১
ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১২৭
(খ) সঠিক প্রণোদনা
দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা কেবলমাত্র একটি যথার্থ বিশোধন কৌশলের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। প্রত্যেক মানুষকে সেভাবে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করাও প্রয়োজন। পুঁজিবাদের ধারণা হলোঃ আত্মস্বার্থ একজন মানুষকে তার দক্ষতাকে সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করবে এবং সাথে সাথে প্রতিযোগিতা আত্মস্বার্থ উদ্ধারের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে এবং সামাজিক স্বার্থ রক্ষায় সাহায্য করবে। এ্যাডাম স্মিথ তাই মনে করেন, বাজারব্যবস্থা আত্মস্বার্থ ও সামাজিক স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবে। সমাজতন্ত্র ব্যক্তি মানুষকে বিশ্বাস করেনি এবং এ ধারণা পোষণ করেছে যে, তার স্বীয়স্বার্থ উদ্ধারের প্রেচেষ্টা অবশ্যই সামাজিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অতএব, সামাজিক স্বার্থ রক্ষাকল্পে সম্পদ বরাদ্দ ও বিতরণের উপর এতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি রহিত এবং কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কিন্তু ব্যক্তি মানুষ কর্তৃক স্বীয়স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা অনিবার্যভাবেই খারাপ নয়। মানব উন্নয়নের জন্য অবশ্যই এটি প্রয়োজন এবং অনুমোদিত না হলে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই দক্ষতা অর্জনে সফল হবে না। আত্মস্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা কেবলমাত্র তখনই ধ্বংসাত্মক হতে পারে, যখন তা কতিপয় সীমারেখা অতিক্রম করে এবং ব্যক্তি মানুষ তেমন একটি সমাজ সৃষ্টিতে আগ্রহী হয় না, যে সমাজের মূল্য ভ্রাতৃত্ব ও আর্থ সামাজিক ন্যায়বিচার। যাইহোক, বিবেকবান মানুষ কোনো সমাজে তার কাজের যথার্থ প্রতিদান পেতে সক্ষম হলে সাধারণত তার নিজের স্বার্থের জন্য তার সাধ্যমতো কাজ করতে আগ্রহী হয়। তখন প্রশ্ন ওঠে, সমাজের স্বার্থে কাজ করতে কী জিনিস তাকে উদ্বুদ্ধ করে? একজন ভোক্তা কেন সম্পদের উপর তার দাবি ‘মানবতার সীমারেখার মধ্যে’ সীমাবদ্ধ রাখবে এবং অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করবে এবং কেন একজন ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতাকে শ্বাসরুদ্ধ করে মারবে না এবং প্রশ্নসাপেক্ষ পথে নিজে ধনী হবে না? এখানেই প্রভুর সম্মুখে জবাবদিহিতা এবং পরকালের বিশ্বাস অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। আত্মস্বার্থ অর্জনের লক্ষ্য যখন ইহকালের চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা লোভ, বিবেকহীনতা এবং অন্যের স্বার্থের প্রতি অবজ্ঞা সৃষ্টি করতে বাধ্য। দি ইকনমিষ্ট এর ভাষায় ‘যখনই তারা কোনো সুযোগ পায় বিবেকহীন অর্থনৈতিক শক্তিগুলো অন্য সবার ক্ষতির বিনিময়ে নিজেরা সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে। সুতরাং বিভিন্ন প্রকারের বাড়তির কারণে যে শক্তি সাধারণত বাজারকে কার্যকর রাখে, তাই বাজার সমাধানকে ব্যর্থ করে দেয়’। সেকুলার তথা ইহলৌকিক সমাজে সচেতনভাবে সামাজিক দায়িত্ব পালনে আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না, যেখানে তা তাদের ইহলৌকিক কোনো সুবিধা বয়ে আনে না। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক নির্বিশেষে এ ধরনের সমাজে প্যারেটার সর্বাধিক অনুকূল অবস্থার ধারণাটি একমাত্র যৌক্তিক আচরণ পদ্ধতি। অন্যান্য সেকুলার পন্থীদের মতো ইহলৌকিক কাঠামোর মধ্যে প্যারেটোর চিন্তাচেতনা ভুল ছিল না।
