১
ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
লেখকঃ ড. এম উমর চাপরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৩০
একটি ব্যাপকভিত্তিক প্রস্তাবনা
অতএব দেখা যাচ্ছে যে, দক্ষ ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বরাদ্দ ও বিতরণের জন্য ইসলাম কোনো যাদুকরী ফর্মুলা, কর্মকৌশল ও প্রক্রিয়ার দাবি করে না। কোনো প্রক্রিয়ার এরকম দাবি সে সমাজের জটিলতা উপলদ্ধি ও সামাজিক লক্ষ্য অর্জন এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্বার্থকে সমন্বিত করার ক্ষেত্রে অসুবিধাসমূহ উপলদ্ধির অসামর্থ্যের ইঙ্গিত দেয়। তাতে ঐ সব পদ্ধতিতে তাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়া, এবং সুবিধাবাদী শ্রেণীর সমৃদ্ধির জন্য ‘বৈজ্ঞানিক’ যৌক্তিকতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।
ইসলাম অধিকতর বাস্তবভিত্তিক। ইসলাম দুষ্পাপ্যতা থেকে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অসুবিধাসমূহ অনুভব করে এবং বিভিন্ন পন্থার সমন্বয়ে প্রণীত কর্মকৌশলের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করে, যে কর্মকৌশল সম্পূর্ণভাবে ইসলামের বিশ্বদর্শন ও মাকাসিদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এ ধরনের একটি ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতিতে কার্যকর কোনো কর্মকৌশলের জন্ম হতে পারে না, সেটা হতে পারে সামাজিক শ্রেণীসমূহ ও বহুত্ববাদী দলগুলোর পরস্পর বিরোধী দাবির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে প্রণীত অসংলগ্ন নীতিসমূহের একটি জগাখিচুড়ি সংমিশ্রণ।
এরপরও কিছু লেখক এ ধরনের একটি মিথ্যা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, ইসলামী কর্মসূচী তিনটি ব্যবস্থার উপর ভিত্তিশীল-আচরণ, যাকাত ও সুদের নিষিদ্ধতা। এ তিনটি ব্যবস্থা অর্থনৈতিক কাঠামো পুণর্বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমস্ত অংশ নয়। এমনকি এ তিনটি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে যদি এর পিছনে একটি যথার্থ বিশোধনমূলক কর্মপন্থা, একটি জোরদার উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থা, কার্যকর পুনর্গঠন এবং সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক ভূমিকার সাহায্য ও সমর্থন থাকে। এ তিনটি ব্যবস্থা এককভাবে ‘মাকাসিদ’ অর্জনের বোঝা ও দায়িত্ব বহন করতে পারে না। এটি একটি কঙ্কালের মাথার খুলি, বুক ও পা দেখে সেটিকেই মানুষ বলার মতো। এগুলো মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এগুলোর কোনোটিই একজন মানুষের ভূমিকা পালন করতে পারে না। এতে একক কোনো উপাদানের সাহায্যে সম্পূর্ণ রন্ধন প্রণালীর পার্থক্য থেকে যায়। পৃথকভাবে উপাদানগুলো সম্পূর্ণ খাবারের স্বাদ, সুগন্ধ রং ও অসম্পূর্ণতা দিতে পারে না, তা সমস্ত রন্ধন প্রণালীতে উপাদানগুলো যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন।
ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে যে, মানবসত্তার পরিবর্তনে এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বপূর্ণতার সাথে কাজ করতে তাদেরকে উদ্বুদ্ধকরণে বিশ্বাস ও আচরণের যে ক্ষমতা রয়েছে, তাকে খাটো করে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। মূলত এ ধরনের বিশ্বাস ও আচরণ না থাকলে কোনো ব্যবস্থাই টিকে থাকতে পারে না, তা তার পিছনে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান যে শক্তিই থাকুক না কেন। এ ধরনের বিশ্বাস ও আচরণের আদর্শ, এমনকি পুঁজিবাদও, সমাজতন্ত্রের অধীনে টিকে থাকতে পারে না। সেকুলার মতবাদ তাকে নির্মূল করতে পারেনি, কেবল ব্যাপকভাবে দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছে। গুরুত্ব না দেয়া সত্ত্বেও তারা সংক্ষিপ্ত পরিধিতে হলেও ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্বার্থেল সমন্বয় সাধনে এবং সম্পদ বরাদ্দ ও বণ্টনে ন্যায়পরায়ণতার ন্যূনতম