hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৭

ভর্তুকির সুফল

চতুর্থত, এটা ধরে নেয়া হয়েছে যে, সেভিয়েত পণ্য মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে বিশাল ভর্তুকির ব্যবস্থা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করবে -এ ধারণাটিও ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। ভর্তুকি ব্যবস্থা দরিদ্র জনসাধারণের, যাদের ক্রয় ক্ষমতা সীমিত তাদের চেয়ে সাধারণত ধনী সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকেই বেশি উপকৃত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নে খাদ্য ভর্তুকির পরিমাণ ছিলো জাতীয় আয়ের১০ বাগ যা ইইসি’র তুলনায় ৫ গুণ বেশি। এ ব্যবস্থার ফলে কৃষি পণ্যের কম মূল্যের কারণে উৎপাদক কৃষক শ্রেণী বঞ্চিত হয়েছে। ফলে তাদের উৎপাদনের স্পৃহা হ্রাস পেয়েছে। অপরদিকে অনুৎপাদক ধনীক শ্রেণী এতে বেশি উপকৃত হয়েছে।

সোভিয়েত পরিকল্পনা পদ্ধতিতে বিশাল আকারের ভুর্তকি হচ্ছে স্বাভাবিক ব্যবস্থা। সর্বক্ষমতাসম্পন্ন মূল্য নির্ধারণকারী রাষ্ট্রীয় কমিটিকে সামান্য আলপিন হতে ট্রাক্টর পর্যন্ত প্রায় বিশ মিলিয়ন দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। এ কাজটি এতো দূরূহ যে, যতো লোকবল সমৃদ্ধ হোক না কেন, কোনো একক সরকারি সংস্তার পক্ষে তা নিষ্পন্ন করা সম্ভব নয়। এই একক সংস্থার পক্ষে ভোক্তার পছন্দ, চাহিদা এবং এ সংক্রান্ত প্রকৃত ব্যয় ইত্যাদি সম্পর্কিত সকল উপাত্ত সংগ্রহ না হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে পরিকল্পনা কমিশন মূল্য পরিবর্তন না করার সহজ পন্থাই গ্রহণ করে। তাই বছরের পর বছর মূল্য অপরিবর্তিত থাকে, বিশেষ করে খুচরা মূল্য। যার পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। এ ধরনের অপরিবর্তনীয় মূল্য কাঠামো, অদৃশ্য ভর্তুকি এবং উৎপাদন উপকরণ বন্টনে অন্যায্যতা ও অদক্ষতার জন্ম দেয়।

বিশাল আকারের ভর্তুকির ব্যবস্থা সীমিত সম্পদের অপরাধযোগ্য অপচয় ঘটায়। এই অপচয়ের ব্যাপ্তি একটি সাংবাদিক সম্মেলনে প্রদত্ত মিখাইল গর্বাচেভের বিবৃতি হতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। তাতে বলা হয়েছিল, ‘শিশুরা একটি পাউরুটি দিয়ে বল খেলছে এটা সচরাচর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। মূল্য নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান ভেলেন্টিন পাভলভ তাই সঠিকভাবে মন্তব্য করেন যে, দ্রব্যমূল্যের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সংযোগ সাধনে সামান্যই ভূমিকা পালন করে, ফলে সৃষ্টি হয় পাইকারী ও খুচরা পণ্যের বিপুল ঘাটতি। এই ঘাটতির তীব্র সংকটের অবসান কখনো সম্ভব হবেনা। কেননা একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যম ও গণতান্ত্রিক সকল পদ্ধতির কন্ঠরোধের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাকে চাপিয়ে দেয়া হয়। সোভিয়েত রাশিয়ার সিদ্ধান্তসমূহ উপর মহলে নির্ণীত হয় এবং সর্বস্তরে প্রতিপালিত হয়। রাশিয়ার একদলীয় ব্যবস্থা যা অতীতে শক্তিশালী সংস্থা কেজিবি কর্তৃক পরিচালিত এবং যেখানে গ্রেফতার, ‘বন্দি শিবির’ ও তথাকথিত ‘মানসিক হাসপাতাল’-এ প্রেরণের বিপুল ক্ষমতা বিদ্যমান এবং এ ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো প্রতিষেধক নেই। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে অপরিবর্তনশীলতা থাকাই আবশ্যম্ভাবী। এই ধরণের একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী স্বতঃস্ফুর্তভাবে পরিবর্তনের কেনো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির অস্তিত্ব নেই, অথবা সঠিক সিদ্ধান্তে পুরুস্কৃতি এবং বুল সিদ্ধান্তে শাস্তি দেবার কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, অপরিবর্তিত স্থির মূল্য কি ভোক্তা শ্রেণীর জন্যে সুবিধাজনক নয়? কিন্তু খেয়াল খুশি অনুযায়ী যখন দ্রব্যমূলকে স্থির রাখা হয় এবং চাহিদা ও সরবরাহ সূত্র অনুযায়ী তা নির্ধারিত হতে দেয়া হয়না, তখন এ ব্যবস্থা অন্যায্যতা ও বৈষম্যের উৎসে পরিণত হয় এবং সম্পদ ব্যবহার, কর্ম প্রেরণা এবং দীর্ঘ মেয়াদী সরবরাহ তথা অর্থনীতির উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। ভোক্তাগণ একদিকে উৎপাদিত পণ্যের অপচয়ে লিপ্ত হয়, অন্যদিকে শ্রমিক ও উৎপাদক শ্রেণী তাদের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য হতে বঞ্চিত হয়। পণ্য দ্রব্যের মান কমে যায় এবং তা ভোক্তা শ্রেণীর উপযোগিতাভিত্তিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। যেখানে শুধুমাত্র ধনীক ও আমলা শ্রেণী তাদের চাহিা অনুযায়ী পণ্য ক্রয় করতে সক্ষাম হয়, কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠী অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় সামগ্রী হতে বঞ্চিত হয় অথবা লাইনে দাঁড়িয়ে তদের মূল্যবান সময়ের অপচয় করে। যেহেতু উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক উৎপাদন করা হয়, তই স্বাভাবিকভাবে দেখা দেয় কতিপয় পণ্যের ঘাটতি, আবার পাশাপাশি আরেক শ্রেণীর পণ্যের বিপুল উদ্বৃত্তি। এ অপ্রয়োজনীয় উদ্বৃত্ত পণ্য অবিক্রিত থেকে যায়। কিন্তু এর দায়বার কাউকে বহন করতে হয়না এবং একই ভুল ধারায় উৎপাদন অব্যাহত থাকে।