কোনো ব্যক্তিকে সমাজের স্বার্থে কাজ করানোর জন্য উদ্বুদ্ধকরণের কোনো কার্যকর কৌশল পুঁজিবাদের নেই, যদি সেই স্বার্থ আত্মস্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত না হয়। এ দুই স্বার্থ যখন এক নয় ও পটভূমিকার শর্তাবলীও পূরণ করে না, তখন একমাত্র মূল্যব্যবস্থার উপর নির্ভরতার ফলে ধনীরা তাদের গৌণ চাহিদা পূরণের জন্য দুষ্প্রাপ্য সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে; ফলে গরীবরা প্রয়োজন মেটানোর জন্য বঞ্চিত হয়। পুঁজিবাদ এভাবে অসাম্যে পরিণত হয়। সমাজতন্ত্র এর চেয়েও খারাপ। কারণ ব্যক্তি মানুষকে তার নিজের স্বার্থ উদ্ধার থেকে নিবৃত্ত করতে যেয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধকরণের কর্মকৌশল এ মতবাদে নেই। এছাড়া এর ইহলৌকিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমাজের স্বার্থে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধকরণও এই মতবাদে কোনো ব্যক্তির জন্য নেই। এভাবে সমাজতন্ত্র দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা অর্জনে ব্যর্থ হয়।
যাইহোক, যদি সর্বশক্তিমান সত্তা, যার নিকটি থেকে কোনো কিছু লুকানো সম্ভব নয় (কোরআন-৫:৩), তাঁর সামনে জবাবদিহিতা এবং মৃত্যুর পরে জীবনের ধারণা প্রচলিত হয়, তবে উচ্চস্তরের যুক্তিবাদিতা সৃষ্টি হয়। এসব বিশ্বাস সমাজমুখী কার্যক্রম গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ শক্তি হিসেবে কাজ করে এবং তখন আত্মস্বার্থ এক সীমাহীন দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে পরিণত হয়। এসবের অর্থ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির নিজ স্বার্থ শুধু ইহলৌকিক অবস্থার উন্নতিতেই নিহিত নয়, তার জন্য পরলৌকিক অবস্থার উন্নতিও দরকার। অতএব সে যদি বিবেকসম্পন্ন হয় এবং নিজের জন্য যা সর্বোত্তম তাই চায়, তাহলে সে শুধু নিজের স্বল্পমেয়াদী দুনিয়ার কল্যাণের লক্ষ্যেইকাজ করবে না, দেদার ব্যয় করার আর্থিক সংগতি সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক উপভোগ হ্রাসের মাধ্যমে অন্যের কল্যাণে কাজ করে নিজের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণও নিশ্চিত করবে। এভাবে সাশ্রয়কৃত সম্পদ বর্ধিত উৎপাদন ও চাহিদা পূরণকারী মালামাল সরবরাহে ব্যবহৃত হতে পারে এবং এভাবে গরীবের স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে। অনুরূপভাবে, পরকালের জীবনের তুলনায় ইহলোকের জীবন খুবই নগণ্য-এ বিশ্বাস কোনো ব্যবসায়ীকে প্রশ্নসাপেক্ষ উপায়ে ধনী হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে এবং এভাবে অন্যদেরকে তাদের সুযোগ সংকুচিত না করে এবং স্বাধীন জীবিকা থেকে বঞ্চিত না করে সাহয্য করতে পারে। কী, কেমন করে এবং কার জন্য উৎপাদন করতে হবে সেসব প্রশ্নের উত্তরে কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধকরণে একটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কৌশল হিসেবে কাজ করতে এসব বিশ্বাস শক্তি রাখে এবং এভাবে তা সাধারণের কল্যাণের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিতরণ ও বরাদ্দ নিশ্চিত করে।
