hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০৪

ভূমিসংস্কার এবং সম্পদবণ্টন

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর দখলদার শক্তি যুদ্ধ প্রচেষ্টায় নিয়োজিত সামন্ত শক্তিকে বস্তুগত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধ্বংস করে দেবার লক্ষ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান ব্যাপক ভূমি সংস্কার করে। এ সুদূর প্রসারী সংস্কার কর্মসূচির ফলে এসব দেশে গ্রামীণ আয় বণ্টনের মাঝে ন্যায়পরতা এবং গ্রাম ও নগর জীবনযাত্রার মানের মধ্যে ব্যবধান কমে আসে। এ তিন দেশেই ভূমি সংস্কার এত ব্যাপক ছিল যে, সংস্কার-পূর্ব সমাজের নিয়ামক সামন্ত শক্তির ভিত ধসে পড়ে এবং সামন্ত শক্তির অধিপতি-প্রজা সম্পর্কের সম্পূর্ণ বিলোপ ঘটে। ভূমি সংস্কারের ফলে জাপানে পরিবার প্রতি আবাদী জমির মালিকানা দাঁড়ায় ২.২৫ একর। গত ৩০ বছর যাবত আবাদী জমির পরিবার পিছু মালিকানা একই রকম রয়েছে। ১৯৮৫ সালের পরিসংখ্যান হতে দেখা যায় যে, জাপানে কৃষি খামারের গড় আয়তন ২.৯ একর। মাত্র ৪% কৃষি খামারের ৭.৪১ একরের বেশি জমি রয়েছে। স্যাচস এর মতে ‘আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধরনের ভূমি সংস্কার হয়েছে এসব দেশে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে এবং তাইওয়ান জাতীয়তাবাদী শক্তির অধীনে থাকায় বিশেষ ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিরি কারণে এ সংস্কার সম্ভব হয়েছে। সামন্ত প্রভুগণ বর্ণিত পরিস্থিতির কারণে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। ভ্যমি সংস্কার মূলত সমান্ত শ্রেণীকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়নি অথবা যেখানে প্রদান করা হয়েছে তা ছিল যৎসামান্য।

তিনটি দেশেই যুদ্ধের ফলে সম্পদের বিন্যাস এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে বন্ড ও নগদ টাকার বিপুল মূল্যহ্রাস ভূমি সংস্কারজনিত জমির পুনর্বণ্টন ফলাফলকে আরো তীব্রতর করে তোলে। ১৯৪৭ সালে জাপানে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৩৩৪%। ১৯৫০ সালে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০০% এবং তাইওয়ানে ৩৪০০%। এসব সম্মিলিত কারণে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বিপুলভাবে হ্রাস পায় এবং বাজার অর্থনীতি ও সরকারি উদ্যোগের সমন্বয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পটভূমি তৈরি হয়। এ অবস্থার বিকাশ না ঘটলে উদারনৈতিক অর্থনৈতিক মতবাদ সম্ভবত আয় বৈষম্য আরো বাড়িয়ে তুলত।

একটি ক্ষুদ্র বিত্তশালী জনপ্রিয়তাহীন সামন্তগোষ্ঠীর স্থলে একটি বড় আকারের কৃষক শ্রেণী গড়ে ওঠার ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য কৃষক শ্রেণীর পক্ষে চলে আসে। কৃষক শ্রেণীর নবলদ্ধ ও রাজনৈতিক শক্তির কারণে সমর্থনের প্রয়োজনে সরকারের নীতিও তাদের অনুকূলে চালিত হয়। তাছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য কৃষিকে সমর্থন দেয়া সরকারের নীতি হয়ে দাঁড়ায়। ভূমি মালিকানা প্রাপ্তি ও গড়ে ওঠা অবকাঠামোর সুযোগ সুবিধা কৃষকদের কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করে। কৃষি খামারের আয়তন ছোট বিধায় কৃষকরা উন্নত বীজ, অধিক পরিমাণ সার, উন্নত পদ্ধতির চাষাবাদ প্রভৃতি শ্রমনির্ভর পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও আয় বাড়াতে সক্ষম হলো। অধিক কৃষিপণ্য উৎপাদন ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটাল, সঞ্চয় বাড়াল এবং শিল্পদ্রব্যের বাজার সৃষ্টি করল।

লিবারেলিজম নব্য ধনীদের তাদের সঞ্চয় পাশ্চাত্য পুঁজি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির চালিকা শক্তিতে পরিণত হতে সহায়তা করলো। এর ফলে অসংখ্য শিল্প কারখানা গড়ে উঠল। কৃষি ও শিল্প ভারসাম্যমূলকভাবে বিকশিত হলো। যদি লিবারেলিজম না থাকত, তবে অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো এসব দেশের নব্য ধনীরা সঞ্চয় ও বিনিয়োগের পরিবর্তে ভোগের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিত এবং বিদেশে পুঁজি পাচারে লিপ্ত হতো।