hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩৯

নীতিমালার পুনর্গঠন

ইসলামের বিশ্ববীক্ষণ ও প্রয়োজনীয় নীতি কতগুলো সুসংবদ্ধ ও সুসমন্বিত নীতিমালার রূপানত্মর মাত্র। তাই এখন সময়ের দাবি যাতে ইসলামী আদর্শ কায়েমে আগ্রহী যে কোনো সরকার সে দেশের নিজস্ব প রিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী নীতিমালাসমূহ প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে বাসত্মবায়ন করতে পারে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে মুসলিম দেশসমূহ শূণ্য থেকে শুরু করছে না। তাই তাকে ইসলামের ছাঁচে ঢেলে সাজানো তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। অনেক মুসলিম রাষ্ট্র অবশ্যই তীব্র বৈষম্য ও অসমতা দোষে দুষ্ট। ফলে ইসলামী কাঠামোয় এদের রূপানত্মর প্রক্রিয়া হয়ত কঠিন ও জটিল হতে পারে। এতদসত্ত্বেও পূর্ববর্তী আলোচনা হতে এ কথা সুস্পষ্ট যে, ইসলাম হতে অনুপ্রেরণা গ্রহণ ব্যতীত গত্যনত্মর নেই। সমাজ বাসত্মবতা তথা সীমিত সম্পদের মোকাবিলায় বিশেষ শ্রেণীর বল্গাহীন ভোগ ইচ্ছা এটাই দাবি করে যে, শরীয়াহ ব্যবস্থঅকে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে হবে। ‘প্যারেটো অপটিমালিটি’র নৈতিক বিবেচনাহীন ধারনাকে পরিহার করতে হবে, যাতে ধনিক ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর বিলাসী চাহিদায় সম্পদের অপচয়ের পরিবর্তে সীমিত সম্পদকে সকল শ্রেণীর মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে ব্যবহার করা যায়। যে কর্মসূচি আর্থ-সামাজিক মৌলিক লক্ষ্য পূরণে সম্পদের সরবরাহ বৃদ্ধির কথা বলে, অথচ কোন গৌণ খাতকে কাটছাট করে সম্পদের যোগান দেয়া হবে তা বলে দেয় না, এমন কর্মসূচি প্রকৃতপক্ষে বাসত্মবায়নযোগ্য নয়।

যদি সম্পদ সীমিত না হতো, তবে কোনোরূপ সমস্যা ছাড়াই মানুষের সকল চাহিদা পূরণ করা যেত। এমন ক্ষেত্রে বিশেষ শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণ ভোগের স্বাধীনতাও অন্য কারো কোনো ক্ষতি করত না। কোনোরূপ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই আর্থ-সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হতো। কিন্তু যেহেতু সম্পদ সীমিত, তাই বাঞ্ছিত আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্পদের সুষম ও দক্ষ ব্যবহার প্রয়োজন। মানুষের প্রবৃত্তির অভিরুচি অনুযায়ী সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দানের মাধ্যমে সমাজে অসাম্য ও অসমতাকে স্থায়ীত্ব দেয়ার নামানত্মর মাত্র। তাই সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা ও মানুষের মাঝে সমতা আনয়নের জন্য সম্পদ ব্যবহার পদ্ধতির উপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা প্রয়োজন। কোনোরূপ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো অর্থনীতিই চালিত হতে পারে না। ঐশী বিধিবিধানের নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে চলতে হয়। এতদসত্ত্বেও পূর্ববর্তী অধ্যায় হতে সুস্পষ্ট যে, উভয় ব্যবস্থাই ভারসাম্যহীনতা পরিহার করে একই সাথে দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

মুসলিম দেশসমূহের জন্য শরীয়াহর কাঠামোগত নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সকল বিষয়ে ইসলমের প্রথম যুগের উদাহরণ হতে পূর্বনজির খুঁজে পে তে হবে এমন কোনো আবশ্যিক শর্ত নেই। এটা সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে। অবশ্য শরীয়াহর মূলনীতির মাঝে যে কোনো কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সকল মৌলিক উপাদান ও অনুষঙ্গ মজুদ আছে। তবু প্রয়োগিক কর্মসূচি রচনার জন্য শরীয়াহর মাঝে পুঙ্খানুপুঙ্খ সকল বিষয়ে বর্ণিত হয়নি। কারণ হচ্ছে, স্থান কালের পরিসরে কাঠোর অনমনীয়তা যেন কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। খুঁটিনাটি বিষয়াবলীর কাঠামো এখানে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ সামঞ্জস্যপূর্ণ সমস্যার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা হতে সহায়তা নেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুটি শর্ত লক্ষ্য রাখতে হবে- অন্যদেশ থেকে অভিজ্ঞতালদ্ধ বিষয়টি শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক না হয়ে ‘মাকাসিদ’ অর্জনে যেন ইতিবাচক ভূমিকা রাখে এবং সম্পদের উপর অতিরিক্ত কোনো চাপ সৃষ্টি নাকরে। গৃহীত কর্মসূচি, বিশেষত সেসব কর্মসূচি যা পাশ্চাত্যের ‘প্যারেটো অপরিমালিটি’র মানদণ্ড সম্মত নয়, তা যদি এ শর্তের নিক্তিতে উতরে যায়, তবে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবে।

কেবলমাত্র একটি সূচারুরূপে বাসত্মবায়িত অর্থনৈতিক সমন্বয় কর্মসূচি মুসলিম দেশসমূহের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের শ্রীবৃদ্ধি আনতে পারে। এরূপ সমন্বয় কর্মসূচি মনে হতে পারে কঠোর ও তিক্ত। কিন্তু এই তিক্ততাকে ইসলামী মূল্যবোধের সাথে এক করে দেখা সটিক হবে না। কেননা ইসলাম বৈরাগ্যধর্মী কোনো জীবন ব্যবস্থা নয়। যে ধরনের কৃচ্ছতা বর্তমান বিরূপ পরিস্থিতির কারণে প্রয়োজন, স্বাভাবিক ও অনুকূল পরিবেশে ইসলাম তা দাবি করে না। স্বাভাবিক অবস্থায় কৃচ্ছতার পথ অবলম্বন ছাড়াই ইসলামী অনুশাসনের অনুসরণে দক্ষতা ও ইনসাফ উভয়ই অর্জন সম্ভব। ইসলামের চারিত্রিক পরিশুদ্ধিকরণ ব্যবস্থা এবং অনুপ্রেরণা এমনই উজ্জীবনকারী যে, অর্থনৈতিক সমন্বয় সাধনের ফলে যে দায়ভার সৃষ্টি হবে, তার বোঝা গরীবের পরিবর্তে ধনীরাই বহনে সম্মত হবে। মানুষের মানবিক চেতনার স্ফূরণে এটা ইসলামের এক বিশাল অবদান। নিওক্লাসিক্যাল বা সমাজতান্ত্রিক সৃষ্ট আর্থিক গুরুভার গরীবের উপর হাতে স্থানানত্মর সম্ভব নয়।