এ বিষয়েও কুরআন সকল পিপাসা নিবারণ করে দিয়েছে। সব পথকে আলোকিত করে রেখেছে।
দেখুন! সবচেয়ে বড় নেতা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে আল্লাহ সমাজের লোকদের সাথে কিরূপ আচরণের হুকুম দিয়েছেন:
وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ "এবং তোমার অনুসারী মু’মিনদের সাথে বিনম্র ব্যবহার করো।" (শুআরা: ২১৫)
তিনি আরো বলেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ "(হে নবী!) এটা আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহ যে, তোমার ব্যবহার তাদের প্রতি বড়ই কোমল। নয়তো যদি তুমি রুক্ষ স্বভাবের বা কঠোর চিত্ত হতে, তাহলে তারা সবাই তোমার চার পাশ থেকে সরে যেতো। তাদের ত্রুটি ক্ষমা করে দাও। তাদের জন্য মাগফিরাতের
জিকির">দোয়া করো এবং দ্বীনের ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করো।" (আল ইমরান: ১৫৯)
আর দেখুন! সমাজের লোকেরা নেতার সাথে আচরণ কেমন হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ কী আদেশ করছেন?
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ "হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের, আর সেই সব লোকের যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী।" (নিসা: ৫৯)
দেখুন! এমনকি একজন মানুষ তার পরিবারের সাথে কি আচরণ করবে তার নির্দেশও কুরআন দিয়েছে। আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার ও সন্তান-সন্ততিকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো যার জ্বালানী হবে মানুষ এবং পাথর। সেখানে রূঢ় স্বভাব ও কঠোর হৃদয় ফেরেশতারা নিয়োজিত থাকবে, যারা কখনো আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে না এবং তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয় তাই পালন করে।" (তাহরীম: ৬)
আরো দেখুন! মানুষকে তার পরিবারের বিষয়ে কিরূপ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আর আদেশ করা হয়েছে যে তাদের দ্বারা অনুচিত কাজ হয়ে গেলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে। প্রথমে তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, পরে আবার ক্ষমা করে দিতে বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِنْ تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ "হে সেই সব লোক যারা (আল্লাহ ও রাসূলের উপর) ঈমান এনেছো, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক। আর যদি তোমরা ক্ষমা ও সহনশীলতার আচরণ করো এবং ক্ষমা করে দাও তাহলে আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, অতীব দয়ালু।" (তাগাবুন: ১৪)
আবার দেখুন! সমাজের সাধারণ জনগণকে পরস্পরের মাঝে কী ধরণের আচরণ করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ "আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায়-নীতি, পরোপকার ও আত্মীয়-স্বজনদেরকে দান করার হুকুম দেন এবং অশ্লীল-নির্লজ্জতা ও দুষ্কৃতি এবং অত্যাচার-বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষালাভ করতে পারো।" (নাহাল: ৯০)
তিনি আরো বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا "হে ঈমানদারগণ, মানুষের প্রতি বেশী বেশী কুধারণা ও খারাপ অনুমান করা থেকে বিরত থাকো, কারণ কোন কোন ধারণা ও অনুমান গোনাহ। দোষ অন্বেষণ করো না। আর তোমাদের কেউ যেন কারো
গীবত (অসাক্ষাতে সমালোচনা) না করে।" (হুজুরাত: ১২)
তিনি আরো বলেন,
لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَنْ لَمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ "হে ঈমানদারগণ, পুরুষরা যেন অন্য পুরুষদের উপহাস-বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। আর মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদের উপহাস-বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং পরস্পরকে খারাপ নামে (বা নাম বিগড়িয়ে) ডেকো না। ঈমান গ্রহণের পর মন্দ নামে ডাকাটা অত্যন্ত জঘন্য ব্যাপার। যারা এ আচরণ পরিত্যাগ করেনি তারাই জালেম।" (হুজুরাত: ১১)
তিনি আরো বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "নেকী ও আল্লাহভীতির সমস্ত কাজে সবার সাথে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালংঘনের কাজে কাউকে সহযোগিতা করো না।" (মায়েদা: ২)
আল্লাহ আরো বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ "মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। (হুজুরাত: ১০)
আল্লাহ আরো বলেন,
وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ "এবং তারা নিজেদের সব কাজ পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে চালায়।" (শুরা: ৩৮)
এ ছাড়া আরো অসংখ্য আয়াত আছে।
সমাজের মানুষ সবাই কিন্তু একরকম নয়। মানুষ যেই হোক না কেন তার বিরোধী বা শত্রু জিন থেকে হোক বা মানুষ থেকে হোক থাকবেই। কেউ নিরাপদ নয়।
বিরোধী থেকে মুক্ত নয় কোন মানুষ, যদিও সে পাহাড়ের চুঁড়ায় গিয়ে বসবাস করে।
কিন্তু সকলেই আবার এই সমস্যার সমাধানও চায়। সমস্যাটি সমাজের সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত। এর সমাধানে মহান আল্লাহ তিনটি স্থানে আলোচনা করেছেন। বলেছেন যে বিরোধীতাকারী মানুষের অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে, তার দুর্ব্যবহারকে উপেক্ষা করা এবং বিনিময়ে তার সাথে ভালো আচরণ উপহার দেয়া। আর জিন শয়তানের শত্রুতা থেকে সমাধানের একটিই উপায়, তা হচ্ছে: তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করা।
তিনটি স্থানের ১মটি হচ্ছে: মানুষের ব্যাপারে সূরা আরাফের শেষের দিকে আল্লাহ বলেন,
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ "হে নবী! কোমলতা ও ক্ষমার পথ অবলম্বন করো। সৎকাজের উপদেশ দিতে থাকো এবং মূর্খদের সাথে বিতর্কে জড়িও না।" (আরাফ: ১৯৯)
আর জিন শয়তানের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ "আর যদি কখনো শয়তান তোমাকে প্ররোচিত বা উত্তেজিত করে, তাহলে আল্লাহর শরণাপন্ন হও এবং তাঁর কাছে আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।" (আরাফ: ২০০)
২য় স্থান: সূরা মুমিনূনে মানুষের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَصِفُونَ "[হে মুহাম্মাদ!] মন্দকে প্রতিহত করো সর্বোত্তম আচরণ দ্বারা। তারা তোমার সম্পর্কে যেসব কথা বলে তা আমি খুব ভালো করেই জানি।" (মুমিনূন: ৯৬)
আর পরক্ষণেই জিনদের শত্রুতার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
وَقُلْ رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُونِ "আর আল্লাহর কাছে দুয়া করো, “হে আমার রব! আমি শয়তানদের উস্কানি ও প্ররোচনা থেকে তোমার আশ্রয় চাই। এবং হে পরওয়ারদিগার, তারা আমার কাছে আসুক এ থেকেও আমি তোমার আশ্রয় চাই।” (মুমিনূন: ৯৭-৯৮)
৩য় স্থান: সূরা ফুসসিলাতে আল্লাহ আরো বেশী কথা বলে এমন সমাধান প্রদান করেছেন যে, আসমানী এই সমাধান গ্রহণ করলে শয়তানী এই সমস্যা সমূলেই বিনাশ হয়ে যাবে। শত্রুতা সমাজ থেকে বিদায় নিবে এবং সবাই সংশোধন হয়ে যাবে। আর একথাও এখানে বলা হয়েছে যে, আসমানী এই সমাধান সব মানুষই পায় না। যারা পরম সৌভাগ্যের অধিকারী তারা ছাড়া কেউ তা হাসিল করতে পারে না।
মানুষের সাথে বিরোধ মিমাংসার জন্য আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ "তুমি অসৎ আচরণকে সেই ব্যবহার দ্বারা প্রতিহত করো যা সবচেয়ে ভাল। তাহলে দেখবে যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল সে অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গিয়েছে। ধৈর্য্যশীল ছাড়া এ গুণ আর কারো ভাগ্যে জোটে না। এবং অতি ভাগ্যবান ছাড়া এ মর্যাদা আর কেউ লাভ করতে পারে না।" (সূরা হা-মীম
সাজদাহ: ৩৪-৩৫)
পরক্ষণেই জিন শত্রু থেকে সমাধানের জন্য বলা হয়েছে,
وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ "আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে আপনি কোন প্ররোচনা বা কুমন্ত্রণা অনুভব করেন, তবে আল্লাহর শরণাপন্ন হোন- তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (
সূরা ফুসসিলাত: ৩৬)
অন্য স্থানে বলেছেন যে, ঐ কোমলতা ও বিনয় শুধুই মুসলিমদের জন্য- কাফেরদের জন্য নয়। তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি দ্বীন থেকে ফিরে যায়, (তাহলে ফিরে যাক), আল্লাহ এমনিতর আরো বহু লোক সৃষ্টি করে দেবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালোবাসবেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালোবাসবে, যারা মুমিনদের ব্যাপারে হবে কোমল ও বিনম্র এবং কাফেরদের ব্যাপারে হবে কঠোর।" (মায়েদা: ৫৪)
আল্লাহ মুমিনদের আরো পরিচয় উল্লেখ করে বলেন,
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ "মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল। আর যারা তাঁর সাথে আছে তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর ও আপোষহীন এবং পরস্পর দয়া পরবশ।" (ফাতাহ: ২৯)
আল্লাহ আরো বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ "হে নবী! পূর্ণ শক্তি দিয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করো ও মুনাফিকদের মোকাবিল করো এবং তাদের প্রতি কঠোর হও।" (তাওবা: ৭৩, তাহরীম: ৯)
নম্রতার স্থানে কঠোরতা করলে তা হবে নির্বুদ্ধিতা ও বোকামী। আর কঠোরতার জায়গায় নম্রতা দেখালে তা হবে দূর্বলতা ও ব্যক্তিত্বহীনতা।
যদি বলা হয় ধৈর্য, বলুন আছে ক্ষেত্র ধৈর্যের,
অপাত্রে ধৈর্য পরিচয় জাহেলের।