১
ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৫৯
তিক্ত ফলাফল
অদক্ষ বন্টন ব্যবস্থা
কার্যত বাস্তবে যদি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হতো, তাহলে উপরে এ ব্যবস্থার যে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করা হয়েছে তাকে একদেশদর্শী সমালোচনা ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বলে চালিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মাথাভারী অনাবশ্যক জটিল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতির ফলে এ ব্যবস্থা শ্রমিক ও ব্যবস্থাপক শ্রেণীকে প্রয়োজনীয় উদ্বুদ্ধকরণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে অদক্ষ ক্ষেত্র হতে সম্পদের প্রবাহ সৃষ্টি হয়নি। পরিমাণে সমগ্র অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে এক স্থবিরতা, যা পরিবর্তিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সাথে সংগতি রাখতে হয়েছে ব্যর্থ। ফলশ্রুতিতে সোভিয়ে অর্থনীতির সবখাতে বিশেষ করে কৃষি খাতে উৎপাদন গুণগত ও পরিমাণে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
সোভিয়েত যৌথখামার ব্যবস্থা চিত্র সত্যিই করুণ। কর্মক্ষম জনশক্তির একতৃতীয়াংশ কৃষিখাতে নিয়োজিত, তবুও খাদ্যশস্যের ঘাটতি পূরণের জন্যে আমদানি জরুরি হয়ে পড়ে। বিশ্বের সর্ববৃহতৎ খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশ সোভিয়েত রাশিয়া এভাবে পরিণত হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহত খাদ্য আমদানিকারক দেশে। কঠোর বলপ্রয়োগ সত্ত্বেও সে দেশের বিপুল কৃষি সম্ভাবনাকে কার্যে পরিণত করা যায়নি। যোসেফ স্টালিন ব্যক্তিগতভাবে উইন্সটন চার্চিলকে বলেছিলেন, ‘যৌথ খামার ব্যবস্থার বিরোধিতার কারণে লক্ষ লক্ষ লোককে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হয়েছে বা শ্রম শিবিরে নির্বাসিত হতে হয়েছে’। এর ফলে এ বাস্তব সত্যই প্রমাণিত হয় যে, শক্তি প্রয়োগ কখনো মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ বা উচ্চতর মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হবার প্রবণতার বিকল্প হতে পারেনা। সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশন এবং পলিটব্যুরোর সদস্যবৃন্দের সামনে অর্থনীতির নিয়ামক বাজারশক্তি দ্বারা নির্ণীত চাহিদা ও সরবরাহের কোনো ইংগিত রেখার অস্তিত্ব নেই বিধায় স্বাভাবিকভাবেই নিজস্ব স্বার্থ, ঝোঁক ও কমিউনিস্ট মতাদর্শ বুলির বাঁধা পথেই তারা অর্থনীতিকে চালিত করেন। ফলে অর্থনৈতিক ব্যবহারের নিমিত্তে সীমিত সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ঘটে অর্থনীতির নিয়ম বিহর্ভূত বিকৃতি। সোভিয়েত ইউনিয়নে তাই দেখা যায় অত্যাবশ্যক ভোগ্যপণ্যের বদলে ভারী ও সামরিক শিল্প বিকাশের অনাবশ্যক আড়ম্বরতা| সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপুল অবকাঠামোগত মানবসম্পদের অধিকারী এবং জনগণের জন্যে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী উৎপাদনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে ভোগ্যপণ্যের সংকটে ভুগছে। জনগণের হাতে অর্থ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাজারে লভ্য নয়। ঘাটতি সংকট এতো তীব্র আকার ধারণ করেছেন যে, সোভিয়েত নেতৃত্বও শঙ্কিত।
