hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০৭

সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ

এসব দেশের জনগণের সমরূপতা এবং মূল্যবোধ সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাপূর্ণ ঘনিষ্ঠ সমাজ গঠনে সহায়তা প্রদান করে। ব্যক্তির দায়িত্ববোধের উপর এ মূল্যবোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ব, মালিক-শ্রমিকের মধ্যকার পারস্পরিক দায়্ত্ব, বন্ধু ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব। কেউ যদি এ দায়িত্বকে অবহেলা বা অস্বীকার করে, সমাজ তাকে ঘৃণার চোখে দেখে। যে সমাজে দায়িত্বের অবস্থান এত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে সামষ্টিক শৃঙ্খলা অতি শক্তিশালী হয়, মালিক শ্রমিকের প্রতি মানবিক আচরণ করে ও তার কল্যাণের প্রতি খেয়াল রাখে। শ্রমিক সজাগভাবে পরিশ্রম করে এবং শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক হয় অতি ঘনিষ্ট। এ ধরনের যে সামাজিক মূল্যবোধ সামাজিক স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের উপর স্তান দেয়, তা নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির লিবারেলিজমে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

যুদ্ধের পূর্বে এ সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো কেন সুপ্ত ছিল তা একটি বিষ্ময়কর প্রশ্ন বটে। উত্তর হচ্ছে, এ ধরনের মূল্যবোধ আচরিত হবার জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। এসব দেশে পরবর্তীতে এ ধরনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির অন্যতম কারণ হচ্ছে, যুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ফল হিসেবে আর্থ-সামাজিক ন্যায়পরতার আবির্ভাব। চরম সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যে ভরা দেশে ব্যক্তি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের কোনো বালাই বা দায়ভার নেই। কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক সমাজে এ দায়ভার কেউ অস্বীকার করতে পারে না। পরস্পরের প্রতি দায়িত্ববোধের এ সংস্কৃতির উন্মেষের আরো একটি কারণ হচ্ছে, সবাই জানত যে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতীয় অর্থনীতির দাবি কী? এ উপলদ্ধির জাগরণ বিলাসিতা পরিহার এবং সহজ সরল জীবনযাপনের এক সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

ফলে এসব দেশে পরিমিত ভোগ-ব্যয় এবং উচ্চহারে সঞ্চয়ের সৃষ্টি হয়। ১৯৮৭ সালে জাপান, হংকং, সিঙ্গাপুর, দিক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল যথাক্রমে আয়ের ৩৩.৪%, ৩০.৭%, ৩৯.৯%, ৩৭.০%। পক্ষান্তরে এ সময়ে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়া অঞ্চলে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল আয়ের ১৯.৮%, আফ্রিকার সাহার অঞ্চলে ১৩.০%, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ১৭.০% এবং দক্ষিণ এশিয়ার ১৯.৩%। সঞ্চয়ের এ উচ্চহার পুঁজি গঠন এবং পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদের জোগান দিলো। এসব দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যে সঞ্চয়ের এ উচ্চহারের অবদান কোনোভাবে খাটো করে দেখা যায় না। উচ্চহারের কারণে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি বা বিদেশী ঋণ গ্রহণ ছাড়াই সরকারি ও বেসরকারি খাত তাদের বিনিয়োগ কার্যক্রমে অর্থ যোগান দিতে পেরেছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল বিধায় বাজারে এ দেশগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বিদেশী ঋণের সুদের ভারে এ দেশগুলো জর্জরিত হলো না এবং দেশীয় চাহিদা পূরণ রপ্তানিমুখী অগ্রগামী এক অর্থনীতির শক্ত ভিত গড়ে উঠল।