hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮৮

দোদুল্যমান আনুগত্য

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উন্নয়ন অর্থনীতির জন্ম। এ সময় তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ স্বাধীনতা লাভ করে এবং ঐসব উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নের সমস্যাসমূহ সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে থাকে। Economic Development and Cultural Change নামে উন্নয়ন অর্থনীতির উপর প্রথম জার্নালের প্রথম সংখ্যা ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয়। এ সময়ে এ বিষয়ের উপর হাতে গোনা গবেষণামূলক কতিপয় লেখা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে মহামন্দা এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের সমস্যার কারণে কীনেসীয় অর্থনীতি এবং সমাজবাদ পশ্চিমে গুরুত্বলাভ করেছিল। উন্নয়ন অর্থনীতিও নিওক্লাসিক্যাল ভিত্তি হতে সরে আসছিল এবং বাজার শক্তির উপর কম নির্ভরশীলতা ও অর্থনীতিতে সরকারের অধিকতর ভূমিকার উপর গুরুত্ব আরোপ করছিল। যাই হোক, ৭০ দশকের প্রথম ভাগে কীনেসীয়ান ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কৌশলের মুঠি শিথিল হয়ে আসলো এবং নিওক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতি আবার মঞ্চে ফিরে আসলো। উন্নয়ন অর্থনীতি প্রবেশ করলো এক সংকট সন্ধিক্ষণে। তাই উন্নয়ন অর্থনীতির উপর সমকালীন লেখাসমূহ আত্মসংশয় ও প্রশ্নবাণে বিদ্ধ।

যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ উন্নয়ন অর্থনীতিবিদগ এখনো উন্নয়ন অর্থনীতির উপযোগিতায় বিশ্বাসী, তবু কেউ কেউ এ একাডিমিক বিষয়টির বৈধতার প্রশ্নে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। বিতর্কটি মেরুকরণ লাভ করছে। মনে করা হচ্ছে, উন্নয়শীল দেশসমূহে বাজার শক্তিসমূহের সমস্যার সমাধানের পথ হচ্ছে বাজার শক্তিসমূহকে স্বাধীনভাবে চল দেয়া ও অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ হ্রাস করা। অন্য দলের চিন্তাবিদদের মত হচ্ছে, বাজারব্যবস্থা ও মূল্যের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতার পথটি সঠিক নয়। তবে বর্তমানে প্রভাবশালী মত হচ্ছে, বাজারমুখী এবং নিয়ন্ত্রণ বিরোধী ব্যবস্থা পশ্চিমা বিশ্বে উদার মতবাদ ও নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির পুনর্জাগরণের নির্দেশক। উন্নয়নশীল দেশসমূহ বর্তমানে সেব সমস্যায় ভুগছে তার অধিকাংশের জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে যা তিন দশক যাবত অনুসরণ করা হয়ে আসছে। সীমিত সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, বৃহৎ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও বহির্বাণিজ্যে অন্যায়পরায়নতা, সম্পদ ও আয়ের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য বা সামাজিক টানাপোড়েন-এসব কিছুর জন্যই নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনীতিকেই দায়ী হসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

বাজার অর্থনীতি ও রাষ্ট্র অর্থনীতির মধ্যে উন্নয়ন অর্থনীতির দোদুল্যমানতা এক সুদৃঢ় লক্ষ্য পথ হতে বিচ্যুত করেছে। এতে সৃষ্টি হয়েছে পরস্পর বিরোধী বিশ্লেষণ ও পথনির্দেশ। অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে উদ্ভব হয়েছে অসংগতি ও অনিশ্চয়তা। এসব দেশকে এখন যেসব কাজ করতে হবে তা দ্বিগুণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের অর্থনীতির উন্নয়ন এমনভাবে করতে হবে যাতে সীমিত সম্পদের ব্যবহারে অধিকতর দক্ষতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত হয়। উপরন্তু ভুল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইতোমধ্যে যে অসংগতি ও অন্যায়পরায়নতা সৃষ্টি হয়েছে তা অপসারণ করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির আলোকে যে নতুন নীতিমালার ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা হচ্ছে তাতে আকাঙ্ক্ষিত দক্ষতা, ন্যায়পরায়নতা ও স্থিতিশীলতা আসবে কিনা? তাই বিশ্বদৃষ্টি উন্নয়ন অর্থনীতির উপর কী ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং কী সমস্যার জন্ম দিয়েছে তা লক্ষ্য করা প্রয়োজন।

নিওক্লাসিক, কীনেসীয়ান এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির শিকড় রয়েছে রেঁনেসা উদ্ভূত বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে। মানব সমস্যার বিশ্লেষণ এবং মানব কল্যাণের উদ্দেশ্য সাধনে উপযুক্ত অর্থনৈতিক চিন্তাধারাসমূহের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সেকুলার। মানুষের সুখ ও স্থিতির উৎস হিসেবে এসব চিন্তাধারা বৈষয়িক লাভকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যক্তি ও সমাজ পুনর্গঠনে নৈতিক মূল্যবোধেল ভূমিকা তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। বরং আর্থ-সামাজিক সুবিচারের ধারণার সাথে প্রকৃত প্রস্তাবে তাদের কোনো মানসিক সংগতি ছিল না। নৈতিক মূল্যবোধ কীভাবে সমাজ ব্যবস্থায় বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে সামাজিক ছাঁকনি প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে তাদের ধারণা ছিল না। সম্পূর্ণভাবে এই বৈষয়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে স্বভাবতই সামাজিক-ডারউইনবাদ এবং বস্তুবাদের ফসল ব্যতিরেকে অন্য কিছুরই প্রত্যাশা করা যায় না। দৃষ্টিভঙ্গির এরূপ কাঠামোর কারণে নিজেকে সামাজিক প্রয়োজন পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোনো উদ্দীপনা কাজ করতে পারে না। অপ্রত্যক্ষভাবে সামাজিক স্বার্থরক্ষা ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের পরোক্ষ ফসল হিসেবে বেরিয়ে আসতে পারে।