hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৬৬

তিন প্রকার শ্রেণীবিন্যাস

যতদিন মুসরিম দেশসমূহ পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করবে, ততদিন তারা অগুরুত্বপূর্ণ খাতে সম্পদের ব্যবহার প্রতিহত করতে পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে বেশি সফল হবে না। প্রকৃত চাহিদা পূরণের জন্য স্বাভাবিকভাবেই সম্পদ সংকুচিত হয়ে পড়বে এবং সম্পদ বৃদ্ধি পেলেও মাকাসিদ অর্জন করা কঠিন হবে। মুসলিম দেশসমূহের কর্তব্য হবে অপ্রযেঅজনীয় থেকে প্রয়োজনীয চাহিদা পৃথক করা এবং এ লক্ষ্যে সকল সামগ্রী ও সেবাকে ৩টি শ্রেণীতে ভাগ করা, যা হলো প্রকৃত চাহিদা, বিলাসসামগ্রী এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের সামগ্রী। প্রকৃত চাহিদা (মৌলিক প্রয়োজন ও আয়েশের ব্যবস্থাসহ) বলতে এমন সকল দ্রব্য ও সেবাকে বুঝাবে, যা প্রকৃত প্রয়োজন পূরণ করে ও কষ্ট হ্রাস করে এবং মানবকল্যাণের বাস্তব অর্থ প্রকাশ করে। বিলাসসামগ্রী বলতে ঐ সকল দ্রব্য ও সেবাকে বুঝাবে যেগুলো, প্রধানত তাদের সৌখিন প্রকৃতির জন্য প্রত্যাশা করা যায় এবং যা ব্যক্তির কল্যাণের কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। মাধ্যমিক পর্যায়ের সামগ্রী বলতে ঐ সকল দ্রব্য ও সেবাকে বুঝাবে, যেগুলোকে প্রকৃত চাহিদা অথবা বিলাসসামগ্রী হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায় না। এখানে কিছুটা নমনীয়তা রক্ষা করা বাঞ্ছনীয়।

ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে দ্রব্য সেবার এরকম শ্রেণীবিন্যাস করা সম্ভব। ফিকাহ শাস্ত্রে প্রয়োজনীয় (জরুরিয়াত), সুবিধাজনক (হাজিয়াত) ও আরামপ্রদ (তাহসিনিয়াত) দ্রব্য সামগ্রী সম্পর্কে বাস্তবানুগ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফকীহগণের বিশ্লেষিত উপযুক্ত সকল শ্রেণীই আমাদের আলোচনায় প্রকৃত চাহিদার পর্যায়ভুক্ত; এগুলোকে লিাসসামগ্রী বা মর্যাদার প্রতীকরূপে চিহ্নিত করা যায় না। ফকীহগণের দৃষ্টিতে যা কিছু প্রকৃত প্রয়োজন নয় তাই অমিতব্যয়িতা ও অমিতাচার এবং সেগুলোকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। ফিকাহশাস্ত্রের এ বিশ্লেষণ কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমৃদ্ধ করা যেতে পারে, যাতে মুসলিম দেশসমূহ বিরাজমান ভারসাম্যহীনতা দূরীভূত করে ‘মাকাসিদ’ হাসিল করতে সক্ষম হয়।

একথা স্মরণ রাখা দরকার যে, ইসলাম সংসার ত্যাগের ধর্ম নয় এবং দ্রব্য ও সামগ্রীর পূর্বোক্ত তিন শ্রেণীতে বিভক্তকরণ অপরিবর্তনীয় থাকার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিকে তার প্রকৃত চাহিদা পূরণ করার, এমনকি তার দক্ষতা ও কল্যাণ বৃদ্ধি করে এমন সকল আরামপ্রদ সামগ্রীও ইসলাম অনুমোদন করে। যেহেতু দ্রব্যসামগ্রীর পূর্বোক্ত ৩টি শ্রেণীবিন্যাস একটি মুসলিম দেশের সম্পদ ও জীবনযাপনের সাধারণ মান অনুসারেই নির্দিষ্ট হওয়া জরুরি, সেহেতু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সম্পদের প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাপনের সাধারণ মানের উন্নতির সাথে সাথে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিত পাল্টে যেতে বাধ্য। প্রকৃতপক্ষে প্রাথমিক মুসলিম সমাজের তুলনায় বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম দেশ অধিক সম্পদের অধিকারী এবং উন্নততর জীবনযাপনের মান অর্জনে সক্ষম। অবশ্য এক্ষেত্রে স্রষ্টার প্রতিনিধি হিসেবে মুসলিম সমাজের সকল মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহ অবশ্যই পূরণ করার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না, যদি ব্যক্তিগণের সামাজিক মর্যাদা ও আয়ের পার্থক্য অনুযায়ী ভোগের পার্থক্যকে দেশের সম্পদের সামর্থ্য অতিক্রম করে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারা না যায়। তাদের বিলাসী চালচলন প্রদর্শন করা ও সামাজিক ব্যবধানকে ব্যপক করে তোলা সমীচীন হবে না। তা ইসলামী সৌভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে শিথিল করা ছাড়া আর কিছুই করবে না। মুসলিম সমাজে একঘেঁয়ে ও শ্রেণীহীন সমতা প্রতিষ্ঠা করা এর উদ্দেশ্য নয়। বরং এর দ্বারা সৃজনশলিতা ও বৈচিত্র্যের পাশাপাশি জীবনযাপনের আড়ম্বরহীনতা আনয়ন করাও সম্ভব। সুতরাং পূর্বোক্ত তিন প্রকার শ্রেণীর বিন্যাস সম্পদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক ইনসাফের উপর প্রভাব বিস্তারকারী ইসলামী ভোগ পদ্ধতির নিরিখে নির্ধারিত হওয়া উচিত। যখন বিরাজমান ভারসাম্যহীনতা সহনীয় সীমা অতিক্রম করে, তখনই ঐ ভারসাম্যহীনতাও দূরীকরণ ও অতিরিক্ত শর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।