hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬৯

সোভিয়েত মডেল হতে বিচ্ছেদ

জনগণের উপর দমননীতির বিরূপ ফলাফল ও সোভিয়েত উৎপাদন ব্যবস্থার অদক্ষতা লক্ষ্য করে এ উভয় পন্থার উপর হতে গুরুত্বারোপ কমিয়ে আনা হলো। বাজারব্যবস্থা সম্পদের সুষম বন্টন উৎপাদন সংক্রান্ত অন্যান্য সমাধানে সক্ষম বলে প্রতীতি জন্মাল। যেহেতু ধনতন্ত্রের মূল ব্যর্থতা হচ্ছে বন্টন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা, সেহেতু ধনতন্ত্রের মূল ব্যর্থতা হচ্ছে বন্টন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা, সেহেতু ধনতন্ত্রের এই চারিত্রিক ত্রুটি দূরীকরণই হবে সমাজতন্ত্রের প্রধান কাজ। মিশ্র অর্থনীতির মাধ্যমে এ আরাধ্য কাজ সম্পাদন করা সম্ভব বলে ধারণা করা হলো। কেননা এ ব্যবস্থায় পাবলিক সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এ ব্যবস্থা ধনতন্ত্রের চরিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করে সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপ সমূহ কী হবে সে সম্পর্কে প্রচুর মতভেদ থাকলেও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সমার্থক হিসেবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের উপর ভিত্তিশীল কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার সাথে তা জনগুরুত্বপূর্ণ শিল্পসমূহের জাতীয়করণ, শ্রমনীতি সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা (বেকার ভাতা, অবৈতনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহণ সুবিধা) ইত্যাদি নিশ্চিত করে। বিপরীত পক্ষে বিপ্লব, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা এবং সকল উৎপাদন উপকরণের রাষ্ট্রীয় মালিকানার সাথে কমিউনিজম সমার্থক পদবাচ্য হিসেবে পরিগণিত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে হল্যান্ডের ফ্যাবিয়ান সমাজতন্ত্রীগণ এবং জার্মানীর সংশোধনবাদীগণ যে মতবাদ প্রচার করে তার মূল সুর ছিলো ক্রমবিবর্তনবাদের অনিবার্য অনিবার্য বিজয়।

বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী তাত্ত্বিকগণ এ ধরণের চিন্তাধারার প্রতি অনাস্থা ও অষন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের মতে ধনবাদী পরিবেশ কাঠামোর মধ্যে ক্রিয়াশীল সংসদীয় গণতন্ত্র ও শ্রমিক ইউনিয়নের সংশোধনবাদী অস্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য। সংসদ ও শ্রমিক ইউনিয়নসমূহ সমাজের প্রভাবশালী অংশের স্বার্থকেই প্রতিফলিত করে এবং ধনবাদী সমাজে প্রভুত্ব করে বুর্জোয়া শ্রেণী। তাই সংশোধনবাদী অস্ত্রের দ্বারা ধনবাদের পতন ঘটানো সম্ভব নয়। এগুলো ধনবাদী সমাজের কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহকেই শক্তিশালী করবে। সুতরাং সংশোধনবাদী পন্থা শুধুমাত্র ধনতন্ত্রের অস্তিত্বকেই দীর্ঘায়িত করবে। বিপ্লবীরা কল্যাণ রাষ্ট্রকে তাদের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেনি। তারা প্রকৃত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খাকে ধরে রাখল, যেখানে কল্যাণ রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিলুপ্তি ঘটবে শ্রণী বৈষম্যের এবং সকল উৎপাদন উপকরণের রাষ্ট্রীয়করণ ও মজুরি সম্পর্কের অবসানের মাধ্যমে সকল সম্পদের সম বন্টন নিশ্চিত হবে। কিন্তু পূর্বের আলোচনায় দেখা গেছে, এ বৈপ্লবিক দৃষ্টিভংগি মজুরি দাসত্বকে আরো সুদৃঢ় করেছে এবং দক্ষতাকে করেছে খর্ব। তাই এ ধরণের বৈপ্লবিক চিন্তাধারাকে বর্তমানে আর সমাজতান্ত্রিক দলসমূহ রাজনৈতিক মঞ্চ বা মেনিফেস্টো হিসেবে ব্যবহার করছে না, বরং তারা কল্যাণ রাষ্ট্রের চিন্তা দ্বারাই উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। অধিকন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক বৈপ্লবিক পন্থা পরিত্যাগের কারণে দৃশ্যমান ভবিষ্যতে এ মতবাদের নতুন অনুসারী তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই পশ্ন দাঁড়ায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের ভূমিকা বৃদ্ধি ও ধনতন্ত্রের বন্টন ব্যবস্থায় কিছু কসমেটিক পরিবর্তন এনে দারিদ্র্যের অবসান, প্রত্যেকের প্রয়োজন পূরণ, আয় ও সম্পদের সুষম বন্টন তথা আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব কিনা? অথচ ইতিবাচক হতো উদ্বৃত্ত মূল্য বা আয় বন্টনের ক্ষেত্রে অন্যায়পরতা থাকা সত্ত্বেও অন্তত যদি বাজারব্যবস্থা বিভি ন্ন উৎপাদন উপকরণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে পারত। কিন্তু যেহেতু দেখা গেছে যে, বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণ বরাদ্দের ক্ষেত্রেও বাজার অর্থনীতি দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে, তাই এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র সম্পর্কে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এ সত্যকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে সমাজতন্ত্রী দলসমূহ ক্ষমতা এসেছে। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্যসমূহ ছিলো দারিদ্র্য দূরীকরণ, রাষ্ট্র কৃর্তক সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান, সম্পদের অধিকতর সমবন্টন, পূর্ণ কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এ দলসমূহ যদিও অর্থনীতিতে কতিপয় প্রশংসনীয় সংস্কার প্রবর্তন ও শ্রমজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্ন করতে পেরেছে, তবুও তাদের মূল লক্ষ্যসমূহ অর্জনে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এসব অর্থনীতির বিশাল সম্পদের ভিত থাকা সত্ত্বেও এখনো দারিদ্র ব্যাপক, মানুষের প্রয়োজন অপূর্ণ এবং আয় ও সম্পদের বৈষম্য বস্তুত বৃদ্ধি প্রাপ্ত। তাছাড়া ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, ভারসাম্যহীনতা ও অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দক্ষতা ও ন্যায়পরতা, উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে চলেছে।