hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭২

তৃতীয় অধ্যায়ঃ কল্যাণ রাষ্ট্রের সংকট

সামাজিক সুবিচারের বিষয়ে যারা অতিমাত্রায় সচেতন তারা প্রায়ই অনুভব করেন যে, তারা যেন বধিরের সাথে কথা বলছেন। -মাইকেল প্রাউজ

পুঁজিবাদী বিশ্বে কল্যাণ রাষ্ট্রের আবির্ভাব একটি ইতিবাচক ও শুভ ঘটনা। মহামন্দা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণায় গতিশীলতা সৃষ্টি হয়। যুদ্ধ ও মন্দা এবং সমাজতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ ধারণা ব্যাপ্তি লাভ করে। কল্যাণ রাষ্ট্রের পুঁজিবাদের অতিরিক্ত কুফলগুলো প্রমাণিত করে সমাজতন্ত্রের আবেদন হ্রাস করা। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ, শ্রমিক, পুঁজিবাদী নিবিশেষে সবাই এ ধারণা দ্বারা আকৃষ্ট হয়। কল্যাণ রাষ্ট্রের অনেক সমালোচকের মতে কল্যাণ রাষ্ট্র হচ্ছে, ‘শাষক শ্রেনীর কাছ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমানুষের কাছে ক্ষমতার হাত বদল না ঘটিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে একটি সামাজিক ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি’।

‘লেইজে ফেয়ার’ পুঁজিবাদে রয়েছে সামাজিক ডারউইনবাদের মমার্থ তথা শক্তিশালীদের টিকে থাকার দর্শন। অপরদিকে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণার পশ্চাতে এ ব্যবস্থা থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। এ বিশ্বাস এতে জয়লাভ করল যে, ব্যক্তিমানুষের কল্যাণ বিধান বাজারব্যবস্থার শক্তিসমূহের ক্রিয়া-বিক্রিয়ার খেয়ালের উপর ছেড়ে দেয়া যায় না।

মানুষের দারিদ্র্য ও স্বীয় প্রয়োজন পূরণের অবমতা শুধুমাত্র ব্যক্তি মানুষের নিজস্ব ব্যর্থতা মাত্র নয়, বরং তা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফল। এ ধারণা, বিশ্লেষণ ও বিশ্বাস অর্থনীতির মূল ধারায় স্বীকৃতি লাভ করল। নিজস্ব ত্রুটির কারণে মানুষ বেকার, অর্ধবেকার বা শ্রমের কম মূল্য পাচ্ছে না, বরং তার অন্য কারণ রয়েছে। তাই সীমিত সামর্থের মানুষদের আধুনিক সমাজে সুন্দর ও দক্ষভাবে বেঁচে থাকার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহায়ণ, যোগাযোগ প্রভৃতি সামাজিক সু্যোগ সুবিধা প্রদানের দ্বার উন্মোচন করা এবং শিল্প দুর্ঘটনা, অঙ্গহানি ও বেকারত্বের মতো সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে তাদের সামাজিক প্রতিরক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন। কল্যাণ রাষ্টের দর্শন রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসাবে পূর্ণ কর্মসংস্থান এবং সম্পদ ও আয়ের সুষম বন্টনকে নির্ধারণ করেছে। এ দর্শন লেইজে-ফেয়ার পূঁজিবাদী বা কীনেসীয় অর্থনৈতিক মতবাদের বিপরীতে রাষ্ট্রের ব্যাপক ও সক্রিয় ভূমিকার তত্ত্ব প্রচার করল।

কল্যাণ রাষ্ট্রের ধরণ এবং কার্যাবলি সম্পর্কে নানা মত রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকগণ এ সম্পর্কে কোনো ঐক্যমত্যে পৌছুতে পারেননি। দশকের পর দশক যাবত এ বিষয়ে এত বেশি আলোচনা করা হয়েছে যে, টিটমাস কল্যাণ রাষ্ট্রের সংজ্ঞাকে ‘অবর্ণনীয় বিমূর্ততা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কল্যাণ রাষ্ট্রের নানা ধরনের বাস্তব উদাহরণ রয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুইডেন পর্যন্ত বিস্তৃত।

কল্যাণ রাষ্ট্র উদারনীতিবাদের দর্শন বা বাজার অর্থনীতির অলঙ্ঘনীয়তার পোশাক ছেড়ে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারেনি। সেখানে মূল্যবোধ নিরপেক্ষ উদারনীতিবাদের মতাদর্শ অব্যাহত রইল। বাজারব্যবস্থার যে ত্রুটি রয়েছে তা সরকারি হস্তক্ষেপ দ্বারা দূর করা হলে গণতান্ত্রিক সমাজবাদ বিভিন্ন বঞ্চিত উৎপদান খাতে সম্পদের দক্ষ বণ্টন নিশ্চিত করতে সমর্থ হবে বলে ধরে নেয়া হলো। জনগণকে উপযোগিতামূরক দ্রব্য ও সেবা সরবরাহ করা হবে তথা বণ্টন খাতে সরকারের ভূমিকা অগ্রগণ্য হবে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল নাগরিক হবে সরকারি সুবিধার অংশীদার। সামাজিক অধিকার হিসেবে প্রথ্যেক ব্যক্তি মানুষের সরকারি সুবিধা প্রাপ্তির নীতি হবে সামাজিক ইনস্যুরেন্স কর্মসূচির ভিত্তি। এ নীতিমালা অনুসরণের যুক্তি হচ্ছে সাধারণ নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষের যোগ্যতা ও প্রাপ্যতা যাচাই বাছাইয়ের জন্য ন্যায়সংগত ভিন্ন কোনো পথ খোলা নেই এবং এর ব্যত্যয় ঘটালে ‘প্যারিটো অপটিমালিটি’র মানদণ্ডই লঙ্ঘিত হবে।