পর্যায় সংরক্ষণের কাজ করে থাকে। এটা ব্যতিরেকে সংশ্লিষ্ট সমাজগুলো হয় নিজেদেরই টুকরো টুকরো করে ফেলবে অথবা বিপ্লবের আবর্তে নিয়োজিত হবে। তবে এগুলোর চরম অবস্থায় অধিকাংশ ব্যতিরেকে সমাজকল্যাণের মধ্যে তাদের স্বার্থ সেই পর্যায়ে সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, যে পর্যায়ে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পুনর্গঠনের মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্যামুয়েল বৃটান যথার্থই বলেছেন, ‘কঠোর উন্নাসিকের সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে, মানব ক্রিয়ায় নৈতিক বৈধতার ভূমিকাকে অবমূল্যায়ন করা। আত্মস্বার্থ উদ্ধারের উপর নিয়ন্ত্রণকারী কিছু বিধি ছাড়া কোনো মানব সংগঠনই কাজ করতে পারে না’। যাকাত, উত্তরাধিকার এবং সুদের উচ্ছেদ শুধুমাত্র এমন মূল্যবোধ নয়, যা প্রত্যেক মুসলিমকে ব্যক্তিগত, ইহলৌকিক ও পরলৌকিক কল্যাণের জন্য বিশ্বস্ততার সঙ্গে মেনে চলতে হবে। মাকাসিদ অর্জন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে এসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রয়েছে। সরকারের ভূমিকাসহ ইসলামী কর্মকৌশলের অন্যান্য উপাদানসমূহের কার্যকর পুনরুজ্জীবনের পরিপ্রেক্ষিত এদের গুরুত্ব অবমূল্যায়ন করা সঠিক নয়। তবে এগুলো সবই একটি সার্বিক আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠনের অংশ এবং বিচ্ছিন্নভাবে প্রয়োগ করে তাদের পূর্ণ কার্যক্ষমতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ইসলামী কর্মসূচিকে তার সার্বিক কার্যকারিতার জন্য সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করতে হবে, আংশিক গ্রহণ বাস্তবায়ন লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করতে পারে না। এ ব্যাপারে আল-কোরআনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে:
‘তুমি কি পবিত্র গ্রন্থের একটি মাত্র বিশ্বাস করবে এবং অবশিষ্ট পরিত্যাগ করবে? কিন্তু তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে, তাদের জন্যে এ দুনিয়াতে বেইজ্জতি এবং হাশরের দিন কঠোর শাস্তি ছাড়া আর কি শাস্তি হতে পারে?’ (২:৮৫)
‘হে মুসলিমগণ, ইসলামের ভিতর পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। কারণ সে তোমার নিশ্চিত শত্রু’। (২:২০৮)
‘আল্লাহ ততক্ষণ কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’। (১৩:১১)
ইসলাম অধিকতর বাস্তবভিত্তিক। ইসলাম দুষ্পাপ্যতা থেকে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অসুবিধাসমূহ অনুভব করে এবং বিভিন্ন পন্থার সমন্বয়ে প্রণীত কর্মকৌশলের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করে, যে কর্মকৌশল সম্পূর্ণভাবে ইসলামের বিশ্বদর্শন ও মাকাসিদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এ ধরনের একটি ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতিতে কার্যকর কোনো কর্মকৌশলের জন্ম হতে পারে না, সেটা হতে পারে সামাজিক শ্রেণীসমূহ ও বহুত্ববাদী দলগুলোর পরস্পর বিরোধী দাবির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে প্রণীত অসংলগ্ন নীতিসমূহের একটি জগাখিচুড়ি সংমিশ্রণ।
এরপরও কিছু লেখক এ ধরনের একটি মিথ্যা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, ইসলামী কর্মসূচী তিনটি ব্যবস্থার উপর ভিত্তিশীল-আচরণ, যাকাত ও সুদের নিষিদ্ধতা। এ তিনটি ব্যবস্থা অর্থনৈতিক কাঠামো পুণর্বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমস্ত অংশ নয়। এমনকি এ তিনটি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে যদি এর পিছনে একটি যথার্থ বিশোধনমূলক কর্মপন্থা, একটি জোরদার উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থা, কার্যকর পুনর্গঠন এবং সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক ভূমিকার সাহায্য ও সমর্থন থাকে। এ তিনটি ব্যবস্থা এককভাবে ‘মাকাসিদ’ অর্জনের বোঝা ও দায়িত্ব বহন করতে পারে না। এটি একটি কঙ্কালের মাথার খুলি, বুক ও পা দেখে সেটিকেই মানুষ বলার মতো। এগুলো মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এগুলোর কোনোটিই একজন মানুষের ভূমিকা পালন করতে পারে না। এতে একক কোনো উপাদানের সাহায্যে সম্পূর্ণ রন্ধন প্রণালীর পার্থক্য থেকে যায়। পৃথকভাবে উপাদানগুলো সম্পূর্ণ খাবারের স্বাদ, সুগন্ধ রং ও অসম্পূর্ণতা দিতে পারে না, তা সমস্ত রন্ধন প্রণালীতে উপাদানগুলো যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন।
ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে যে, মানবসত্তার পরিবর্তনে এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বপূর্ণতার সাথে কাজ করতে তাদেরকে উদ্বুদ্ধকরণে বিশ্বাস ও আচরণের যে ক্ষমতা রয়েছে, তাকে খাটো করে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। মূলত এ ধরনের বিশ্বাস ও আচরণ না থাকলে কোনো ব্যবস্থাই টিকে থাকতে পারে না, তা তার পিছনে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান যে শক্তিই থাকুক না কেন। এ ধরনের বিশ্বাস ও আচরণের আদর্শ, এমনকি পুঁজিবাদও, সমাজতন্ত্রের অধীনে টিকে থাকতে পারে না। সেকুলার মতবাদ তাকে নির্মূল করতে পারেনি, কেবল ব্যাপকভাবে দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছে। গুরুত্ব না দেয়া সত্ত্বেও তারা সংক্ষিপ্ত পরিধিতে হলেও ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্বার্থেল সমন্বয় সাধনে এবং সম্পদ বরাদ্দ ও বণ্টনে ন্যায়পরায়ণতার ন্যূনতম পর্যায় সংরক্ষণের কাজ করে থাকে। এটা ব্যতিরেকে সংশ্লিষ্ট সমাজগুলো হয় নিজেদেরই টুকরো টুকরো করে ফেলবে অথবা বিপ্লবের আবর্তে নিয়োজিত হবে। তবে এগুলোর চরম অবস্থায় অধিকাংশ ব্যতিরেকে সমাজকল্যাণের মধ্যে তাদের স্বার্থ সেই পর্যায়ে সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, যে পর্যায়ে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পুনর্গঠনের মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্যামুয়েল বৃটান যথার্থই বলেছেন, ‘কঠোর উন্নাসিকের সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে, মানব ক্রিয়ায় নৈতিক বৈধতার ভূমিকাকে অবমূল্যায়ন করা। আত্মস্বার্থ উদ্ধারের উপর নিয়ন্ত্রণকারী কিছু বিধি ছাড়া কোনো মানব সংগঠনই কাজ করতে পারে না’। যাকাত, উত্তরাধিকার এবং সুদের উচ্ছেদ শুধুমাত্র এমন মূল্যবোধ নয়, যা প্রত্যেক মুসলিমকে ব্যক্তিগত, ইহলৌকিক ও পরলৌকিক কল্যাণের জন্য বিশ্বস্ততার সঙ্গে মেনে চলতে হবে। মাকাসিদ অর্জন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে এসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রয়েছে। সরকারের ভূমিকাসহ ইসলামী কর্মকৌশলের অন্যান্য উপাদানসমূহের কার্যকর পুনরুজ্জীবনের পরিপ্রেক্ষিত এদের গুরুত্ব অবমূল্যায়ন করা সঠিক নয়। তবে এগুলো সবই একটি সার্বিক আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠনের অংশ এবং বিচ্ছিন্নভাবে প্রয়োগ করে তাদের পূর্ণ কার্যক্ষমতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ইসলামী কর্মসূচিকে তার সার্বিক কার্যকারিতার জন্য সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করতে হবে, আংশিক গ্রহণ বাস্তবায়ন লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করতে পারে না। এ ব্যাপারে আল-কোরআনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে:
‘তুমি কি পবিত্র গ্রন্থের একটি মাত্র বিশ্বাস করবে এবং অবশিষ্ট পরিত্যাগ করবে? কিন্তু তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে, তাদের জন্যে এ দুনিয়াতে বেইজ্জতি এবং হাশরের দিন কঠোর শাস্তি ছাড়া আর কি শাস্তি হতে পারে?’ (২:৮৫)
‘হে মুসলিমগণ, ইসলামের ভিতর পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। কারণ সে তোমার নিশ্চিত শত্রু’। (২:২০৮)
‘আল্লাহ ততক্ষণ কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’। (১৩:১১)