hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২০

বস্তুবাদ ও নির্ণয়বাদ (Materialism & Determinism)

রেঁনেসা কর্তৃক ধর্মীয় ধারণা ও বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যানের ফলে সমাজ বিজ্ঞানে ব্যক্তি ও সামাজিক আচরণকে নিউটনের পদার্থ বিজ্ঞানের যান্ত্রিকগুণে ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা শুরু হলো। লা মেটরি বললেন, মানুষের আচরণ পদার্থ বা রাসায়নিক কার্যকারণ ও প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছু নয়। ‘পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ দ্বারা বস্তুর বুদ্ধিমত্তা আছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না’- এ ধারণা ‘পজিটিভিজম (Positivism) আন্দোলন নামে দানা বেঁধে উঠল। এর ফলে যুক্তি ও বিজ্ঞান প্রাধান্য লাভ করল। মানুষের কর্মকান্ডকে যান্ত্রিকভাবে ব্যাখ্যার এ প্রচেষ্টার ফলে সমাজ বিজ্ঞান বস্তুবাদী ও নির্ণয়বাদী রূপ পরিগ্রহ করল।

স্রষ্টায় অবিশ্বাসের পরিণতিতে সৃষ্টি হয়েছে বস্তুবাদ। বস্তুবাদী দর্শন অনুযায়ী বস্তুই হচ্ছে এ মহাবিশ্বের প্রথম বা মৌলিক সৃষ্টির ভিত্তি। কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্য, চরম লক্ষ্য বা বুদ্ধিমত্তা দ্বারা এ মহাবিশ্ব পরিচালিত নয়। সব কিছুকে বস্তুর ভিত্তিতে ও প্রক্রিয়ায় ব্যাখ্যা করতে হবে। মানুষের আবেগ এবং মূল্যবোধ হচ্ছে এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া বা বিভ্রম যার প্রকৃত কোনো ভিত্তি নেই। এর ফল দাঁড়ায় সম্পদ, দৈহিক সুখ ও ইন্দ্রিয় সম্ভোগ হচ্ছে সর্বোচ্চ বিষয় যা মানুষ অর্জন করতে পারে। বস্তুবাদ এভাবে বাণিজ্যিক সংস্কৃতির জন্ম দিল। বছরের পর বছর এরূপ ভোগ সংস্কৃতির লিপ্সা এত বৃদ্ধি পেলো যে, তার চাহিদা সীমিত সম্পদের সীমাকে ছাড়িয়ে গেল।

নির্ণয়বাদকে মানবাত্মার সচেতন রূপকে অস্বীকার করার ফল বলা যায়। নির্ণয়বাদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য দাঁড়ায়, এ মহাজাগতিক বিশ্বের সকল কিছু, ইতিহাসের সকল ঘটনাবলী তাদের ভৌতিক, সামাজিক বা মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণের উপর নির্ভরশীল এবং নিয়ন্ত্রিত। লক মানব মনকে ‘টেবুলা রাসা’ (tabula rasa) নামে অভিহিত করেছেন, যার কোনো নিজস্ব চরিত্র নেই। তার মতে, মানব মন হচ্ছে কাঁচামালের মতো যা বাহ্যিক আর্থ-সামাজিক শক্তিসমূহ দ্বারা রূপ ও আকৃতি লাভ করে। মার্কস ফ্রয়েড, ওয়াটসন এবং স্ক্রিনারের মতে ‘মানুষের মন পরিবেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এ পরিবেশ মানুষের মনের নিয়ন্ত্রনের বাইরের শক্তি। মানুষের আচরণকে তাই অন্যান্য প্রাণীর ন্যায় বাহ্যিক ক্রিয়ার প্রভাবে সৃষ্ট স্বয়ংক্রিয় ও যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া বলা যায়' (ওয়াটসন ও স্ক্রিনার)। ফ্রয়েডের মতে, ‘এ আচরণ হচ্ছে অবচেতন মনের প্রতিক্রিয়া’। আর মার্কসের মতে ‘মানুষের আচরণ আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিক্রিয়ার প্রতিফলন’। মানবসত্তার জটিলতা ও স্বাতন্ত্র্যকে অগ্রাহ্য করা ছাড়াও নির্ণয়বাদ ব্যক্তিমানুষের কার্যকলাপের জন্য স্বীয় নৈতিক দায়দায়িত্বকেও অস্বীকার করেছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, নির্ণয়বাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয় চিন্তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ধর্মীয় মতে ‘সকল কাজের জন্য স্রষ্টার নিকট জবাবদিহিতা রয়েছে’।