hadith book logo

ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪৫

ভ্রান্তনীতি সংস্কার

ইসলামী অনুশাসন দাবি করে যে, মালিকপক্ষ শ্রমিক কর্মচারিকে নিজ পরিবারের সদস্যের মতো মনে করবে। শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার সাথে আচরণ করবে। তাদের কল্যাণের প্রতি খেয়াল রাখবে। প্রকৃত মজুরি এমন হবে, যাতে শ্রমিক তার পরিবারবর্গ নিয়ে মানবোচিত জীবনযাপন করতে পারে। শ্রমিক মালিকের মাঝে থাকবে দীর্ঘকালনি সুসম্পর্কের সেতুবন্ধন। শ্রমিকদের প্রদান করা হবে যথাযথ প্রশিক্ষণ, কাজের নিরাপত্তা এবং মুনাফার ন্যায্য হিস্যা।

অথচ বিপরীত চিত্রটাই লক্ষণীয়। প্রত্যহ ১০ থেকে ১৪ ঘন্টা কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও পারিশ্রমিক এতই সামান্য যে, পরিবার পরিজন নিয়ে সর্বনিম্ন প্রয়োজন মেটাতেই শ্রমিককে হিমশিম খেতে হয়। উপরন্তু কর্মেরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কর্ম উৎপাদনশলিতা, শ্রমিকের সংখ্যাধিক্য, কর্মসংস্থানের অভাব ইত্যাদি মজুরির নিম্নহার ও কর্মের নিরাপত্তাহীনতার জন্য দায়ী মর্মে নিওক্লাসিকাল অর্থনীতিবিদগণ ধারণা দিতে চেষ্টা করেন। প্রকৃত প্রস্তাবে এ ব্যাখ্যা যথাযথ নয়। শোষণমূলক ব্যবস্থাই বস্তুত এ দুর্দশার জন্য দায়ী। নৈতিকতা বিবর্জিত শোষক শক্তিসমূহের যোগসাজশ, ইনসাফহীন সরকারি নীতি, সম্পদ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রাপ্তির সুযোগের অভাব প্রভৃতি কার্যকারণ এ পরিণতির জন্য দায়ী। শোষক গোষ্ঠীসমূহের শক্তি যদি খর্ব করা না যায়, তবে শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি ইনসাফ করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিকট হতে উদ্দীপনাময় ও দক্ষ কাজও আশা করা যায় না।

শুধুমাত্র ন্যূনতম মজুরি আইন প্রণয়ন দ্বারা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কেননা প্রথমত এটাকার্যকর করা কঠিন। আর যদি প্রয়োজনে করাও হয়, তাহলে এর দুটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। প্রথমত, মালিকপক্ষ প্রকৃত যে মজুরি দেবে এবং কাগজে কলমে যা দেখাবে তার মাঝে শুভংকরের ফাঁক থেকে যেতে পারে। ফলে একদিকে শ্রমিক তার প্রকৃত আইনানুগ মজুরি পেল না, অন্যদিকে মালিকপক্ষ খাতাপত্রে হিসেবে দেখিয়ে সরকার হতে কর রেয়াত পাবার সুযোগ পেয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, ন্যূনতম মজুরি ও বেকার সমস্যার আরো অবনতি ঘটতে পারে।

তাই প্রয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের এক নীতিমালা অনুসরণ, যা বর্তমান শোষণযন্ত্রের ধার ভোঁতা করে দেবে। সে পন্থা হবে, প্রথমত শ্রমিকের উৎপাদনশলিতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ; দ্বিতীয়ত, গ্রাম ও শহরে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সমপ্রসারণ। এ ধরনের সৃজনশলি কর্মসূচির মৌলিক উপাদানসমূহ হবে: (ক) উন্নততর বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদনশলিতা বৃদ্ধি; (খ) ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক শিল্পখাতে প্রতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধা সমপ্রসারণ; (গ) সাধারণ মানুষের নৈমিত্তিক দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন এবং আয় ও সম্পদের তীব্র বৈষম্য হ্রাসের লক্ষ্যে অর্থনীতির সার্বিক পুনর্গঠন। মুনাফার শ্রমিকের অংশীদারীত্ব ও শিল্প কারখানায় শেয়ার-স্টকে যত ব্যাপকভাবে সম্ভব শ্রমিকের মালিকানা প্রদানের মাধ্যমে উপযুক্ত কর্মসূচিকে আরো শক্তিশালী করা যায়।

প্রত্যেক শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের মুনাফার অংশীদারীত্ব প্রদানের জন্য স্কিম প্রণয়ন করতে হবে। মুনাফার একটি নির্ধারিত হিস্যার একাংশ শ্রমিকদের বোনাস হিসেবে প্রদান করতে হবে। বাকি অংশ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, কাজের পরিবেশ উন্নয়ন, চিকিৎসা সুবিধা, সন্তানের শিক্ষা ভাতা, গৃহায়ন ও খাদ্য ভর্তুকিতে ব্যয় করা হবে। মুনাফা বৃদ্ধির সাথে শ্রমিকের মজুরি নীতি কতগুলো উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে আনবে।

যেমন-

(ক) শ্রমিকদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে এবং উৎপাদনশলিতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে;

(খ) ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকের অংশগ্রহণের অধিকার মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করবে এবং এটা হবে মুসলিম সমাজের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্যের পুনরুজ্জীবন;

(গ) উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে শিল্পকারখানায় সাধারণভাবে উৎপাদন ও মুনাফা বৃদ্ধি পাবে, ফলে মুনাফা হ্রাস বা লোকসানের সময় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন পড়বে না;

(ঘ) ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণের কারণে মুনাফা সম্পর্কে সঠিক তথ্য শ্রমিকদের জানা থাকবে; এর ফলে মালিক পক্ষের কর প্রদান এড়াবার প্রবণতা হ্রাস পাবে, অবশ্য কর ব্যবস্থারও সংস্কার সাধন করতে হবে;

(ঙ) অর্থনীতিতে বাঞ্ছিত প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগ ও সামষ্টিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

শিল্প-কারখানায় শ্রমিকের মালিকানা লাভ সম্পদ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করবে। ইকুইটির মালিক হওয়ায় শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের ব্যাপারে যত্নবান হবে। মোট কথা মালিকানায় অংশীদারিত্ব ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণের ফল শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত সৃষ্টি হবে। শ্রমিক অসন্তোষ হ্রাস পাবে ও দক্ষ, সচেতন কর্মীবাহিনী গড়ে উঠবে। সঞ্চয় বৃদ্ধি পাবে।