পাঁচ: মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাওয়াত প্রচারণার কাজে আত্মনিয়োগ করা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ওয়াফাদারীর একটি দাবি হচ্ছে, সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করা। রাসূল বলেছেন,
بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيةً আমার পক্ষ হয়ে একটি আয়াত হলেও পৌঁছিয়ে দাও।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,
لَأَنْ يَهْدِيَ اللهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِدًا، خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ আল্লাহ যদি তোমার মাধ্যমে একজন মাত্র ব্যক্তিকেও হিদায়াত দান করেন তা হবে তোমার জন্য লাল উট থেকেও উত্তম।
অন্য এক হাদীসে এসেছে,
مُكَاثِرٌ بِكُمُ الْأُمَمَ يَوْمَ القِيَامَةِ আমি
কিয়ামত দিবসে অন্যান্য উম্মতের ওপর তোমাদের আধিক্য নিয়ে গর্ব করব।
উম্মতে মুহাম্মাদীর আধিক্যের একটি মাধ্যম হল, ইসলাম প্রচার এবং অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীর ইসলাম ধর্মে ব্যাপক প্রবেশ। আর আল্ল্লাহ তাআলা স্পষ্টকরে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর প্রতি লোকদের দাওয়াত প্রদান সমস্ত নবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারীদের দায়িত্ব, পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য এসেছে।
ইরশাদ হয়েছে :
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي বল! এটি আমার পথ। আল্লাহর প্রতি আহ্বান করি, যথার্থ জ্ঞান নিয়ে, আমি ও আমার অনুসারীবৃন্দ।
সুতরাং উম্মতের প্রতিটি সদস্যের উচিত, তাদেরকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠান হয়েছে, তা যথার্থভাবে পালন করা। যেমন, দাওয়াত ও সত্য পৌঁছিয়ে দেয়ার কাজ। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বারণ ইত্যাদি।
ইরশাদ হয়েছে,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ তোমরা উত্তম জাতি, তোমাদের বের করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য, তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কাজ হতে বারণ করবে, এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।
ছয়: জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যথাযথ সম্মান করা
এটিও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার যা অবহেলিত হচ্ছে উম্মতের অনেক সদস্যের দ্বারা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا ﴿৮﴾
لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا ﴿৯﴾.
নিশ্চয় আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী হিসেবে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর,তাঁকে সাহায্য কর ও সম্মান কর, আল্লাহর
পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা কর সকাল ও সন্ধ্যায়।
ইবনে সুদী বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সহযোগিতা ও সম্মানের অর্থ হলো, তাঁর তাজিম করা, তাঁকে বড় বলে জানা, তাঁর অধিকারসমূহ আদায় করা। কেননা তাঁর বিশাল দান ও অনুগ্রহ তোমাদের সবারই উপর রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাজিম-সম্মান-শ্রদ্ধায় সাহাবাগণ ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কথা বলতেন এতই শ্রদ্ধা ভরা নির্লিপ্ততায় তাঁরা তা শুনতেন, মনে হত যেন তাঁদের মাথায় পাখি বসে আছে।
যখন পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি নাযিল হল,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ ﴿২﴾
হে মুমিনগণ, নবীর আওয়াজের ওপর তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না, এবং তোমাদের পরস্পরে কথা বলার সময় যেভাবে উচ্চ কণ্ঠ হও সেভাবে নবীর সামনে কথা বল না, এতে তোমাদের কর্মসমূহ ধ্বংস হয়ে যাবে, আর তোমরা তা টেরও পাবে না।
আবুবকর রাদিয়াল্লহু আনহু বলেন, আল্লাহর কসম, এখন থেকে আমি আপনার সাথে নিতান্তই ক্ষীণ আওয়াজ ব্যতীত কথা বলব না।
ওফাতের পর রাসূলুল্লাহকে সম্মানের অর্থ তাঁর
সুন্নতের অনুসরণ, তাঁর নির্দেশসমূহের তাজিম করা, তাঁর বিচার ফয়সালা মেনে নেয়া, তাঁর বাণীসমূহের বিষয়ে আদব অবলম্বন করা, কোন মাযহাব বা ব্যক্তির অভিমতকে কেন্দ্র করে তাঁর হাদীসের বিপক্ষে না যাওয়া। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন, এ-ব্যাপারে মুসলমানদের ঐক্যমত রয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন সুন্নত যদি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হয় তবে কোন ব্যক্তির অভিমতের ভিত্তিতে তা ছেড়ে দেওয়া বৈধ হবে না।
সাত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম যতবারই উল্লেখ হবে তাঁর প্রতি দরূদ পড়া
আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি
সালাত পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿৫৬﴾
নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি সালাত প্রেরণ করেন, হে মুমিনগণ তোমরাও রাসূলের প্রতি সালাত পাঠ করো এবং তাকে সালাম দাও উত্তম পন্থায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
قَال رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَه فَلَمْ يُصَلّ عَلَيَّ " [
رواه مسلم [
ঐ ব্যক্তি অপদস্থ হল, যার কাছে আমি আলোচিত হলাম অথচ সে আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল না।
তিনি আরো বলেছেন,
وَقَالَ : "
إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ القِيَامَةِ، أَكْثَرُهُمْ عَلِيَّ صَلَاةَ " [
رواه الترمذي ,
وحسنه الألباني .