সোভিয়েত ব্যবস্থার অদক্ষতার ফলে সৃষ্টি হয়েছে নিম্নগামী প্রবৃদ্ধির হার। সোভিয়েত শাসনের প্রথম দিকে ১৯২৮-১৯৪০ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিলো বেশি উচ্চ, বাৎসরিক ৫.৮%। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে ১৯৪০-৫০ সালে তা ২.২%-এ নেমে আসে। যুদ্ধোত্তরকালে প্রবৃদ্দির হার পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৫০-৬০ সালে ৫.৭%-এ উপনীত হয়। ফলে সোভিয়েত ব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে পুনরায় উচ্ছাস ব্যক্ত হতে থাকে এবং এ ব্যবস্থাকে নবযুগের দ্বারোদঘাটক ও উন্নয়নশীল দেশের জন্যে মডেল হিসেবে অভিষিক্ত করার হতে থাকে। কিন্তু এর পরবর্তী সময় হতে আবার সোভিয়েত প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে ১৯৬০-৭০ সালে ৫.২%, ১৯৭০-৭৫ সালে ৩.৭%, ১৯৭৫-১৯৮০ সালে ২.৬% এবং ১৯৮০-৮৫ সালে ২.০% এ এসে দাঁড়ায়। পেরেস্ত্রয়কার অন্যতম তাত্ত্বিক চিন্তাবিদ ‘আগানবেগিয়ান’ উপস্থাপিত সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী দেখা যায় প্রকৃত প্রস্তাবে ১৯৮০ দশকের প্রথমার্ধে প্রবৃদ্দিই ঘটেনি। এর ফলে সোভিয়েত ব্যবস্থার আবেদন বহুলাংশে হ্রাস পায়; বিশেষত যখন জাপান, পশ্চিম জার্মানী দক্ষিণ কোরিয়া তুলনামূলকভাবে কম সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নয়নের স্বাক্ষর রাখে। উন্নত বিশ্বের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যবধান ১০ বছরের মধ্যে পূরণের জন্যে স্টালিনের ১৯৩১ সালে বিখ্যাত আহ্বান শূণ্য আস্ফালনে পরিণত হয়। এমনকি ষাট দশকের মধ্যে সে ব্যবধান ঘুচিয়ে দেবার লক্ষ্যে ক্রুশ্চেভের আশাবাদও অবাস্তবায়িত থেকে যায়। প্রবৃদ্ধি হারের ক্রমাগত হ্রাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত অর্থনীতির মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়েই তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।
কার্যত বাস্তবে যদি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হতো, তাহলে উপরে এ ব্যবস্থার যে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করা হয়েছে তাকে একদেশদর্শী সমালোচনা ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বলে চালিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মাথাভারী অনাবশ্যক জটিল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতির ফলে এ ব্যবস্থা শ্রমিক ও ব্যবস্থাপক শ্রেণীকে প্রয়োজনীয় উদ্বুদ্ধকরণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে অদক্ষ ক্ষেত্র হতে সম্পদের প্রবাহ সৃষ্টি হয়নি। পরিমাণে সমগ্র অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে এক স্থবিরতা, যা পরিবর্তিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সাথে সংগতি রাখতে হয়েছে ব্যর্থ। ফলশ্রুতিতে সোভিয়ে অর্থনীতির সবখাতে বিশেষ করে কৃষি খাতে উৎপাদন গুণগত ও পরিমাণে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
সোভিয়েত যৌথখামার ব্যবস্থা চিত্র সত্যিই করুণ। কর্মক্ষম জনশক্তির একতৃতীয়াংশ কৃষিখাতে নিয়োজিত, তবুও খাদ্যশস্যের ঘাটতি পূরণের জন্যে আমদানি জরুরি হয়ে পড়ে। বিশ্বের সর্ববৃহতৎ খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশ সোভিয়েত রাশিয়া এভাবে পরিণত হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহত খাদ্য আমদানিকারক দেশে। কঠোর বলপ্রয়োগ সত্ত্বেও সে দেশের বিপুল কৃষি সম্ভাবনাকে কার্যে পরিণত করা যায়নি। যোসেফ স্টালিন ব্যক্তিগতভাবে উইন্সটন চার্চিলকে বলেছিলেন, ‘যৌথ খামার ব্যবস্থার বিরোধিতার কারণে লক্ষ লক্ষ লোককে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হয়েছে বা শ্রম শিবিরে নির্বাসিত হতে হয়েছে’। এর ফলে এ বাস্তব সত্যই প্রমাণিত হয় যে, শক্তি প্রয়োগ কখনো মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ বা উচ্চতর মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হবার প্রবণতার বিকল্প হতে পারেনা। সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশন এবং পলিটব্যুরোর সদস্যবৃন্দের সামনে অর্থনীতির নিয়ামক বাজারশক্তি দ্বারা নির্ণীত চাহিদা ও সরবরাহের কোনো ইংগিত রেখার অস্তিত্ব নেই বিধায় স্বাভাবিকভাবেই নিজস্ব স্বার্থ, ঝোঁক ও কমিউনিস্ট মতাদর্শ বুলির বাঁধা পথেই তারা অর্থনীতিকে চালিত করেন। ফলে অর্থনৈতিক ব্যবহারের নিমিত্তে সীমিত সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ঘটে অর্থনীতির নিয়ম বিহর্ভূত বিকৃতি। সোভিয়েত ইউনিয়নে তাই দেখা যায় অত্যাবশ্যক ভোগ্যপণ্যের বদলে ভারী ও সামরিক শিল্প বিকাশের অনাবশ্যক আড়ম্বরতা| সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপুল অবকাঠামোগত মানবসম্পদের অধিকারী এবং জনগণের জন্যে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী উৎপাদনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে ভোগ্যপণ্যের সংকটে ভুগছে। জনগণের হাতে অর্থ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাজারে লভ্য নয়। ঘাটতি সংকট এতো তীব্র আকার ধারণ করেছেন যে, সোভিয়েত নেতৃত্বও শঙ্কিত।
সোভিয়েত ব্যবস্থার অদক্ষতার ফলে সৃষ্টি হয়েছে নিম্নগামী প্রবৃদ্ধির হার। সোভিয়েত শাসনের প্রথম দিকে ১৯২৮-১৯৪০ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিলো বেশি উচ্চ, বাৎসরিক ৫.৮%। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে ১৯৪০-৫০ সালে তা ২.২%-এ নেমে আসে। যুদ্ধোত্তরকালে প্রবৃদ্দির হার পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৫০-৬০ সালে ৫.৭%-এ উপনীত হয়। ফলে সোভিয়েত ব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে পুনরায় উচ্ছাস ব্যক্ত হতে থাকে এবং এ ব্যবস্থাকে নবযুগের দ্বারোদঘাটক ও উন্নয়নশীল দেশের জন্যে মডেল হিসেবে অভিষিক্ত করার হতে থাকে। কিন্তু এর পরবর্তী সময় হতে আবার সোভিয়েত প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে ১৯৬০-৭০ সালে ৫.২%, ১৯৭০-৭৫ সালে ৩.৭%, ১৯৭৫-১৯৮০ সালে ২.৬% এবং ১৯৮০-৮৫ সালে ২.০% এ এসে দাঁড়ায়। পেরেস্ত্রয়কার অন্যতম তাত্ত্বিক চিন্তাবিদ ‘আগানবেগিয়ান’ উপস্থাপিত সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী দেখা যায় প্রকৃত প্রস্তাবে ১৯৮০ দশকের প্রথমার্ধে প্রবৃদ্দিই ঘটেনি। এর ফলে সোভিয়েত ব্যবস্থার আবেদন বহুলাংশে হ্রাস পায়; বিশেষত যখন জাপান, পশ্চিম জার্মানী দক্ষিণ কোরিয়া তুলনামূলকভাবে কম সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নয়নের স্বাক্ষর রাখে। উন্নত বিশ্বের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যবধান ১০ বছরের মধ্যে পূরণের জন্যে স্টালিনের ১৯৩১ সালে বিখ্যাত আহ্বান শূণ্য আস্ফালনে পরিণত হয়। এমনকি ষাট দশকের মধ্যে সে ব্যবধান ঘুচিয়ে দেবার লক্ষ্যে ক্রুশ্চেভের আশাবাদও অবাস্তবায়িত থেকে যায়। প্রবৃদ্ধি হারের ক্রমাগত হ্রাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত অর্থনীতির মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়েই তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।