hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭৯

অসম ভর্তুকি

সরকারি ব্যয়, করের বোঝা ও ঘাটরিত পরিমাণ লাফিয়ে বেড়ে চললেও কল্যাণ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য-আয় ও সম্পদের বৈষম্য হ্রাস পেল না। বস্তুত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সকল প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে অক্ষুন্ন রেখে, সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাস সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পরিচালিত সমগ্র উৎপাদন ব্যবস্থা সবার প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহারের নীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। মানুষের আচরণ, প্রয়োজন, লক্ষ্য ও মূল্যবোধ কী হওয়া উচিত সমাজে তা নির্ধারিত না থাকার ফলে কল্যাণ রাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি ব্যয়ের পরিকল্পনা রচনা সম্ভব হয় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভর্তুকি প্রাপ্ত বিভিন্ন দ্রব্য ও সেবা খাতে সরকারি ব্যয় হতে যে সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হয়, ধনী ও গরীবের তা হতে সমান ফায়দা আদায়ের সুযাগকে ইনসাফপূর্ণ নীতি বলঅ যায় না। ধনীর মোকাবিলায় গরীবকে সাহায্যের মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাসের যে লক্ষ্য অর্জন সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে হওয়ার কথা, তা সাধিত হয়নি। অথচ সরকারি ব্যয়ের বোঝা সাধ্যের অতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। কল্যাণ সুবিধা পাওয়ার প্রকৃত যোগ্যতা এবং সরকারি খরচে ধনীদের কল্যাণ সুবিধা প্রদানের সামাজিক ব্যয় যদি সঠিকবাবে বিবেচনা ও নির্ধারণ করা হতো, তবে সম্ভবত একই বা কম সরকারি ব্যয় হতে গরীবদের জন্য অধিকতর সুবিধা সরবরাহ করা সম্ভব হতো। সুতরাং, দেখা যায় পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে বৈষম্য হ্রাসের লক্ষ্যে যেসব এডহক ভিত্তিক কল্যাণধর্মী কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, সেসবের কিছু কিছু ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

জুলিয়ান লি গ্রান্ড সমাজের সামগ্রিক বৈষম্য কাঠামোর উপর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহায়ন ও যানবাহন খাতে সরকারি ব্যয়ের ফলাফল পরীক্ষা করে দেখেছেন। তাতে সরকারি ব্যয়ের প্রতি চারটির মাঝে একটি দ্বারা গরীবের চেয়ে ধনীরাই অধিক উপকৃত হয়েছে বলে দেখা গেছে। ফলে সরকারি ব্যয়ে ধনী ও দরিদ্রের মাঝে তারতম্যমূলক সুবিধা গ্রহণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়নি। জুলিয়ান গ্র্যান্ড উপসংহারে উপনীত হন যে, কল্যাণ রাষ্ট্রের গৃহীত বৈষম্য হ্রাসের কর্মসূচিসমূহ ব্যাপকভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং জোড়াতালি দেয়া কোনো কর্মসূচির সাহায্যে অবস্থার আর উন্নয়ন সম্ভব নয়। সার্বজনীন সুবিধা প্রদানের প্রবক্তা রিচার্ড লিটমাস বিনামূল্যে প্রদত্ত বৃটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচির ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মন্তব্য করেছেন যে, উচ্চ আয়ের লোকেরাই জানে এ সুবিধার সর্বোচ্চ সুযোগ কীভাবে নিতে হবে। ধনীরা বিশেষজ্ঞদের নিকট হতে পরামর্শ ও সেবা বেশি পেয়ে থাকে এবং উন্নত যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সমৃদ্ধ হাসপাতালের অধিকাংশ সিট তারাই পায়। মোটকথা বিশেষজ্ঞ শল্যচিকিৎসা, মাতৃসেবা ,মনোবিজ্ঞান চিকিৎসা ক্ষেত্রের সকল বিষয়ে দরিদ্র শ্রেণী থেকে ধনিক শ্রেণীই অধিক সুবিধা আদায় করতে পারে। গরীব মানুষেরা নিম্নমানের চিকিৎসা সুবিধা পায় এবং লাইনের শেষ মাথায় এসে তাদের দাঁড়াতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রেও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে শ্রেণী বৈষম্য হ্রাস পায়নি। সমাজের নিম্নশ্রেণীর অবস্থার কোনো উন্নয়ন ঘটেনি, বরং সুবিধাভোগী উচ্চ শ্রেণীর অবস্থার আরো উন্নতি ঘটেছে। বেশ কিছু সমীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ হতে দেখা গেছে, সাধারণ ভর্তুকি গরীবদের চেয়ে ধনীদের ভাগেই বেশি সুবিধা বয়ে আনে। ১৯৭৪ সালে নির্বাচনে বিজয়ের পর বৃটেনে শ্রমিকদল রুটি, দুধ, মাখন,পনির ময়দা ও চায়ের উপর যে ভর্তুকি প্রদানের প্রথা চালু করে তা পর্যবেক্ষণ করে উইট এবং নিউবোল্ড দেখিয়েছেন যে, এ খাদ্য ভর্তুকি নিম্নবিত্তদের চেয়ে উচ্চ বিত্তশালীদেরই বেশি সুবিধা প্রদান করেছে। সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে খাদ্য ভর্তুকি নিম্নবিত্তদের চেয়ে উচ্চ বিত্তশালীদেরই বেশি সুবিধা প্রদান করেছে। সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে খাদ্য ভর্তুকি ব্যাপক। গিয়র্গী ঝাকোলঝাই সরবরাহে হাংগেরীয় ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়েছেন যে, খাদ্য ভর্তুকির পরিমাণ বিশাল হলেও তার সামগ্রিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে গরীবের স্বার্থের প্রতিকূলে।

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পসমূহের দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য কম রাখায়ও একই অসম ফল পাওয়া গেছে। লি গ্রান্ড দেখিয়েছেন, যেহেতু ধনীরা গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি, কয়লা, ডাক ও টেলিফোন অধিক ব্যবহার করে, বৃটেনে সত্তর দশকে মুদ্রাস্ফীতি রোধের জন্য এসবের উপর প্রদত্ত ভর্তুকির মাধ্যমে গরীবের চেয়ে ধনীরাই বেশি উপকৃত হয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে, কল্যাণ রাষ্ট্রে বিনামূল্যে বা ভর্তুকির মাধ্যমে কম মূল্যে দ্রব্য সামগ্রী সরবরাহ সম্প্রসারণ দরিদ্রের চেয়ে ধনীদেরই বেশি লাভবান করেছে। বৈষম্য তাই বরং বেড়েছে।