রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একাধিক
বিবাহের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল নারী জগতের জন্য কতিপয় শিক্ষক তৈরি করা, যারা তাদেরকে শরীয়তের বিভিন্ন বিধিবিধান শিক্ষা দিবেন। কারণ নারীরা সমাজের অর্ধেক। ইসলামী শরীয়তে পুরুষের উপর যেমন অনেক দায়িত্ব অপরিহার্য করা হয়েছে তেমনি করা হয়েছে নারীদের উপরও।
এমন অনেক নারী ছিল যারা প্রিয় সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট শরীয়তের বিভিন্ন হুকুম-আহকাম-বিশেষ করে নারী সম্পর্কীয় বিষয়াদি (যেমন ঋতুস্রাব,বাচ্চা প্রসব জনিত রক্তপাত,অপবিত্রতা,দাম্পত্য জীবন ইত্যাদি ) বিধিবিধান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে দারুন লজ্জাবোধ করতেন। এ সব মাসআলা-মাসায়েল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট জিজ্ঞেস করতে এসে তারা লজ্জায় চুপসে যেত।
অন্যদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও ছিলেন লাজুক প্রকৃতির। যেমনটি বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন
পর্দার অন্তরালের কুমারী বালিকার চেয়েও বেশী লাজুক।” (সহীহুল বুখারী, মানাকিব অধ্যায়)
ফলে মহিলাদের নিকট থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর তিনি খোলাখুলি ভাবে দিতে পারতেন না বরং কখনও কখনও পরোক্ষভাবে উত্তর দিতেন। এ কারণে অনেক সময় তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্য বুঝে উঠতে পারত না।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন: এক আনসারী মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ঋতুস্রাবের গোসল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কীভাবে গোসল করবে তা শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন:
“এক খণ্ড সুগন্ধযুক্ত কাপড় নিয়ে তা দ্বারা
পবিত্রতা অর্জন করবে।”
সে বলল, এটা দ্বারা কিভাবে পবিত্রতা অর্জন করব?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “এটা দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করবে।”
সে আবার বলল, হে আল্লাহর রাসূল,আমি এটা দ্বারা কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করব?
তিনি বললেন: “সুবহানআল্লাহ! এটার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করবে।”
আয়েশা রা. বলেন: অতঃপর আমি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে বললাম, এই এই স্থানে কাপড় খণ্ডটি রাখবে এবং রক্তের চিহ্ন মুছে ফেলবে। অতঃপর তিনি স্থানটা স্পষ্ট ভাবে তাকে বুঝিয়ে দিলেন। (সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঋতুস্রাব)
এ ধরণের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে বিবরণ দিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত লজ্জাবোধ করতেন।
অনুরূপভাবে খুব কম মহিলাই লজ্জা কাটিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খোলাখুলি প্রশ্ন করতে পারত।
বুখারী মুসলিমে বর্ণিত উম্মে সালামা রা. বর্ণিত হাদীসটিকে আমরা উদাহরণ হিসেবে নিতে পারি। তিনি (উম্মে সালামা রা.) বলেন: একদা উম্মে সুলাইম (তালহার রা. এর স্ত্রী) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তো সত্য কথার ব্যাপারে লজ্জা বোধ করেন না। তো কোন মহিলার যদি স্বপ্নদোষ হয় তবে কি তাকে গোসল করতে হবে?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “হ্যাঁ, যদি সে পানি দেখতে পায়।”
এ কথা শুনে মহিলারা হেসে উঠলেন।
উম্মে সালামা রা. বলেন: হায় আফসোস! মহিলাদের কি স্বপ্নদোষ হয় না কি?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তা নাহলে কিভাবে সন্তান মায়ের মত হয়?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্য হল,গর্ভস্থ সন্তান সৃষ্টি হয় পুরুষ ও নারীর বীর্য থেকে। আর এ কারণেই সন্তানদের আকৃতি মায়ের মত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাও ঠিক এরূপই বলেছেন:
إنَّا خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن نُّطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَّبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا “আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্র বিন্দু থেকে এভাবে যে, তাকে পরীক্ষা করব। অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন।” (সূরা দাহর/ইনসান:২)
ইবনে কাসীর রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
أَمْشَاج শব্দের অর্থ: মিশ্রণ। একটি বস্তু আরেকটির সাথে মিশ্রিত থাকলে তাকে
المشج অথবা
المشيج বলা হয়।
ইবনে আব্বাস রা. বলেন: “আয়াতের উদ্দেশ্য হল, পুরুষ ও নারীর বীর্য যখন একত্রিত হয় এবং উভয়টির মিশ্রণ ঘটে।”
পরবর্তীতে এ ধরণের বিভভভকক ভিন্ন জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ ।
আয়েশা রা. বলতেন,
رحم الله نساء الأنصار لم يمنعهن الحياء أن يسألن عن أمر دينهن “আল্লাহ আনসারী মহিলাদের প্রতি রহম করুন! লজ্জা তাদেরকে দ্বীনের বিষয়ে জ্ঞানার্জনে বাধা দেয় না।” (সহীহ বুখারী, পবিত্রতা অধ্যায়)
কোন কোন মহিলা রাত আঁধারে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয় যেমন, প্রসূতি,অপবিত্রতা ইত্যাদি হুকুম-আহকাম জানার জন্য আয়েশা রা. এর নিকট আসতেন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র সহধর্মিণীগণ ছিলেন মহিলা বিষয়ক চমৎকার শিক্ষক ও দিক নির্দেশনা দান কারিণী।
এভাবেই তাঁদের নিকট থেকে মুসলিম নারীগণ দ্বীনী বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেছেন।
আর এ কথাও সত:সিদ্ধ যে,
সুন্নাহ কেবল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীকেই বলা হয় না বরং তাঁর কথা,কাজ এবং সম্মতির সমষ্টির নাম হল সুন্নাহ। এ সবগুলোই শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত এবং উম্মতের জন্য অপরিহার্য পালনীয়।
সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ ব্যতিরেকে তাঁর গৃহ অভ্যন্তরের কার্যক্রম ও নানা তথ্যাদি সম্পর্কে আমাদেরকে কে অবহিত করতো?
তাঁর পবিত্র জীবন সঙ্গিনীদের মধ্য হতে অনেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে মুসলিম জাতির নিকট হেদায়েতের বাণী পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষক এবং মুহাদ্দিসের ভূমিকা পালন করেছেন। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের অনেকেই স্মৃতিশক্তি, মেধা ও প্রতিভায় খ্যাতি লাভ করেছেন।