূলক নিম্নতর সাধারণ মূল্যস্তরে এক নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ব্যবস্থা প্রকৃত চাহিদা পূরণ এবং দারিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সাহায্য করবে।

নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে নৈতিক ছাঁকনি বা বাছাই পদ্ধতি ও ভোক্তার স্বাধীনতা না থাকায় সম্পদের বরাদ্দ পরিটব্যুরোর সদস্য ও অন্যান্য রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের খেয়ালখুশি ও কায়েমী স্বার্থ দ্বারা নির্ধারিত হয়। অধিকন্তু বাজার পদ্ধতি দ্বারা নির্ধারিত মূল্যব্যবস্থার অনুপস্থিতির ফলে সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা অর্জনের সেকুলার প্রণোদনা দূরীভূত হয়ে যায়। বর্তমানের বহু সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায় উৎপাদনের উপকরণের উপর ব্যক্তি মালিকানাসহ বাস্তবভিত্তিক মূল্য পদ্ধতি ও ভোক্তার স্বাধীনতা প্রবর্তন করলেও নৈতিক ছাঁকনি বা বাছাই পদ্ধতি ও উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে সম্পদের প্রবাহ ও মূল্য কাঠামো এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে যাকে কিছুতেই পুঁজিবাদের চেয়ে উত্তম বলা সম্ভব নয়।