১
ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৬৭
সংস্কারের সমস্যা
সংস্কারের কৌশল হিসেবে যেসব পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে তা পুঁজিবাদের সেকুলার কাঠামোার সাথে সামঞ্জস্যশীলতার কাঁচিতে কেটেই প্রদান করা হয়েছে এবং সে পরামর্শগুলো হচ্ছে: সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনুদ্ধারের জন্যে সরকারি ব্যয় কমাও ও ঋণ সংকোচনের নীতি গ্রহণ কর, বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ দ্বারা মূল্য নির্ণীত হতে দাও, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে ফেল এবং ব্যক্তি মালিকানা চালু কর। এগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার মূল্য লক্ষ্য ন্যায়পরতা সমাধিকে ঢেকে দেবে। আবার এ পরিপূর্ণ পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস চিরায়ত মূল্যবোধ সমৃদ্ধ চিন্তাদর্শন ব্যতীত সেকুল্যার মূল্যবোধের কাঠামোয় অর্জন করা সম্ভব নয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণের জন্যে সরকারি ব্যয় হ্রাস করা প্রয়োজন। কিন্তু জনকল্যাণ যখন সরকারি ব্যয়ের উপর মূলত নির্ভরশীল তখন এটা করা কঠিন, কেননা সরকারি ব্যয় হ্রাস রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে- বিশেষত যখন ভর্তুকি তুলে নেয়া হবে; চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক নিয়মে মূল্যকে নির্ণীত হতে দেয়া হবে; মজুরি বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা হবে এবং ফলে প্রকৃত আয়া হ্রাস পাবে। অধিকন্তু হ্রাসকৃত সরকারি ব্যয়ের সাথে মিলে বিরাষ্ট্রীয়করণকৃত সংস্থাসমূহের ব্যয় কমানোর চেষ্টা বেকারত্ব বাড়িয়ে তুলবে। বেকারদের জন্যে কোনো কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো তীব্র হবে। বিজাতীয়করণ জনগণের আয় ও সম্পদের ন্যায়পরতা অমীমাংসিত প্রশ্নটি আবার জাগিয়ে তুলবে, সোভিয়েত ইউনিয়নে যা ইতোমধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, সুচারুভাবে পরিকল্পিত এবং যুগপৎ দক্ষতা ও ন্যায়পরতা লক্ষ্য পূরণে সক্ষম পরিবর্তন কৌশল নিরূপন ব্যতিরেকে সংস্কার কতো কঠিন। সেকুলার কাঠামোর আওতায় সমাজতন্ত্রী অর্থনীতিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবস্থায় রূপান্তরের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করবে। দরিদ্র ও বিত্তহীন জনগণ এভাবে ভোগান্তির সম্মুখীন হবে। অপরাধের মাত্রাও বৃদ্ধি পাবে। কেননা একনায়কবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে অপরাধ রোধের জন্যে নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। সংস্কারবাদী সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিসমূহ ফলে দ্বৈত সমস্যার সম্মুখীন- কী করে অতীতের বৈষম্য ও অন্যায়পরতাসমূহ দূর করা যায় যা বর্তমান আর্থ-সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে এবং একই সাথে কিভাবে দুর্নীতি ও ভাসরসম্যহীনতা বৃদ্ধি না করে যুগপৎ দক্ষতা ও ন্যায়পরতা বিধান করা যায়। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের কৌশল যা সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ বর্তমান মডেল হিসেবে গ্রহণ করেছে তা সহায়ক না-ও হতে পারে। কেননা এ ধরনের মডেলের দেশসমূহ পূর্ব ইউরোপীয় দেশের মতো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও ঘাটতির সমস্যায় ভুগছেনা। ভিন্নতর কোনো কৌশল অবলম্বন করা না হলে বর্তমানে সামাজিক গণতন্ত্রের দেশসমূহ যে সমস্যায় ভুগছে পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহকে তার চেয়ে অধিকতর প্রকট সামষ্টিক ভারসাম্যহীনতা ও অন্যান্য সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। সংস্কার কর্মসূচিতে নৈতিক মাত্রা সংযোজন এবং আমূল আর্থ-সমাজিক পুনর্গঠনের পদক্ষেপ নেয়া না হলে পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহকে উন্নয়ন তরান্বিত ও ঘাটতি পূরণের জন্যে সম্ভবত বিশালায়তনের ঋণের দিকে ঝুকে পড়তে হবে। এর ফলে জনগণকে আপাততঃ শান্ত রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে অন্যান্য জটিল সমস্যার সৃষ্টি হবে, যা বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশসমূহ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে।