hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬

চ্যালেঞ্জ

সকল সমাজেরই স্বীকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবকল্যাণ। অবশ্য কল্যাণের মৌলিক উপাদান কি এবং কিভাবে অর্জিত হয়, সে সম্পর্কে মতপার্থক্য রয়েছে। যদিও একমাত্র বস্তুগত অবস্থাই কল্যাণের উপাদান নয়, তথাপি আধুনিক সেকুলারতার ধারণায় প্রাথমিকভাবে ঐ সকল বিষয়ের উপর জোর দিয়ে বলা হয় যে, কতিপয় বস্তুগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করা পর্যন্ত কল্যাণ বা সুখ-সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না। এসব লক্ষের মধ্যে রয়েছেঃ দারিদ্র্য দূরীকরণ, সকল ব্যক্তির বস্তুগত মৌলিক চাহিদা পূরণ, সৎ উপায়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রত্যেকের সুযোগের লভ্যতা এবং আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন। অবশ্য বিশ্বের ধণী-গরীব নির্বিশেষে এমন কোনো দেশ নেই, যে দেশ এসব বস্তুগত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

যে কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতিতে এ সকল বস্তুগত লক্ষ্য নিশ্চিত অর্জনের সক্ষমতা দাবি করা হয়, সেখানেও তা শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটেরও সম্মুখীন হয়েছে, যাকে নিঃসন্দেহে ব্যবস্থাটির (system) ব্যর্থতা বলতে হবে। বাজার অর্থনীতির দেশগুলো গর্বের সাথে আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করে যাচ্ছে যে, বাজারব্যবস্থা অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে উৎকৃষ্ট। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির (Macroeconomic) ভারসাম্যহীনতা অর্থনীতির ঘনঘন ওঠানামা, উচ্চহারের মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব, অতিরিক্ত বাজেট ও বাণিজ্যিক লেনদেন ঘাটতি, এবং বৈদেশিক মুদ্রা, পণ্য ও শেয়ার বাজারের পরিবর্তনশীলতার মাধ্যমে তাদের ব্যর্থতা আরো সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। তদুপরি উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের জটিল বৈদেশিক ঋণ সমস্যায় মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় আক্রান্ত, যা শুধু তাদের ভবিষ্যতের উন্নয়নকেই নয় বরং আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার কাঠামো ও অস্তিত্বকেও হুমকির সম্মুখীন করছে।

অধিকন্তু এসব সমস্যার সাথে সাথে বিশ্বের সকল দেশই বাস্তবে দেখতে পাচ্ছে যে, তাদের নবায়ন অযোগ্য (non-renewable) প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে এবং পরিবেশ দূষণ জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। মানুষের জীবনে ক্রমবর্ধমান চাপ, উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব–সংঘাত এবং তার সাথে অস্থিরতার ক্রমবর্ধিষ্ণু লক্ষণসমূহ, যেমন হতাশা, অপরাধ প্রবণতা, নেশা, মাদকাসক্তি, বিবাহ-বিচ্ছেদ, শিশু নির্যাতন, মানসিক অসুস্থতা ও আত্মহত্যা এসব কিছুই মানুষের ব্যক্তি জীবনে আত্মতৃপ্তির অভাবের পরিচায়ক।

এ গ্রন্থে প্রধানত যে মুসলিম দেশগুলোর উপর আলোকপাত করা হবে, সেগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়।এ দেশগুলোতেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মৌলিক চাহিদা অপূরণীয় রয়েছে; অপরদিকে ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী বেশ স্বচ্ছলতার সাথে বাস করছে। বিত্তের পাশাপাশি দারিদ্র্যের অস্তিত্ব ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ও সামাজিক সংহতিকে ক্রমশ ক্ষয় করে দিচ্ছে এবং তা অপরাধ প্রবণতা, হিংসাত্মক কার্যকলাপ, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। এসব দেশের অধিকাংশই চরম সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার (macroeconomic imbalance) সংকটে নিপতিত। মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রে এসব দুর্বলতা আরো মারাত্মক। কারণ মানব মর্যাদা, ভ্রাতৃত্ব ও আর্থ-সামাজিক সুবিচারকে ইসলাম আপসহীন গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত মানবকল্যাণের সকল অপরিহার্য উপাদানগুলো নিশ্চিত করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এসকল কথা অন্তঃসারশূন্য শ্লোগানে পর্যবসিত হবে।