কিয়ামত দিবসে আমার অতি নিকটজন হবে ঐ ব্যক্তি যে আমার প্রতি অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ করে।
অন্য এক হাদীসে এসেছে,
وَقَالَ : "
الْبَخِيلُ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَه وَلَـمْ يُصَلّ عَلَيَّ " [
رواه أحمد والترمذي وصححه الألباني প্রকৃত কৃপণ ঐ ব্যক্তি যার কাছে আমি আলোচিত হলাম, কিন্তু সে আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম উল্লেখ হওয়া সত্ত্বেও যদি কোন মুসলমান তাঁর প্রতি সালাত পাঠ না করে তবে এটা হবে নিশ্চিত অন্যায়।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ.
جلاء الأفهام في الصلاة والسلام على خير الأنام গ্রন্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সালাত পাঠের বহু উপকারিতা উল্লেখ করেছেন । দরূদ ও সালাম বিষয়ে এ বইটি পাঠ করার জন্যে সকলকে পরামর্শ দেওয়া হল।
আট: মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব ও শত্রুদেরকে ঘৃণা করা
ইরশাদ হয়েছে,
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آَبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿২২﴾
তুমি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় পাবে না যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারীদের ভালোবাসে। হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা,পুত্র, ভ্রাতা অথবা তাদের জ্ঞাতি-গোত্র। তাদের অন্তরে আল্লাহ সুদৃঢ় করেছেন ঈমান এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ থেকে এক রূহ দ্বারা। তিনি তাদের প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরস্থায়ীভাবে থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে। {
সূরা মুজাদালাহ:২২}
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মুওয়ালাত বা বন্ধুত্বের একটি দিক হল, তাঁর সাহাবাদেরকে ভালোবাসা ও তাদেরকে বন্ধু ভাবা। তাদের অধিকার বিষয়ে সচেতন থাকা। তাদের প্রশংসা করা। তাদের অনুসরণ করা ও তাদের জন্য ইস্তিগফার করা। সাহাবাদের মাঝে যেসব বাদানুবাদের ঘটনা ঘটেছে সেগুলো সম্পর্কে কোন রূপ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা। তাদের সাথে যারা শত্রুতা পোষণ করে অথবা তাদের কারও চরিত্র হননের চেষ্টা করে, অথবা গালমন্দ করে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব না করা। অনুরূপভাবে নবী পরিবারকে মহব্বত করা, তাদের সাথে মুয়ালাতপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, তাদের সম্মান-মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট হওয়া, এবং তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি হতে বিরত থাকা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিকার রক্ষার আরেকটি দিক হচ্ছে, আহলে সুন্নাতের ওলামাদের মুহাব্বত করা, তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, তাদের অসম্মান ও মর্যাদাহানীকর কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মুওয়ালাতের (বন্ধুত্বসুলভ আচরণ) একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, কাফির, মুনাফিক, বেদআতপন্থী ও পথভ্রষ্ট এবং যারা রাসূলের শত্রু ও প্রতিপক্ষ তাদেরকে শত্রু মনে করা।
প্রবৃত্তিপূজারি ও বেদআতপন্থীদের জনৈক ব্যক্তি আইয়ূব সাখস্তিয়ানীকে বললেন: আমি আপনাকে একটি কথা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব। তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং হাতে ইশারা দিয়ে বললেন, এমনকি অর্ধেক কথাও না। আর এটা ছিল রাসূলের সুন্নতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তার শত্রুদের সাথে শত্রুতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে।