১
ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৯৯
নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির পুনারাবির্ভাব
উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন যেসব সমস্যায় ভুগছে, তার ফলেই পুরুত্থান ঘটেছে নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির। তিন দশক যাবত সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতির বৃহৎ সরকার এবং সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এসব সমস্যার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। সরকারি খাতের বিনিয়োগের উপর প্রবল গুরুত্ব প্রদান এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আরোপ করার ফলে শুধুমাত্র উৎপাদন উপাদান বণ্টনের মধ্যে বিকৃতি সৃষ্টি হয়নি, অধিকন্তু বৈদেশিক বাণিজ্য ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পদের অসম বণ্টনের ফলে বেসরকারি খাতের উদ্যম ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা ব্যাহত হয়েছে। বিপুল পুঁজিনির্ভর বৃহদায়তন ভারী শিল্পের প্রতি অনুৎসাহ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন; বিনিময়ে যে শিল্পায়ন ঘটেছে তা হয়েছে অদক্ষ ও অফলপ্রসূ। আইএমএফ-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাইকেল ক্যামডিসাস সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘যেসব দেশের অর্থনীতি প্রবল মুদ্রাস্ফীতি, বিশাল বাজেট ঘাটতি, প্রচুর বাণিজ্য প্রতিবন্ধতা, ভারসাম্যহীন বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং ক্রমাগত পুঁজি পাচার দ্বারা উপদ্রুত, তারা দীর্ঘকালীনভাবে উন্নয়নের পথে ধাবিত হতে পারে না। শ্লথ প্রবৃদ্ধি ও ভারসাম্যহীনতার চেয়েও বিষাদময় চিত্র হচ্ছে, এসব গরীব দেশগুলোর বৈষম্য, বেকারত্ব ও অর্ধ-বেকারত্ব ও সর্বগ্রাসী দারিদ্র্যের পরিসীমাকে হ্রাস করতে না পারার ব্যর্থতা। দরিদ্র দেশগুলোর সমস্যা হ্রাস পাবার বদলে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাধীনতা এবং জাতীয় সরকার গঠনের ফলে যে প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণ হয়নি।
সমাজতান্ত্রিক উন্নয়ন কৌশলের ব্যর্থতার পথ ধরে নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির যে পুনর্জাগরণ, তা উন্নয়শীল দেশসমূহকে তারা যে সোপান থেকে শুরু করেছিল সেখানে ফিরিয়ে আনল। তা হলো সীমিত সম্পদের ব্যবহারে দক্ষতা ও ন্যায়পরতা আনয়ন। উন্নয়ন অর্থনীতি এবার দৃশ্যত নতুন চেহারা ধারণ করল। শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধি নয়, আর্থ-সামাজিক ন্যায়পরতাও এবার লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধার্য হলো। সত্তর দশকের শুরু হতে এ ধারা সূচিত হলো। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন শুধুমাত্র মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি নয়, দারিদ্র্যের মাত্রা হ্রাসও।
সবাই উপলদ্ধি করতে শুরু করল যে, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দরিদ্র ও জনসংখ্যাপীড়িত দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সমৃদ্ধির আশার আলো দেখাতে পারে শুধুমাত্র মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সাথে দীর্ঘকালীন ন্যায়পরতাভিত্তিক বণ্টন। আগে উন্নয়ন এবং পরে ন্যায়পরতাভিত্তিক বিতরণ-এ ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। উন্নয়ন অর্থনীতি তাই আর শুধুমাত্র জাতীয় আয় বৃদ্ধির বেদীমূলে পূজার নৈবেদ্য হয়ে থাকল না, বরং তা বণ্টন ন্যায়পরতার প্রবক্তা হয়ে উঠল। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ, সামগ্রিক দারিদ্র্যের মাত্রা হ্রাস, ন্যায়পরতার সাথে উন্নয়ন প্রভৃতি আহবান উচ্চারিত হলো। নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতি অর্থনৈতিক কার্যকারণের যৌক্তিকতার অভিভাবক হিসেবে না থেকে ‘গরীবের অভিভাবক’ হিসেবে আবির্ভূত হলো।
১৯৭৩ সালে নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ব্যাংকের বার্ষিক সভায় ব্যাংকের তৎকালীন সভাপতি ম্যকনামারা বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করেন তাদের প্রতি, যারা নিশ্ছিদ্র দারিদ্র্যে মধ্যে বসবাস করছে; যারা ক্ষধা, পুষ্টিহীনতা, ব্যাধি ও অশিক্ষার যাতাকলে চরমভাবে পিষ্ট। ১৯৭৯ সালে নোবেল প্রাইজ গ্রহণকালে থিওডর শুলজ বলেন, ‘পৃথিবীর অধিকাংশ লোক গরীব। তাই গরীব হওয়ার কারণ সম্পর্কিত অর্থনীতিটি যদি আমরা জানতে পারি, তবে অর্থনীতির সত্যিকার জ্ঞান উদয় হবে’। জেরাল্ড মেয়ারের ১৯৮৪ সনে প্রকাশিত ‘Leading Issues in Economic Developmemt’ এর প্রথম সংস্করণে দারিদ্র্য, বৈষম্য, আয় বণ্টন প্রভৃতি বিষয় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত চতুর্থ সংস্করণে তিনি উন্নয়নশীল দেশে আয় বণ্টনের ন্যায়পরতার উপর উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব আরোপ করেন। একই সালে প্রকাশিত অন্য একটি বইয়ে তিনি দারিদ্র্য থেকে মুক্তিকেই অর্থনীতির একমাত্র প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন। আয় বণ্টন ন্যায়পরতার প্রতি উদ্বেগ সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ডাডলি সিয়ার্স এর ভাষায়, ‘একটি দেশের উন্নয়ন হচ্ছে কিনা তা জানতে হলে প্রশ্ন করতে হবে, সে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির কি অবস্থা? বেকারত্ব পরিস্থিতির কি রূপ? আয় বৈষম্যের অবস্থা কি? যদি এ তিনটি অবস্থারই উন্নতি হয়ে থাকে তবে নিঃসন্দেহে সে দেশের উন্নয়ন ঘটছে বলা যায়। যদি কেন্দ্রীয় সমস্যাত্রয়ের একটি বা দুটির বিশেষভাবে যদি তিনটিরই অবনতি ঘটে তবে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হলেও সে দেশের উন্নয়ন ঘটছে বলা অসম্ভব হবে’।
সমাজতান্ত্রিক উন্নয়ন কৌশলের ব্যর্থতার পথ ধরে নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির যে পুনর্জাগরণ, তা উন্নয়শীল দেশসমূহকে তারা যে সোপান থেকে শুরু করেছিল সেখানে ফিরিয়ে আনল। তা হলো সীমিত সম্পদের ব্যবহারে দক্ষতা ও ন্যায়পরতা আনয়ন। উন্নয়ন অর্থনীতি এবার দৃশ্যত নতুন চেহারা ধারণ করল। শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধি নয়, আর্থ-সামাজিক ন্যায়পরতাও এবার লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধার্য হলো। সত্তর দশকের শুরু হতে এ ধারা সূচিত হলো। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন শুধুমাত্র মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি নয়, দারিদ্র্যের মাত্রা হ্রাসও।
সবাই উপলদ্ধি করতে শুরু করল যে, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দরিদ্র ও জনসংখ্যাপীড়িত দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সমৃদ্ধির আশার আলো দেখাতে পারে শুধুমাত্র মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সাথে দীর্ঘকালীন ন্যায়পরতাভিত্তিক বণ্টন। আগে উন্নয়ন এবং পরে ন্যায়পরতাভিত্তিক বিতরণ-এ ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। উন্নয়ন অর্থনীতি তাই আর শুধুমাত্র জাতীয় আয় বৃদ্ধির বেদীমূলে পূজার নৈবেদ্য হয়ে থাকল না, বরং তা বণ্টন ন্যায়পরতার প্রবক্তা হয়ে উঠল। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ, সামগ্রিক দারিদ্র্যের মাত্রা হ্রাস, ন্যায়পরতার সাথে উন্নয়ন প্রভৃতি আহবান উচ্চারিত হলো। নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতি অর্থনৈতিক কার্যকারণের যৌক্তিকতার অভিভাবক হিসেবে না থেকে ‘গরীবের অভিভাবক’ হিসেবে আবির্ভূত হলো।
১৯৭৩ সালে নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ব্যাংকের বার্ষিক সভায় ব্যাংকের তৎকালীন সভাপতি ম্যকনামারা বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করেন তাদের প্রতি, যারা নিশ্ছিদ্র দারিদ্র্যে মধ্যে বসবাস করছে; যারা ক্ষধা, পুষ্টিহীনতা, ব্যাধি ও অশিক্ষার যাতাকলে চরমভাবে পিষ্ট। ১৯৭৯ সালে নোবেল প্রাইজ গ্রহণকালে থিওডর শুলজ বলেন, ‘পৃথিবীর অধিকাংশ লোক গরীব। তাই গরীব হওয়ার কারণ সম্পর্কিত অর্থনীতিটি যদি আমরা জানতে পারি, তবে অর্থনীতির সত্যিকার জ্ঞান উদয় হবে’। জেরাল্ড মেয়ারের ১৯৮৪ সনে প্রকাশিত ‘Leading Issues in Economic Developmemt’ এর প্রথম সংস্করণে দারিদ্র্য, বৈষম্য, আয় বণ্টন প্রভৃতি বিষয় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত চতুর্থ সংস্করণে তিনি উন্নয়নশীল দেশে আয় বণ্টনের ন্যায়পরতার উপর উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব আরোপ করেন। একই সালে প্রকাশিত অন্য একটি বইয়ে তিনি দারিদ্র্য থেকে মুক্তিকেই অর্থনীতির একমাত্র প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন। আয় বণ্টন ন্যায়পরতার প্রতি উদ্বেগ সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ডাডলি সিয়ার্স এর ভাষায়, ‘একটি দেশের উন্নয়ন হচ্ছে কিনা তা জানতে হলে প্রশ্ন করতে হবে, সে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির কি অবস্থা? বেকারত্ব পরিস্থিতির কি রূপ? আয় বৈষম্যের অবস্থা কি? যদি এ তিনটি অবস্থারই উন্নতি হয়ে থাকে তবে নিঃসন্দেহে সে দেশের উন্নয়ন ঘটছে বলা যায়। যদি কেন্দ্রীয় সমস্যাত্রয়ের একটি বা দুটির বিশেষভাবে যদি তিনটিরই অবনতি ঘটে তবে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হলেও সে দেশের উন্নয়ন ঘটছে বলা অসম্ভব হবে’।