ইসলাম মানুষের কাজের একটি দীর্ঘমেয়াদী জীবনদর্শন প্রদান করে, সে সঙ্গে মানুষ এ দুনিয়াতে তার আত্মস্বার্থ অস্বীকার করুক তাও চায় না। এটা বাস্তবসম্মত হতো না। যে মূল্যবোধ এরূপ ব্যবস্থা করে তা ক্রিয়াশীল হয় না। মূলত ইসলাম চায়, কোনো ব্যক্তি তার সকল অপরিহার্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য পূরণ করুক এবং তার নিজের ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনে দক্ষ হোক এবং তা করতে যেয়ে তার সামগ্রিক কর্মক্ষমতাকে উন্নত করুক। আল্লাহ যেসব ভালো জিনিস দান করেছেন তা পরিহার করার কোনো যুক্তি নেই (কোরআন-৭:৩২)। তবে, যেহেতু সম্পদ সীমিত, সেহেতু আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে অন্যান্য সবার কল্যাণ অগ্রাহ্য করে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক মানুষ হবার মতো চরম পর্যায়ে যাওয়া তাকে মানায় না। এলেক নোভ যথার্থই মন্তব্য করেছেন: ‘যেসব সমাজ কেবল লাভ নিয়েই ব্যস্ত, সেগুলো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। আক্ষরিক ও আলংকারিক অর্থে দুর্নীতি বৃদ্ধি পাবে, যেখানে সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড টাকা বানানোই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। অনুরূপভাবে, জোসেফ স্কামপিটার মন্তব্য করেছেন যে, ‘কোনো সমাজব্যবস্থাই কাজ করতে পারে না, যেখানে প্রত্যেকেই নিজের একক স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো কিছু দ্বারা পরিচালিত হয় না’। একটি নিক্তি (কোরআনের মিজান পরিভাষায় ৫:৭-৯) একান্তই প্রয়োজন, যা সামাজিক কল্যাণ ও মানুষের কর্মক্ষমতার অব্যাহত উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
ইসলাম এ ধরনের ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য যা করেছে, তাতে আত্মস্বার্থকে আধ্যাত্মিক এবং দীর্ঘমেয়াদী মাত্রা দিতে হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি অবশ্যই দুনিয়ায় তার অতি ক্ষুদ্র স্বার্থের প্রতি নজন দেবে, সেই সঙ্গে চিরস্থায়ী জীবন পরকালের স্বার্থের প্রতিও লক্ষ্য রাখবে। এ দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কিছুটা স্বার্থপর হয়ত হতে হয়। অবশ্য হতেই হবে এমন নয়। কেননা পরকালের স্বার্থ অন্যদের প্রতি দায়িত্ব পালন ব্যতিরেকে অর্জিত হতে পারে না। এজন্য যে সম্পূর্ণ আত্মস্বীকৃতির পথ বেছে নিতে হবে তাও নয়। অতএব, একজন সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ সত্তার সামনে জবাবদিহিতায় বিশ্বাস এভাবে আত্মস্বার্থ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক কল্যাণমুখী আচরণ করতে উদ্বুদ্ধকরণে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে জোরজবরদস্তি করে এ কাজ করানো সম্ভব নয়। কারণ রাষ্ট্র কর্তৃক ধৃত হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্ছিদ্র নয় এবং ঘুষ দিয়ে বা রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অফিসিয়াল শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
