hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৬৭

প্রকৃত চাহিদাপূরণ সহজীকরণ

পূর্বে আলোচিত তিনটি শ্রেণীবিন্যাসের মধ্যেই উদারীকরণকে ব্যাখ্যা করা যায়। যে সকল দ্রব্য ও সেবা প্রকৃত চাহিদার অন্তর্ভুক্ত সেগুলোর উৎপাদন, আমদানি ও বণ্টন সহজীকরণ করা উচিত। বাজার শক্তিকে তার গঠনমূলক ভূমিকা পালন করার সুযোগ দিতে হবে। সরকারের উচিত এ শ্রেণীভুক্ত দ্রব্য ও সেবার সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভব সকল প্রকার সুযোগ সৃষ্টি করা ও প্রয়োজনীয় উৎসাহ প্রদান করা। এ সকল দ্রব্য ও সেবার উপর যদি কোনো পরোক্ষ কর আরোপ করা একান্ত প্রয়োজন হয়, তবে সে ক্ষেত্রে নিম্নহারে ও ঐ দ্রব্য বা সেবার গুরুত্বের বিপরীত হারে (in the reverse order of priority) করা উচিত। নৈতিক প্রচারণা ও তুলনামূলক উচ্চ শুল্ক ও কর দ্বারা মাধ্যমিক পর্যায়ের দ্রব্যসামগ্রীর ভোগ নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন।

যাইহোক, বিলাসসামগ্রীর পর্যায়ভুক্ত ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয় এরকম দ্রব্য ও সেবার ব্যবহারকে উদারীকরণ করা জরুরি নয়। অর্থনীতিতে সম্পদের প্রবাহ যাতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন ঘটায় তা নিশ্চিত করার জন্যই এ ব্যবস্থা প্রয়োজন। পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে যে, কেবলমাত্র মূল্য পদ্ধতি এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সক্ষম নয়। নৈতিক সংশোধনের মাধ্যমে ভোক্তার অগ্রাধিকার তালিকায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যদি জনসাধারণ তাদের সামাজিক দায়িত্ব ও স্রষ্টার সামনে জবাবদিহিতার বিষয়টি বুঝতে পারে, যদি তারা উপলদ্ধি করতে পারে যে, দেশের সীমিত সম্পদের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ফলে অন্য লোকেরা তাদের অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন পূরণ করা থেকে বঞ্চিত হবে, তাহলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করে দেবে। অবশ্য যখন কোনো ভোগ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকার ফলে সমাজের মানসিক কাঠামোর অংশে ভোগ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকার ফলে সমাজের মানসিক কাঠামের অংশে পরিণত হয়, তখন এমনকি নৈতিক প্রণোদনাও অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হতে পারে। এজন্য সমাজের মানবিক কাঠামের পরিবর্তন প্রয়োজন। একক ব্যক্তি স্রোতের গতি পরিবর্তন করতে পারে না, বরং তাল মিলাতে বাধ্য হয়।

সুতরাং, সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির বৃহত্তর স্বার্থে সরল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালানো এবং সাথে সাথে এ জাতীয় দ্রব্য ও সেবা, যেমন বিলাসদ্রব্যের আমদানি, আড়ম্বরপূর্ণ উৎসব অনুষ্ঠান, যৌতুক এবং সামাজিক মর্যাদার প্রদর্শনী সরকারি আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করা যেতে পারে, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে যখন ইসলামী মূল্যবোধ পুরোপুরি আত্মস্ত হয়ে ওঠেনি এবং ভারসাম্যহীনতা একটি কঠিন সমস্যা হিসেবে বিরাজমান থাকে। ব্যক্তি যেই হোন না কেন, তিনি যত ধনী বা ক্ষমতাধরই হোন না কেন, তার উপর নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করার মধ্যে এক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত। একটি ক্ষুদ্র ব্যতিক্রম থেকে নিষেধাজ্ঞা অমান্যের ঢল নামতে পারে। এভাবে সম্পদের অপ্রয়োজনীয় চাহিদা নির্মূল করার ফলে এবং প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মুদ্রার বিনিময় হার ও অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে এ পদ্ধতি সাহায্য করবে। এমনকি মুসলিম দেশসমূহের সরকারগুলো যদি মুসলিম বিশ্বে বিরাজমান দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ অসংগতিপূর্ণ বিলাসী জীবনযাপন পদ্ধতিতে প্রথমেই আঘাত হানতে না পারে, তবে দুর্নীতি হ্রাসের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। এ ধরনের জীবনযাপন পদ্ধতি প্রায়শই মানুষকে অবৈধ উপার্জনের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য করে। যখণ তারা উপলদ্ধি করবে যে, ব্যয়বহুল ভোগ বিলাসের মাধমে নাম কেনার চেষ্টা তাদের সুনাম বিনষ্ট করবে এবং তাদের আয়ের উৎস সম্পর্কে মানুষের মনে প্রশ্ন সৃষ্টি হবে, তখণ লোকের অধিক উপার্জনের প্রবৃত্তি ও দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে।