hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩১

অবাস্তব অনুমান

প্রথম অনুমান করে নেয়া হয়েছে যে, প্রাথমিক শর্ত হিসেবে সামাজিক ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। বরং বিভিন্ন শ্রেণীর ভোক্তাগণ স্বতঃপ্রণোদিতভাবেই তাদের চাহিদার ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণের মধ্যে সীমিত রাখবে। ফলে ভোক্তার কোনো স্বেচ্ছাচারী চাহিদার সংঘাত দেখা দেবে না।

কিন্তু এই ধারণা তিনটি কারণে ভুল প্রমাণিত হয়েছে:

(১) যখন কোনো নৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই, তখন বিত্তশালীরা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো ভোগ্য ও বিলাস সামগ্রী ক্রয় ও ভোগে কেন বিরত থাকবে? এটাই স্বাভাবিক যে সীমিত সম্পদের অপচয় দরিদ্র শ্রেণীর ভোগান্তি হবে- এ ধরনের বিবেক দংশনে ভোগার কারণ নেই। ধনিক শ্রেণী দরিদ্র শ্রেণীর দুঃখ-দুর্দশার জন্য নিজেদের বিলাস ও অপচয়কে দায়ী না করে বরং গরীব মানুষের অদক্ষতা ও তথাকথিত অকর্মণ্যতাকে দায়ী করে।

(২) ভোগলিপ্সা ও প্রয়োজন পূরণ অথবা অত্যাবশ্যক ও অপ্রয়োজনীয়- এভাবে চাহিদাকে আলাদা করে দেখার কোনো উপায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নেই। বরং এ ধরনের বিভাজন প্রক্রিয়ার কোনো অবকাশ পুঁজিবাদী দর্শনে নেই। যেহেতু এ ধরনের সামাজিক কোনো মূল্যবোধের তাড়না পুঁজিবাদী সমাজে নেই অথবা সমাজের সার্বিক চাহিদার বিচারে কোন দ্রব্যসামগ্রী প্রয়োজনীয় আর কোনগুলো তুলনামূলকভাবে কম প্রয়োজনীয়, তা নির্ধারণ করে দেবার বিষয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো ভূমিকা নেই। তাই ধনিক শ্রেণী জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে নিজেদের যথেচ্ছা ভোগলালসা ও চাহিদা দ্বারা দরিদ্র মানুষকে তাদের ন্যূনতম প্রয়োজন থেকেও বঞ্চিত করে থাকে।

(৩) বণিক শ্রেণী তাদের মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলার জন্য পত্রপত্রিকা, রেডিও টেলিভিশন ও অন্যান্য মাধ্যমে বিজ্ঞাপনী চমক চাঙ্গা করে তোলে। বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবনী বিজ্ঞাপনী প্রচারণা ভোক্তশ্রেণীর মাঝে এমন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সক্ষম যে, তার সামাজিক মর্যাদা তার কেনাকাটার ধার ও ভারের দ্বারা বাড়বে বা কমবে। ফলে সে তার মানসিক বিচারবুদ্ধি হরিয়ে ফেলে, চটকদার বিজ্ঞাপনী আকর্ষণের জোয়ারে ভেসে যায়। ‘স্টাটাস সিম্বল’ (Status Symbols)বা সামাজিক মর্যাদা লাভের অন্তহীন প্রতিযোগিতায় সমাজে সৃষ্টি হয় অফুরন্ত চাহিদার নানা প্রকরণ। গলব্রেথের ভাষায়, “ভোক্তাশ্রেণীর সকল প্রকার বিজ্ঞাপনী ভাষার মর্মবাণী দ্রব্যসামগ্রী ভোগের মাঝেই রয়েছে আনন্দের সর্বোচ্চ উৎস এবং এটাই হচ্ছে মানুষের অর্জনের সর্বোচ্চ শিখর”। ফলে অপ্রয়োজনীয় ও অত্যাবশ্যক নয় এমন সব সামগ্রীর উৎপাদনে বাজার ভরে যায়। বিজ্ঞাপনের প্রভাবমুক্তভাবে ভোক্তাশ্রেণীর যখন দ্রব্য সামগ্রী নির্বাচন ও কেনার স্বাধীনতা থাকে না, তখন ভোক্তাশ্রেণীর সার্বভৌমত্ব ও চূড়ান্ত স্বাধীনতার পুঁজিবাদ হাস্যকর বিষয় মাত্র।

এ ধরনের পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়া মুনাফার স্তূপকে স্ফীত করে তোলে ঠিকই, তবে তা দরিদ্র শ্রেণীকে তাদের প্রয়োজন পূরণের হক থেকে বঞ্চিত করার বিনিময়ে। ধনীক শ্রেণীর লোক দেখানো এই ভোগবিলাসপূর্ণ কেনাকাটায় ইন্ধন যোগায় বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্তৃক এ খাতে ঋণ প্রদান। এ বিষয়ে ড্যানিয়েল বেল এর মন্তব্য ‘আগে ক্রয়ের পূর্বে মানুষকে সঞ্চয় করতে হতো, আর এখন ক্রেডিট কার্ডের বদৌলতে মানুষের সঞ্চয় না থাকলেও তারা কেনার হিড়িকে নেমে যেতে পারে। ফলে আগে যা কল্পনা করেনি তেমন চাহিদা ও ক্রয়ের নতুন সড়ক খুলে যাচ্ছে’। ফলে একদিকে সকল কেনার ইচ্ছা হয়ত মিটছে না, কিন্তু অপরদিকে অবাঞ্ছিতভাবে বেড়ে চলেছে ঘাটতি, মুদ্রা সরবরাহের বৃদ্ধি, মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি এবং দুঃসহ বৈদেশিক ঋণ। এ ব্যবস্থা সমাজে অহংকার, হিংসা ও পরশ্রীকাতরতার জন্ম দিচ্ছে বলে অনেক পণ্ডিত ও গুণিজন সমালোচনা মুখর হয়েছেন। এ ধরনের তীক্ষ্ণ সমাজ সচেতন সমালোচনা যতই প্রশংসার দাবিদার হোক না কেন এতে কোনো কাজ হচ্ছে না। যতক্ষণ না সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের স্ফূরণ ঘটছে, অন্য মানুষের হকের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা সৃষ্টি না হচ্ছে, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টির আদর্শবাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা না হচ্ছে এবং সার্বিকভাবে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা সে আলোকে পুনর্গঠিত না হচ্ছে, ততদিন এ ক্ষয়ি‌ অবস্থার পরিবর্তন আশা করা যায় না।