hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৭

উভয় সংকট

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার দুটি পন্থা রয়েছে- হয় উৎপাদন ব্যয় না হয় মোট চাহিদা কমাতে হবে। প্রথম ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী কোনো না কোনোভাবে দ্রব্যমূল্য হ্রাস করতে হবে। দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী সুষম বাজেটের দিকে ফিরে যেতে হবে। অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা দ্বারা প্রথমটি অর্জন করা যেতে পারে। অবশ্য এর দীর্ঘকালীন ব্যবহার সম্ভব নয়, বিশেষত মুদ্রাস্ফীতিজনক পরিস্থিতিতে। কারণ প্রকৃত মজুরি হ্রাসের এই ব্যবস্থা শ্রমজীবী মানুষের জন্য কষ্টদায়ক ও অন্যায্য। তাছাড়া এতে কালোবাজারী, দীর্ঘকালীন সরবরাহ স্বল্পতা এবং উৎপাদন উপাদানের বিভিন্ন খাতে বণ্টনে বিকৃতি দেখা হয়। দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণের ঢাকনা যখন তুলে ফেলা হয়, তখন দ্রব্যমূল্য ও মজুরি বৃদ্ধি পাগলা ঘোড়ার বেগে ছুটে আসে। সুষম বাজেটের ব্যবস্থাপত্র মূল্যস্ফীতির দিগন্তে স্বস্তির বাতাস এনে দিলেও অন্য সীমান্তে বৃদ্ধি হ্রাস, অধিকতর বেকারত্ব, কল্যাণ খাতে ব্যাপক কাটছাঁটের দুর্যোগ ডেকে আনে, বিশেষত যখন সরকার তার জন্য সকল খাতে বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে, ব্যয় কমাতে রাজী না থাকে এবং সেকুলার ভোগবাদী সমাজ যখন তাদের অনাবশ্যক ও অপচয়মূলক খরচ কমাতে অসম্মত থাকে। এ অবস্থা পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে একটি সংকটে নিপতিত করেছে। সৃষ্টি হয়েছে সমাধানহীন এক সংঘাতের। এ সংঘাত হচ্ছে পুঁজিবাদের কথিত সফল ও বাঞ্ছিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং মুদ্রাস্ফীতিমুক্ত স্বাস্থ্যকর অর্থনীতির সংঘাত।

তাই দেখা যাচ্ছে, কিনসীয় কৌশল উভয় সংকটের সৃষ্টি করেছে। একদিকে এ অর্থনৈতিক কৌশল দারিদ্র্য দূরীকরণ, ন্যূনতম প্রয়োজনের চাহিদা পূরণ, মূদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব সমস্যার সমাধান করত পারেনি। অন্যদিকে সম্পদ ও আয়ের বিশাল বৈষম্য হ্রাসেরও কোনো পন্থা এই কৌশল উদ্ভাবন করতে পারেনি। অবশ্য সমাজতন্ত্রের অপ্রতিরোধ্য অগ্রাধিকারের মুখে এ লক্ষ্যসমূহ কালক্রমে বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহনযোগ্যতা লাভ করেছে, যা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার জন্ম দিয়েছে এবং পশ্চিমা ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে কল্যাণ রাষ্ট্রের এ ধারণা সজীব শিকড়ের আকার ধারণ করেছে।

কল্যাণ রাষ্ট্র কেবলমাত্র অর্থনীতিতে সরকারের ভারসাম্য সৃষ্টিকারী ভূমিকা পালনের কিনসীয় প্রস্তাবকেই গ্রহণ করেনি, অধিকন্তু কল্যাণ খাতে অধিকতর ব্যয় এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের কল্যাণমুখী ভূমিকাকেও আত্মস্থ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি কোনো খাতে ভারসাম্য সৃষ্টিকারী ব্যয় হ্রাস না করেই কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তির উপর প্রত্যাঘাতের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক ডারউইনবাদীদের দৃষ্টিতে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে কল্যাণ খাতে ব্যয় হ্রাস। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সমাজ, মনুষ্যত্বের উদ্বোধন যার লক্ষ্য হিসেবে এখানে সজীব, সেখানে কল্যাণ খাতে ব্যয় হ্রাস বা পূর্ণ কর্মসংস্থান ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার অর্জনের লক্ষ্য কি বিসর্জন দেয়া সম্ভব? যেহেতু এটা সম্ভব নয়, তাই প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে কোথায় ভুল আর কোথায় বিভ্রান্তি? এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও পদ্ধতিতেই মৌলিক গলদ রয়েছে।