ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানে নারীর অধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে ইসলামী উত্তরাধিকারের কিছু বৈশিষ্ট্য ও মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। যেহেতু আলোচ্য বিষয়ের সাথে এর যোগসূত্র রয়েছে তাই আলোচানা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এতে অনেক সংশয়েরও অবসান ঘটবে।
প্রথমত:
ইসলাম সুষম বন্টনে বিশ্বাসী, সমবন্টনে নয়। অবস্থা ও অবস্থান ভেদে মানুষের প্রকৃতিগত প্রয়োজন ও চাহিদা ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন, ধরা যাক সরকারি তহবিল থেকে বন্টনের জন্য কিছু জিনিস আসলো। বন্টনের ক্ষেত্রে দেখা গেলো এক পরিবারে দশজন সদস্য অন্য পরিবারে মাত্র দুইজন। বিবেকবান মাত্রই এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারবে, সমান অধিকারের নামে উভয়জনকে সমপরিমাণ দেওয়া কোনো মতেই ন্যায় বিচার হবে না। বরং এক্ষেত্রে ন্যায় বিচার হবে প্রয়োজনানুসারে বন্টন করা। যাকে বলা হয় সুষম বন্টন। তেমনিভাবে ইসলাম সমবন্টনকে
ইনসাফের মূলভিত্তি মনে করে না; বরং ইসলাম মনে করে সুষম বন্টনই ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের মূল ভিত্তি। এর আলোকে বন্টনের ক্ষেত্রে কখনো সমান হবে আবার কখনো অবস্থা ভেদে বিশাল পার্থক্য হতে পারে। উত্তরাধিকার বিধানেও ইসলাম এ নীতিকেই অবলম্বন করেছে।
দ্বিতীয়ত:
ইসলামের উত্তরাধিকার আইন পুরুষ বা নারী কেন্দ্রিক নয়, তেমনিভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদের অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধানও মূখ্য বিষয় নয়। সুতরাং একথা বলার সুযোগ নেই যে, ইসলামী উত্তরাধিকার আইন পুরুষকেন্দ্রিক বা নারী কেন্দ্রিক।
তৃতীয়ত:
অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি দিককে সামনে রাখা হয়:
১. মৃত ব্যক্তির সাথে ওয়ারিসের নিকটাত্মীয়তা: যে ওয়ারিস মৃত ব্যক্তির যত কাছের আত্মীয় হবে তার অংশ তত বেশি হবে। যেমন, ভাই বোনের তুলনায় ঔরসজাত সন্তানেরা বেশি পাবে এবং এটিই ইনসাফের দাবী।
২. নতুন প্রজন্ম বা বংশধর প্রবীণদের তুলনায় বেশি পাবে: যেমন, সন্তান-সন্ততি পিতা মাতার তুলনায় বেশি পাবে এবং এটিই যুক্তির দাবী। যেহেতু নতুনদের সামনে রয়েছে ভবিষ্যতের এক বিশাল জীবন।
৩. আর্থিক প্রয়োজনীয়তা ও সামাজিক দায়ভার: অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি লক্ষণীয় দিক হলো অংশীদার ওয়ারিসের সামাজিক দায়ভার ও আর্থিক প্রয়োজনীয়তা। যেমন, একটি পরিবারের সার্বিক খরচ নির্বাহ করার দায়িত্ব পুরুষের। স্ত্রীর ভরণপোষণ, সন্তান-সন্ততিদের খরচ যোগান দান এবং
পিতা-মাতার সার্বিক সেবা-শুশ্রূষা এসব তো পুরুষেরই দায়িত্ব। সামাজিক ও নৈতিক কর্তব্য। এসবদিক লক্ষ্য রেখে ইসলাম অংশ নির্ধারণে তারতম্য করেছে। যেমন, মেয়ের তুলনায় ছেলের আর্থিক বাধ্য-বাধকতা ও সামাজিক কর্তব্য বেশি। তাই ইসলাম ছেলের জন্য মেয়ের দ্বিগুণ অংশ নির্ধারণ করেছে।
চতুর্থত:
দুর্বলদেরকেও অবহেলা করা হয় নি। জাহেলি সমাজে নারী ও শিশুকে ওয়ারিস গণ্য করা হতো না, তারা যুদ্ধে যেতে পারে না শুধুমাত্র এই অজুহাতে। এককথায় দুর্বলের ওপর সবলের খবরদারি। কিন্তু ইসলাম সে অমানবিক বৈষম্য দূর করে তাদেরকেও তাদের প্রাপ্য যথাযথভাবে দান করেছে।
পঞ্চমত:
আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করাও উত্তরাধিকার বিধানের অন্যতম লক্ষ্য। মিরাছের সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ইসলাম রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَأُوْلُواْ ٱلۡأَرۡحَامِ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلَىٰ بِبَعۡضٖ فِي كِتَٰبِ ٱللَّهِۚ﴾ [
الانفال :
٧٥ ]
“আর রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়রা একে অপরের কাছে আল্লাহর কিতাবের ঘোষণা মতে অধিক হকদার।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭৫]