hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৮

সামাজিক ডারউইনবাদ

ব্যক্তিস্বার্থের অন্ধ অনুসরণ ও পজিটিভ অর্থনীতিকে দুষণমুক্ত বলে যে পবিত্রতার আচ্ছাদন প্রদান করা হলো, তার ফলাফল সুদূরপ্রসারী বলে দেখা দিলো। যুগ যুগ লালিত আর্থ-সামাজিক ন্যায়নীতি এসং সম্পদ ও আয়ের সুষম বণ্টনের ধারণা ও বিশ্বাস বিরাট ধাক্কার সম্মুখীন হলো। নতুন ধারণা অর্থনীতিবিদের সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দান করল। তাদের প্রচারিত আর্থিক মতবাদ অপর্যাপ্ত ও অন্যায়- এই মন্তব্য হতেও পজিটিভ অর্থনীতির মূল্যবোধ- নিরপেক্ষ ধারণা তাদের অব্যাহতি প্রদান করল। ফলে অর্থনীতিবিদের কাজ দাঁড়ালো উপাত্ত-তথ্যের বিবরণ বিশ্লেষণ করা, নৈতিক মূল্যমান বিচার করা নয়। উপর্যুক্ত মতবাদের নিরিখে একজন দরিদ্র ব্যক্তি এক ডলার খরচ করে যে উপযোগ সন্তুষ্টি লাভ করবে, তা একজন লাখপতির এক ডলার খরচের সন্তুষ্টির চেয়ে অনেক বেশি- এ ধরনের তুলনামূলক বিশ্লেষণের কোনো অবকাশ নেই এবং তা করা হলে তাকে অবৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা বলে আখ্যায়িত করা হবে। আর্থ-সামাজিক ন্যায়নীতির প্রতি প্রদর্শিত এই উপেক্ষার প্রেক্ষাপটে ইংরেজ অর্থনীতিবিদ থমাস ম্যালথাস (১৭৬৬-১৮৩৪) খৃস্টিয় সমাজে উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট এ পৃথিবীতে কোনো নতুন শিশু যদি জন্মগ্রহণ করে, যাকে তার পিতামাতা ভাণপোষণ করতে পারে না, প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর বাজারে যার শ্রমের কোনো চাহিদা নেই, তার খাদ্য দাবি করার প্রকৃতপক্ষে কোনো অধিকার নেই; বস্তুত এ পৃথিবীতে জন্মলাভ করারই তার অধিকার ছিল না। প্রকৃতির হিংস্র মুষ্টির নিচে তার কোনো আশ্রয় নেই। প্রকৃতি তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে না এবং তার ধ্বংসের আদেশকে প্রকৃতি ত্বরিৎ গতিতে কার্যকর করে’।

সামাজিক ডারউইনবাদ অর্থনীতিতে অনুপ্রবেশ করে নৈতিকতা ও ন্যায়নীতির সংজ্ঞা পাল্টে দিলো। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিয়ে আর কেউ মাথা ঘামানোর প্রয়োজন অনুভব করলো না। অর্থনীতির এই নবতত্ত্বের ছত্রছায়ায় ধনীরা বিবেকের দংশনবোধকে ঢেকে রাখল। দরিদ্র ও বেকারদের অলস, অস্থিরমতি, অসৎ বা উদ্যমহীন বলে মনে করা হলো। তাদের ভর্তুকি প্রদানের যে কোনো উদ্যোগ বাজার অর্থনীতিকে ভণ্ডুল করে যোগ্যতা অনুসারে পুরস্কার দেবার সুন্দর ব্যবস্থাকে সাবোটাজ করার অপচেষ্টা বলে অভিহিত করা হলো। সমাজের এই সব দরিদ্র বেকারদের ভাতা প্রদানের উদ্যোগ হবে উদ্যমী, পরিশ্রমী, উৎপাদনশীল ব্যক্তিবর্গকে দণ্ডদান করা, যার ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়ে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন প্রচেষ্টাও নেয়া হলো যে, অর্থনীতির উপযুক্ত বিবৃতিতে যদি কাজ না হয় তবে পাদ্রীদের মুখ থেকে উচ্চারণ করা হবে যে, দারিদ্র্য পাপের শাস্তি এবং ধন সম্পদ হচ্ছে পূণ্যের পুরস্কার। এভাবে সমাজের প্রভাবশালী মতটি দাঁড়াল, ধনিক বণিক উৎপাদক শ্রেণীর বিপক্ষে দরিদ্র শ্রেণীকে যদি বেঁচে থাকতে হয়, তবে সামাজিক ভর্তুকির সাহায্যে নয়, বরং ব্যক্তিমানুষের দান দাক্ষিণ্যের উপর তাদের টিকে থাকতে হবে। এসব মতামত বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন ভাষায় প্রখ্যাত লেখকবৃন্দ যথা ডেনিয়েল ডেফো (১৭০৪), বার্নার্ড মেনডিভিলি (১৭১৪), আর্থার ইয়ং (১৭৭১) থেকে শুরু করে হার্বার্ট স্পেন্সার (১৮৫০), ডইসি (১৯০৫) এবং কেলভন কুলিজ এর লেখায় প্রকাশ পেয়েছে।

পুঁজিবাদ নামক পদ্ধতি এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সম্পদ উপার্জনে অপরিসীম ও বাধাহীন স্বাধীনতা প্রদান করে। বাজার অর্থনীতির নিয়মকানুন ও সূত্র যেহেতু পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রের মতো নিখুঁত ও প্রয়োগসিদ্ধ, তাই জীবন যুদ্ধে পরাজিত পেছনের সারির মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে পুঁজিবাদের ফল বলে অভিহিত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সামাজিক ডারউইনবাদ এই শিক্ষা দেয় যে, মুক্তবাজারের খোলা প্রতিযোগিতা প্রকৃতপক্ষে সাধারণ কল্যাণের ঢাল স্বরূপ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ব্যক্তি প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে উৎপাদন খরচ সর্বনিম্ন হবে, দক্ষতা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার শ্রীবৃদ্ধি ঘটাবে। তাই নৈতিকভাবে উচিত বা অনুচিত এরূপ বিচার-বিশ্লেষণ বা সরকারি হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্র কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করলে, ব্যক্তিমালিকানায় উদ্যোগ অপ্রতিহত গতিতে চলতে থাকলে সর্বোচ্চ কল্যাণ লাভের মধ্য দিয়ে জাতীয়স্বার্থ সর্বাধিকভাবে রক্ষিত হবে। প্রত্যেক মানুষ তার স্বীয় স্বার্থের শ্রেষ্ঠ বিচারক। তাতে বাঁধাহীনভাবে স্ব-স্ব স্বার্থের অনুসরণের দ্বারা শুধু নিজের কল্যাণ হবে না, শেষ পর্যন্ত তা অন্যের কল্যাণও ডেকে আনবে।