এভাবে মার্কসীয় তত্ত্বে যা অস্বীকার করা হয়েছে ইসলাম তাকে স্বীকৃতি দেয়। ইসলাম লাভ ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মাধ্যমে ব্যক্তির উদ্যোগ, প্রচেষ্টা, দক্ষতা ও কর্ম অভিযানে ব্যক্তির আত্নস্বার্থের অবদানকে স্বীকার করে। অবশ্য ইসলাম লোভ, বিবেকহীনতা ও অন্যদের অধিকার ও প্রয়োজন অবজ্ঞা করার ক্ষতিরকর দিক মোকাবিলা করে, যা পুঁজিবাদী, সমাজতন্ত্রী, সেকুলার স্বল্পমেয়াদী পার্থিব চিন্তাধারার অনিবার্যভাবেই প্রসার ঘটায়। ইসলাম এভাবে ব্যক্তির নিজের গহীন চেতনায় অভ্যন্তরীণ ও স্বনিয়ন্ত্রিত কর্মকৌশল প্রবিষ্ট করার মাধ্যমে এবং সেই সাতে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার, মানব ভ্রাতৃত্ব এবং স্রষ্টার সামনে জবাবদিহিতার বিকাশের উপর নিরস্তর গুরুত্ব আরোপ করে। বিশ্বাসের এ কাঠামো সামাজিক স্বার্থ উদ্ধারের পথ বন্ধ করতে দৃঢ় উদ্বুদ্ধকারী শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রতিযোগিতা ও বাজার শক্তি বরাদ্দকারী প্রক্রিয়ার দক্ষতা অর্জনে অবদান রাখার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অপরিহার্য। কিন্তু সামাজিক লক্ষ্য অর্জন যদি নিশ্চিত করতে হয় তবে এগুলোকে অবশ্যই নৈতিক মূল্যবোধের বিশোধক কর্মকৌশলের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কাজ করতে হবে। কেবলমাত্র এ সীমাবদ্ধতার মধ্যেই প্রতিযোগতিা ‘সুস্থ’ এবং বাজার শক্তি ‘মানবিক’ হতে পারে। দুর্লভ সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক ব্যবহারের জন্য মানবসত্তার মাঝে শক্তিশালী উদ্বুদ্ধকারী প্রণোদনা সৃষ্টিতে আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসের যে ক্ষমতা রয়েছে, প্রতিযোগিতা বা বাজার শক্তি অথবা কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার তা নেই। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয় ব্যসস্থায় নীতি নির্ধারণে এবং নিজেদের স্বার্থপর সুবিধায় সম্পদ কাজে লাগানো, প্রভাব বিস্তারে শক্তিশালী সুবিধাবাদী শ্রেণীকে বাধাদান অথবা সমাজকল্যাণের চাহিদা অনুযায়ী ব্যয় করায় উৎসাহ প্রদানের কোনো অন্তঃকৌশল নেই। অথচ অন্য কোনো কার্যকর ধর্মীয় ব্যবস্থার মতো ইসলামী ব্যবস্থায় তাদেরকে শক্তিশালীভাবে উদ্বুদ্ধ করা হবে। যদি তারা উদ্বুদ্ধ না হয়, তাহলে তারা দীর্ঘমেয়াদী আত্মস্বার্থের বিরুদ্ধেই কাজ করবে।
কিন্তু ব্যক্তি মানুষ কর্তৃক স্বীয়স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা অনিবার্যভাবেই খারাপ নয়। মানব উন্নয়নের জন্য অবশ্যই এটি প্রয়োজন এবং অনুমোদিত না হলে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই দক্ষতা অর্জনে সফল হবে না। আত্মস্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা কেবলমাত্র তখনই ধ্বংসাত্মক হতে পারে, যখন তা কতিপয় সীমারেখা অতিক্রম করে এবং ব্যক্তি মানুষ তেমন একটি সমাজ সৃষ্টিতে আগ্রহী হয় না, যে সমাজের মূল্য ভ্রাতৃত্ব ও আর্থ সামাজিক ন্যায়বিচার। যাইহোক, বিবেকবান মানুষ কোনো সমাজে তার কাজের যথার্থ প্রতিদান পেতে সক্ষম হলে সাধারণত তার নিজের স্বার্থের জন্য তার সাধ্যমতো কাজ করতে আগ্রহী হয়। তখন প্রশ্ন ওঠে, সমাজের স্বার্থে কাজ করতে কী জিনিস তাকে উদ্বুদ্ধ করে? একজন ভোক্তা কেন সম্পদের উপর তার দাবি ‘মানবতার সীমারেখার মধ্যে’ সীমাবদ্ধ রাখবে এবং অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করবে এবং কেন একজন ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতাকে শ্বাসরুদ্ধ করে মারবে না এবং প্রশ্নসাপেক্ষ পথে নিজে ধনী হবে না? এখানেই প্রভুর সম্মুখে জবাবদিহিতা এবং পরকালের বিশ্বাস অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। আত্মস্বার্থ অর্জনের লক্ষ্য যখন ইহকালের চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা লোভ, বিবেকহীনতা এবং অন্যের স্বার্থের প্রতি অবজ্ঞা সৃষ্টি করতে বাধ্য। দি ইকনমিষ্ট এর ভাষায় ‘যখনই তারা কোনো সুযোগ পায় বিবেকহীন অর্থনৈতিক শক্তিগুলো অন্য সবার ক্ষতির বিনিময়ে নিজেরা সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে। সুতরাং বিভিন্ন প্রকারের বাড়তির কারণে যে শক্তি সাধারণত বাজারকে কার্যকর রাখে, তাই বাজার সমাধানকে ব্যর্থ করে দেয়’। সেকুলার তথা ইহলৌকিক সমাজে সচেতনভাবে সামাজিক দায়িত্ব পালনে আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না, যেখানে তা তাদের ইহলৌকিক কোনো সুবিধা বয়ে আনে না। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক নির্বিশেষে এ ধরনের সমাজে প্যারেটার সর্বাধিক অনুকূল অবস্থার ধারণাটি একমাত্র যৌক্তিক আচরণ পদ্ধতি। অন্যান্য সেকুলার পন্থীদের মতো ইহলৌকিক কাঠামোর মধ্যে প্যারেটোর চিন্তাচেতনা ভুল ছিল না।
কোনো ব্যক্তিকে সমাজের স্বার্থে কাজ করানোর জন্য উদ্বুদ্ধকরণের কোনো কার্যকর কৌশল পুঁজিবাদের নেই, যদি সেই স্বার্থ আত্মস্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত না হয়। এ দুই স্বার্থ যখন এক নয় ও পটভূমিকার শর্তাবলীও পূরণ করে না, তখন একমাত্র মূল্যব্যবস্থার উপর নির্ভরতার ফলে ধনীরা তাদের গৌণ চাহিদা পূরণের জন্য দুষ্প্রাপ্য সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে; ফলে গরীবরা প্রয়োজন মেটানোর জন্য বঞ্চিত হয়। পুঁজিবাদ এভাবে অসাম্যে পরিণত হয়। সমাজতন্ত্র এর চেয়েও খারাপ। কারণ ব্যক্তি মানুষকে তার নিজের স্বার্থ উদ্ধার থেকে নিবৃত্ত করতে যেয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধকরণের কর্মকৌশল এ মতবাদে নেই। এছাড়া এর ইহলৌকিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমাজের স্বার্থে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধকরণও এই মতবাদে কোনো ব্যক্তির জন্য নেই। এভাবে সমাজতন্ত্র দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা অর্জনে ব্যর্থ হয়।
যাইহোক, যদি সর্বশক্তিমান সত্তা, যার নিকটি থেকে কোনো কিছু লুকানো সম্ভব নয় (কোরআন-৫:৩), তাঁর সামনে জবাবদিহিতা এবং মৃত্যুর পরে জীবনের ধারণা প্রচলিত হয়, তবে উচ্চস্তরের যুক্তিবাদিতা সৃষ্টি হয়। এসব বিশ্বাস সমাজমুখী কার্যক্রম গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ শক্তি হিসেবে কাজ করে এবং তখন আত্মস্বার্থ এক সীমাহীন দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে পরিণত হয়। এসবের অর্থ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির নিজ স্বার্থ শুধু ইহলৌকিক অবস্থার উন্নতিতেই নিহিত নয়, তার জন্য পরলৌকিক অবস্থার উন্নতিও দরকার। অতএব সে যদি বিবেকসম্পন্ন হয় এবং নিজের জন্য যা সর্বোত্তম তাই চায়, তাহলে সে শুধু নিজের স্বল্পমেয়াদী দুনিয়ার কল্যাণের লক্ষ্যেইকাজ করবে না, দেদার