১
ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩২
ন্যায়ভিত্তিক বণ্টনব্যবস্থা
দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদগণ প্রথমেই এমন এক আদর্শবাদী সমাজ কল্পনা করে নিয়েছেন, যেখানে সম্পদ ও আয়ের ইনসাফপূর্ণ বণ্টনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত আছে। যদি আয় ও সম্পদের এমন ইনসাফপূর্ণ ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন সমাজে বজায় থাকত, তবেই বাজারে কী ধরনের পণ্যসামগ্রী উৎপাদিত হবে তার উপর প্রত্যেক মানুষের পছন্দ অপছন্দের প্রভাব কাজ করত। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো কোনো শ্রেণীর বিশাল বিত্ত-বৈভব প্রাপ্তি; ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে বিশেষ শ্রেণীর বিশেষ সুবিধা; বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার সুযোগ; পারিবারিক ঐতিহ্য, শারীরিক শক্তির বিভিন্নতা ও উচ্চাশা সব মিলে সমাজে মানুষের আয়ের বণ্টন শুধু যে বৈষম্যমূলক তা নয়, প্রকৃতপক্ষে সেখানে আয়ের ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের কোনো অবকাশই নেই। ফলে বিত্তবেসাতিদর মালিক সমাজে উপর শ্রেণী, যারা জাতীয় আয় ও ব্যাংক ঋণের সিংহভাগ দখল করে আছে, তারাই তাদের পছন্দ মাফিক ভোগ্য সামগ্রীর উৎপাদনকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রন করে। ঐ সব দ্রব্যসামগ্রী সমাজের জন্য কতটুকু প্রয়োজনীয় তা বিবেচ্য বিষয় থাকে না। যেহেতু এসব মানুষের অর্থকড়ি ও সম্পদের কোনো সীমা পরিসীমা নেই, তাই মর্যাদাপূর্ণ বিলাস সমাগ্রীর দাত যতই উচ্চ হোক না কেন অর্থাৎ পুঁজিবাদী চাহিদা তত্ত্বের ভিত্তিতে দাম যতই বেড়ে যাক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না। এসব অনুৎপাদনশীল বিলাস দ্রব্য ক্রয়ের ঘোড়দৌড়ে এ শ্রেণীর কোনো বিষয় নেই। এভাবে দেখা যায়, বাজার অর্থনীতি চাহিদা পূরণের যে সুন্দর স্বপ্ন উপস্থাপন করে, তা অর্থবিত্তহীন বিশাল দরিদ্রশ্রেণীর ক্রয় ক্ষমতার অভাবে বিত্তশালী শ্রেণীর ইচ্ছেমতো অর্থব্যয়ের ক্ষমতার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই পুঁজিবাদী অর্থনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে সঠিক দ্রব্যমূল্য নির্ধারণের তত্ত্বটির প্রসাদের ভিত কত যে নড়বড় তার বাস্তব অবস্থা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতির ফলাফল সম্পর্কে তাই অর্থনীতিবিদ টাওনি Towney সঠিকভাবে মন্তব্য করেছেন, ‘প্রতি বছর বাজারে যেসব পণ্য সামগ্রীর উৎপাদন দেখা যায় তার বৃহদাংশকে সঠিক অর্থে নিছক অপচয় বলা যায়, কেননা এসব সামগ্রী উৎপাদনের কোনো প্রয়োজনই ছিল না অথবা অন্য সব অত্যাবশ্যক সামগ্রী যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদনের পরই এসব উৎপাদনের অবকাশ দেখা দিত’। এ ধরনের অপচয়ধর্মী উৎপাদনের ফলে উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রীর টাকার হিসেবে সামগ্রিক মূল্যমান যাকে জাতীয় আয় (Gross National Product) নামে অভিহিত করা হয় তা আপাতঃদৃষ্টিতে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষের প্রকৃত অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। তাই জাতীয় আয়ের (জিএনপি) হ্রাস বৃদ্ধি দ্বারা মানুষের কল্যাণ বা অবস্থার উন্নতি অবনতি বোঝা যায় না ।