পরিচ্ছেদঃ ৯
পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মীরের অনুভূতি :
পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক, জিও টিভির প্রধান নির্বাহী হামিদ মীর তাঁর দৈনিক জং-এর এক কলামে লিখেছেন, ‘আমার কষ্ট ও যন্ত্রণা ছিল বর্ণনাতীত। এটা আমার সাংবাদিকতাসুলভ অনুসন্ধিৎসু মনোভাবের কারণে। সিএনএনে ইসলামবিরোধী একটি চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে লিবিয়ায় বিক্ষোভের খবর দেখার পর ইন্টারনেটে ওই চলচ্চিত্রটি খোঁজা শুরু করি। আমার এক সহকর্মী কোথাও থেকে ভিডিওটি ডাউনলোড করে আমার কাজ সহজ করে দেন। যখন ওই চলচ্চিত্রটি দেখা শুরু করি তখন আমার কাছে মনে হতে লাগল, কেউ যেন আমার মন ও মস্তিষ্কে হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে।নিজেকে অনেক শক্ত মনের মানুষ বলে জানি, কিন্তু স্যাম ভাসেলির নির্মিত ইনোসেন্স অব মুসলিম নামের এই চলচ্চিত্র বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদ। কারণ এই চলচ্চিত্রের দৃশ্য ও সংলাপগুলো বোমা বিস্ফোরণের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে আলকায়েদার হামলায় তিন হাজার লোক মারা গিয়েছিল। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর ২০১২ ইউটিউবে প্রচারিত এই ভিডিওচিত্রটি কোটি মুসলিমের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই চলচ্চিত্র কয়েক মিনিটের বেশি দেখতে পারি নি। এই ভয়াবহ চলচ্চিত্রের বিবরণ দেয়াও আমার জন্য অনেক কষ্টকর। শুধু এতটুকু বলব, এই চলচ্চিত্রের কয়েকটি দৃশ্য দেখে স্যাম বেসিলের বিপরীতে ওসামা বিন লাদেনের সন্ত্রাসবাদকে অতি তুচ্ছ বলে মনে হয়েছে। আমেরিকার জন্য এটা বড় পুরস্কার, এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী স্যাম বেসিল এত বড় অপকর্ম করার পরও আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশ্রয়েই আছে। আল্লাহ তা‘আলার কাছে লাখো শুকরিয়া যে, আজ পর্যন্ত কোথাও কোনো মুসলিম ঈসা আলাইহিস সালাম অথবা অন্য কোনো নবীর ব্যাপারে এ ধরনের বেয়াদবী করেন নি।’
হামিদ মীরের একটি যুক্তি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার পক্ষ থেকে আমাদের দেশের মাদরাসাগুলোর ওপর অনেক অভিযোগ আরোপ করা হয়। অথচ দ্বীনি মাদরাসার ছাত্ররা কখনো খ্রিস্টান অথবা ইয়াহূদী ধর্মের এমন অবমাননার কথা চিন্তাও করে না যা করেছে স্যাম বাসেলি ইসলাম ও ইসলামের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে।
আমার আফসোস হয়, এ ব্যাপারে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া লোকদেখানো। এই চলচ্চিত্রকে আমেরিকার প্রশাসনবিরোধী হিসেবে অভিহিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং এটাও স্বীকার করতে হবে, কিছু খ্রিষ্টান ও ইয়াহূদী সন্ত্রাসী আমেরিকাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা করছে। তারা তথাকথিত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আলকায়েদা, তালেবান ও হাক্কানী নেটওয়ার্ক থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর। আমি বারাক ওবামার কাছে স্যাম বাসেলের মতো সন্ত্রাসীর বিচার প্রার্থনা করব না, তবে আমেরিকান মিডিয়ার বন্ধুদের কাছে আবেদন করব, তারা যেন এটা খুঁজে বের করেন, তাদের দেশের সন্ত্রাসীদের কোন কোন গোপন সংগঠন সহযোগিতা করে। আমি বিশ্বাস করি, ডেরি জনস ও স্যাম ভাসেলি গোটা আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব করে না। আমেরিকায় রমস ক্লার্কের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিও আছেন, যিনি পাকিস্তানি ডাক্তার আফিয়া সিদ্দিকীর মুক্তির জন্য আন্দোলন করছেন।
আমার কাছে মনে হচ্ছে, মুসলিম বিশ্বে আজ আমেরিকা ক্লার্কের দেশ হিসেবে পরিচিত নয়, পরিচিত হচ্ছে স্যাম বাসিলের দ্বারা। স্যাম বাসিলের সন্ত্রাসবাদ আমাকে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। মুসলিমদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননা করায় খ্রিস্টান বাদশাহর প্রতি রাগান্বিত হয়ে তলোয়ার হাতে নিয়েছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত বায়তুল মোকাদ্দাস বিজয় করেছিলেন। কিন্তু আফসোস, আজ মুসলিম বিশ্বের কোনো শাসকের মধ্যে এই অনুভূতি ও উদ্যমটুকু নেই যে, নবীজীর অবমাননাকারী কুচক্রীদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে।’ [বার্তা ২৪ এর সৌজন্যে]