পরিচ্ছেদঃ ৮
তিন: এক দিককে অন্যদিকের তুলনায় অধিক প্রাধান্য দেয়া, এটা দু’ভাবে হতে পারে; সামাজিক পর্যায়ে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে
এক দিককে অন্যদিকের তুলনায় অধিক প্রাধান্য দেয়া, এটা দু’ভাবে হতে পারে; সামাজিক পর্যায়ে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে।
(ক) সামাজিক পর্যায়
কোনো ব্যক্তি অসংখ্য পাপাচার ও নাফরমানী করে, পাশাপাশি নামাযও পড়ে। গুনাহসমূহের ব্যাপারে মনকে এই বলে প্রবোধ দেয় যে, নামায দ্বীনের স্তম্ভ; কেয়ামতের দিন মানুষের আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম দৃষ্টি দেয়া হবে নামাযের প্রতি। আর তুমি তো নামায পড়ছই, তাই সামান্য কিছু পাপাচার নাফরমানিতে কোনো অসুবিধা নেই ।
তখন সে অন্যান্য ইবাদতের ত্রুটিগুলোর বৈধতা দানের জন্য নামাযকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় এবং অন্য বিষয়সমূহের হিসাবের তুলনায় নামাযকেই বড় করে দেখে।
নামাযই দ্বীনের স্তম্ভ, কথা সত্য, তবে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন নয়। তাই শয়তান তার ত্রুটিসমূহের বৈধতা দানের জন্য এ পথ অবলম্বন করে, যাতে সে বিভ্রান্ত হয়।
অন্য এক ব্যক্তি এসে বলে, ইসলাম হল ‘মু‘আমালা’ বা ভাল আচরণের নাম। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়তো এটাই যে, তুমি লোকদের সাথে সদাচারী হবে। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা রটনা করবে না, তাদেরকে ধোকা দেবে না। নামায না পড়, না পড়, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন ‘‘দ্বীন হল ভাল আচার-আচরণ’’ অর্থাৎ নামাযের তুলনায় মু‘আমালাত বা ভাল আচার-ব্যবহার অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তাই নামাযের উদাসীন হলেও মু‘আমালার ব্যাপারে সচেতন থেকো।
এমনিভাবে পাবেন অনেক এমন ব্যক্তিকে, যে মনে করে নামায-রোযা করলে নিজের উপকার। আর মানব সেবা করলে মানুষের কল্যাণ সাধিত হয়। আল্লাহও খুশী হন। আল্লাহ নিজেও মানুষের কল্যাণের জন্য সব কিছু করেছেন। তাই সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মানব কল্যাণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলেছেনঃ ‘‘দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা।’’ এটা মনে করে সে নামায-রোযার গুরুত্ব দেয় না। মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে ব্যস্ত। এটাও শয়তানের একটি প্রবেশ পথ।
অপর এক ব্যক্তি নেক আমলসমূহ বর্জন করে শুধু সুন্দর নিয়্যতের উপর নির্ভর করে এবং বলে, ‘দ্বীনের জরুরী বিষয়তো পরিশুদ্ধ নিয়্যত’। তাই তো আমি হিংসা বিদ্বেষমুক্ত পরিচ্ছন্ন অন্তরে রাত যাপন করি।
অনেকে কুরআন শিক্ষাদান, কিরাত ও তাজভীদে গুরুত্ব দেন। তাই অন্য বিষয়ের তুলনায় এ বিষয়টিকে তারা শ্রেষ্ঠত্ব দেন। আর একটি বিষয় তাদের কাছে গুরুত্ব পাওয়ায় অন্য অনেক বিষয় তারা পরিত্যাগ করেন। সন্দেহ নেই যে, এটাই ইসলামের একমাত্র বিষয় নয়। আবার এ বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়াও ভুল নয়; বরং ভুল তো হল, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তুলনায় একটি বিষয় নিয়ে আদিখ্যেতা।
(খ) সামাজিক পর্যায়
সামাজিকভাবেও বিশেষ একটি দিককে প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে। তাই সমাজে এ কথা বলার একটা ‘হুজুগ’ প্রত্যক্ষ করবেন যে, সবচে’ বেশী গুরুত্বের বিষয় তো মুসলিম ও মুসলিমদের দুশমনদের অবস্থা অবহিত হওয়া। আর রাজনৈতিক বিষয়াবলীতো আরো গুরুত্বের। কারণ, বর্তমানে আমরা যে যুগে বাস করছি তা শুধু সুফি দরবেশদের যুগ নয়।
এ ধরনের হুজুগ প্রবণদের দেখবেন, তারা সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মাসুনিয়াহ, বাহাই ও কাদিয়ানী সব মতবাদ আত্মস্থ করেছে। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করুন, দেখবেন, ঠুটো জগন্নাথ’ কিছু জানে না। এরা সমকালীন বিষয়কে অধিক প্রাধান্য দেয়। অন্যদিকে একপক্ষ ‘ইবাদতকেই অধিক প্রাধান্য দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর সাথে সম্পর্কই চূড়ান্ত বিষয়; নামায, দুনিয়া বিমুখতা ও তাকওয়াই মূখ্য এবং আত্মিক বিষয় ছাড়া অন্যসব বিষয় মূল্যহীন।
অপর একদল পাবেন, যারা বলে, মুসলিম উম্মাহর ঐক্যই আসল বিষয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَٱعۡتَصِمُواْ بِحَبۡلِ ٱللَّهِ جَمِيعٗا وَلَا تَفَرَّقُواْۚ ﴾ [ ال عمران : ١٠٣ ]
‘‘এবং তোমরা সবে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর, আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’’ [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]
এ মতকেই তারা প্রতিপাদ্য বিষয় সাব্যস্ত করে, এমনকি আক্বীদার ওপরও! তাই তারা বিপরীত আক্বীদা পোষণকারীদের সাথেও আলাপ-আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়, এ দাবী তুলে যে, যখন শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে কুকুরের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছে এমন মুহুর্তে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হব, এটাই সময়ের প্রধান দাবী। অথচ সঠিক ছিল তো বুনিয়াদের ওপর, দ্বীনের ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া। নৈরাজ্য ও আক্বীদা বিশ্বাসে ভিন্নতার ওপরে নয়।
অতএব আলোচ্যবিষয়গুলো ও অন্যান্য বিষয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। মোটকথা, বিশেষ কোনো দিককে ভিন্ন দিকের তুলনায় প্রাধান্য প্রদান, এটাই শয়তানের বহুল ব্যবহৃত পথ।