ব্যয় করার আর্থিক সংগতি সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক উপভোগ হ্রাসের মাধ্যমে অন্যের কল্যাণে কাজ করে নিজের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণও নিশ্চিত করবে। এভাবে সাশ্রয়কৃত সম্পদ বর্ধিত উৎপাদন ও চাহিদা পূরণকারী মালামাল সরবরাহে ব্যবহৃত হতে পারে এবং এভাবে গরীবের স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে। অনুরূপভাবে, পরকালের জীবনের তুলনায় ইহলোকের জীবন খুবই নগণ্য-এ বিশ্বাস কোনো ব্যবসায়ীকে প্রশ্নসাপেক্ষ উপায়ে ধনী হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে এবং এভাবে অন্যদেরকে তাদের সুযোগ সংকুচিত না করে এবং স্বাধীন জীবিকা থেকে বঞ্চিত না করে সাহয্য করতে পারে। কী, কেমন করে এবং কার জন্য উৎপাদন করতে হবে সেসব প্রশ্নের উত্তরে কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধকরণে একটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কৌশল হিসেবে কাজ করতে এসব বিশ্বাস শক্তি রাখে এবং এভাবে তা সাধারণের কল্যাণের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিতরণ ও বরাদ্দ নিশ্চিত করে।
ইসলাম মানুষের কাজের একটি দীর্ঘমেয়াদী জীবনদর্শন প্রদান করে, সে সঙ্গে মানুষ এ দুনিয়াতে তার আত্মস্বার্থ অস্বীকার করুক তাও চায় না। এটা বাস্তবসম্মত হতো না। যে মূল্যবোধ এরূপ ব্যবস্থা করে তা ক্রিয়াশীল হয় না। মূলত ইসলাম চায়, কোনো ব্যক্তি তার সকল অপরিহার্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য পূরণ করুক এবং তার নিজের ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনে দক্ষ হোক এবং তা করতে যেয়ে তার সামগ্রিক কর্মক্ষমতাকে উন্নত করুক। আল্লাহ যেসব ভালো জিনিস দান করেছেন তা পরিহার করার কোনো যুক্তি নেই (কোরআন-৭:৩২)। তবে, যেহেতু সম্পদ সীমিত, সেহেতু আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে অন্যান্য সবার কল্যাণ অগ্রাহ্য করে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক মানুষ হবার মতো চরম পর্যায়ে যাওয়া তাকে মানায় না। এলেক নোভ যথার্থই মন্তব্য করেছেন: ‘যেসব সমাজ কেবল লাভ নিয়েই ব্যস্ত, সেগুলো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। আক্ষরিক ও আলংকারিক অর্থে দুর্নীতি বৃদ্ধি পাবে, যেখানে সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড টাকা বানানোই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। অনুরূপভাবে, জোসেফ স্কামপিটার মন্তব্য করেছেন যে, ‘কোনো সমাজব্যবস্থাই কাজ করতে পারে না, যেখানে প্রত্যেকেই নিজের একক স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো কিছু দ্বারা পরিচালিত হয় না’। একটি নিক্তি (কোরআনের মিজান পরিভাষায় ৫:৭-৯) একান্তই প্রয়োজন, যা সামাজিক কল্যাণ ও মানুষের কর্মক্ষমতার অব্যাহত উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
ইসলাম এ ধরনের ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য যা করেছে, তাতে আত্মস্বার্থকে আধ্যাত্মিক এবং দীর্ঘমেয়াদী মাত্রা দিতে হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি অবশ্যই দুনিয়ায় তার অতি ক্ষুদ্র স্বার্থের প্রতি নজন দেবে, সেই সঙ্গে চিরস্থায়ী জীবন পরকালের স্বার্থের প্রতিও লক্ষ্য রাখবে। এ দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কিছুটা স্বার্থপর হয়ত হতে হয়। অবশ্য হতেই হবে এমন নয়। কেননা পরকালের স্বার্থ অন্যদের প্রতি দায়িত্ব পালন ব্যতিরেকে অর্জিত হতে পারে না। এজন্য যে সম্পূর্ণ আত্মস্বীকৃতির পথ বেছে নিতে হবে তাও নয়। অতএব, একজন সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ সত্তার সামনে জবাবদিহিতায় বিশ্বাস এভাবে আত্মস্বার্থ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক কল্যাণমুখী আচরণ করতে উদ্বুদ্ধকরণে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে জোরজবরদস্তি করে এ কাজ করানো সম্ভব নয়। কারণ রাষ্ট্র কর্তৃক ধৃত হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্ছিদ্র নয় এবং ঘুষ দিয়ে বা রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অফিসিয়াল শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
এভাবে মার্কসীয় তত্ত্বে যা অস্বীকার করা হয়েছে ইসলাম তাকে স্বীকৃতি দেয়। ইসলাম লাভ ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মাধ্যমে ব্যক্তির উদ্যোগ, প্রচেষ্টা, দক্ষতা ও কর্ম অভিযানে ব্যক্তির আত্নস্বার্থের অবদানকে স্বীকার করে। অবশ্য ইসলাম লোভ, বিবেকহীনতা ও অন্যদের অধিকার ও প্রয়োজন অবজ্ঞা করার ক্ষতিরকর দিক মোকাবিলা করে, যা পুঁজিবাদী, সমাজতন্ত্রী, সেকুলার স্বল্পমেয়াদী পার্থিব চিন্তাধারার অনিবার্যভাবেই প্রসার ঘটায়। ইসলাম এভাবে ব্যক্তির নিজের গহীন চেতনায় অভ্যন্তরীণ ও স্বনিয়ন্ত্রিত কর্মকৌশল প্রবিষ্ট করার মাধ্যমে এবং সেই সাতে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার, মানব ভ্রাতৃত্ব এবং স্রষ্টার সামনে জবাবদিহিতার বিকাশের উপর নিরস্তর গুরুত্ব আরোপ করে। বিশ্বাসের এ কাঠামো সামাজিক স্বার্থ উদ্ধারের পথ বন্ধ করতে দৃঢ় উদ্বুদ্ধকারী শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রতিযোগিতা ও বাজার শক্তি বরাদ্দকারী প্রক্রিয়ার দক্ষতা অর্জনে অবদান রাখার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অপরিহার্য। কিন্তু সামাজিক লক্ষ্য অর্জন যদি নিশ্চিত করতে হয় তবে এগুলোকে অবশ্যই নৈতিক মূল্যবোধের বিশোধক কর্মকৌশলের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কাজ করতে হবে। কেবলমাত্র এ সীমাবদ্ধতার মধ্যেই প্রতিযোগতিা ‘সুস্থ’ এবং বাজার শক্তি ‘মানবিক’ হতে পারে। দুর্লভ সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক ব্যবহারের জন্য মানবসত্তার মাঝে শক্তিশালী উদ্বুদ্ধকারী প্রণোদনা সৃষ্টিতে আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসের যে ক্ষমতা রয়েছে, প্রতিযোগিতা বা বাজার শক্তি অথবা কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার তা নেই। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয় ব্যসস্থায় নীতি নির্ধারণে এবং নিজেদের স্বার্থপর সুবিধায় সম্পদ কাজে লাগানো, প্রভাব বিস্তারে শক্তিশালী সুবিধাবাদী শ্রেণীকে বাধাদান অথবা সমাজকল্যাণের চাহিদা অনুযায়ী ব্যয় করায় উৎসাহ প্রদানের কোনো অন্তঃকৌশল নেই। অথচ অন্য কোনো কার্যকর ধর্মীয় ব্যবস্থার মতো ইসলামী ব্যবস্থায় তাদেরকে শক্তিশালীভাবে উদ্বুদ্ধ করা হবে। যদি তারা উদ্বুদ্ধ না হয়, তাহলে তারা দীর্ঘমেয়াদী আত্মস্বার্থের বিরুদ্ধেই কাজ করবে।